মেহেদী হাসান, ১০/২/২০১৩
শাহবাগে জমায়েতের শুরু হয় আব্দুল কাদের মোল্লার ফাঁসির দাবিতে। এ দাবি শেষ পর্যন্ত গিয়ে ঠেকেছে জামায়াতে ইসলামকে নিষিদ্ধ করা, বাংলাদেশ থেকে এদেরকে চিরতরে সমূলে উৎখাত এবং বিনাশের মধ্যে। জামায়াত শিবির সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠান, বয়কট এবং নিষিদ্ধ করতে হবে। জামায়াত শিবির যারা সমর্থন করে তাদের বাংলাদেশী নাগরিকত্বও বাতিল করতে হবে। দাবি যতই ডালপালা মেলছে ততই এ জমায়েতের অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য এবং চরিত্র প্রকাশ পেয়েছে। জমায়েতের বক্তব্য, ভাষা, স্লোগান এবং দাবি দাওয়া সবকিছুই স্পষ্ট করে বলে দিচ্ছে বিচার করা বা বিচার চাওয়া কোন বিষয় নয়; গোষ্ঠী বা শ্রেণী বিশেষকে দমন, উচ্ছেদ, নির্মুল, খতম এবং ধ্বংস করা তাদের মূল লক্ষ্য। মুখে যতই বলুক তারা সাধারন পাবলিক, অরাজনৈতিক কিন্তু তাদের ভাষা, দাবি এবং স্লোগান, পোস্টারের মুলমন্ত্র যা প্রকাশ করছে তা হল এর চেয়ে প্রান্তিক রাজনৈতিক কাজ আর কিছু হতে পারেনা। একটি গণমাধ্যমে একে তুলনা করা হয়েছে ফ্যাসিবাদের উত্থানের সাথে।
জমায়েতের দাবি, স্লোগান, ব্যানার, ফেস্টুন, পোস্টার, কার্টুন থেকে এটা পরিষ্কার যে, তারা বিচার চাননা। ফাঁসি চান। বিচার হতে পারে তবে তার একমাত্র রায় হতে হবে ফাঁসি। কার ফাঁসি? প্রথমে শুধু আব্দুল কাদের মোল্লার ফাঁসি চেয়েছেন তারা। তারপর জামায়াতের সব নেতার ফাঁসি চাওয়া হল। এখানেই শেষ নয়। জামায়াত শিবিরের সবাইকে রাজাকার আখ্যায়িত করে তাদের সবার ফাঁসি দাবি করেছে তারা। যারা ফাঁসির আওতায় পড়বেনা তাদের সবার নাগরিকত্ব বাতিল করতে হবে। ফাঁসি দিয়ে তাদের লাশও এদেশে কবর দেয়া যাবেনা। পাকিস্তান পাঠিয়ে দিতে হবে।
জামায়াত শিবির সমর্থিত সকল প্রতিষ্ঠান বয়কট, বন্ধ এবং বাজেয়াপ্ত করতে হবে। লাঠি নিয়ে হামলা করতে হবে। নয়া দিগন্ত, দিগিন্ত টিভি, আমার দেশ, সংগ্রাম, ইসলামী ব্যাংক, ইবনে সিনা, রেটিনা, ফোকাসসহ যাবতীয় প্রতিষ্ঠান বয়কট এবং বন্ধ করার ডাক দেয়া হয়েছে জমায়াত থেকে।
এভাবে ক্রমে এক ব্যক্তির ফাঁসির দাবি থেকে ক্রমে দাবির ডালপালা মেলেছে এবং জমায়েতের চরিত্র ফুটে উঠেছে। এবার দেখা যাক ফাঁসির দাবির ধরনটা কেমন ছিল। সমাবেশের আয়োজক, সমর্থক এবং সংহতি প্রকাশকারী ব্যক্তিবর্গ এবং আগতদের বক্তব্য সংক্ষেপ করলে দাড়ায় ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক আব্দুল কাদের মোল্লাকে প্রদত্ত যাবজ্জীবন কারাদন্ডের রায় তারা কেউ মানেননা। ফাঁসি ছাড়া আর কোন বিকল্প রায় হতে পারেনা। ফাঁসি ছাড়া আর কিছু মেনে নেয়া হবেনা, আর কোন বিকল্প শাস্তি গ্রহণযোগ্য নয়। ফাঁসিই একমাত্র উপযুক্ত শাস্তি, ফাঁসি ছাড়া ঘরে ফেরা হবেনা। কেউ কেউ দাবি করেছেন বিচার ছাড়াই ফাঁসি দিতে হবে। স্পটে গুলি করে মারতে হবে জামায়াতের নেতাদের। তাদেরকে শাহবাগ জমায়েতের হাতে তুলে দিতে হবে; তারাই তাদের বিচারের নামে ফাঁসির আয়োজন করবে। অন্য আসামীদের রায় কি হবে তা নিয়েও তারা আতঙ্কিত, উদ্বিগ্ন। তাদেরও কাউকে যাবজ্জীন দিলে চলবেনা; ফাঁসি দিতে হবে। ফাঁসি না দিলে হরতাল এমনকি গৃহযুদ্ধেরও হুমকি দেয়া হয়েছে ।
জমায়েতের স্লোগানগুলোর মধ্যেও নিহিত ছিল একটি গোষ্ঠী এবং শ্রেণীকে নির্মূলের আহবান। যেমন আড়াই হাত লাঠি ধর, জামায়াত শিবির ধোলাই কর, দড়ি ধরে দেব টান ফাঁসি দিয়ে নেব জান, একটা করে শিবির ধর, সকাল বিকাল জবাই কর।
তাদের এ দাবি, বক্তব্য এবং স্লোগান ব্যাখ্যা করলে সোজা এবং পরিষ্কার যে অর্থ দাড়ায় তা হল বিচার টিচার আসলে কিছু না। বিচারের নামে ফাঁসি দিয়ে একটি দল, শ্রেনী এবং গোষ্ঠীকে নির্মূল করাই হল তাদের আসল চাওয়া। বিচার হতে হবে তাদের ধ্বংস করার জন্য। তাদের বাঁচিয়ে রাখার জন্য নয়; বিচারের মাধ্যমে তাদের নির্দোষ ঘোষনা করার জন্য নয়। যে বিচারে জামায়াত শিবির উৎখাত হবেনা, তাদের ধ্বংস এবং নির্মূল হবেনা, জামায়াত শিবির ধনে প্রানে মরবেনা সে বিচার কোন বিচারই নয়। সে বিচার মানা যাবেনা।
যুদ্ধাপরাধের নামে ট্রাইব্যুনালে যাদের বিচার করা হচ্ছে, তাদের দল, তাদের পক্ষে নিযুক্ত আইনজীবীদের পক্ষ থেকে বার বার দাবি করা হয়েছে ট্রাইব্যুনালে বিচারের নামে সাজানো নাটক চলছে। বিচারের নামে এমন সাজানো নাটক পৃথিবীর ইতিহাসে আর কখনো মঞ্চস্ত হয়নি। সরকারের নির্দেশে এ বিচার নাটক মঞ্চস্ত হচ্ছে। বিচারের নামে সরকার তাদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামকে ধ্বংস করতে চায়; তাদের শায়েস্তা করতে চায়। রাজনৈতিক উদ্দেশে আয়োজন করা হয়েছে এ বিচার; ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য নয়। তাই এখানে ন্যায় বিচার পাবার কোন আশা নেই। তারা বারবার ট্রাইব্যুনালকে অবৈধ আখ্যায়িত করে একে ভেঙ্গে দেয়ারও দাবি জানিয়েছে। অনেকে এ বিচারকে আখ্যায়িত করেছেন দুটি প্রতিপক্ষ দলের মধ্যে রাজনৈতিক লড়াইয়ের অংশ হিসেবে।
আসামী পক্ষের এ দাবির সাথে শাহবাগ জমায়েতের দাবি এবং দাবির চরিত্রের আশ্চর্য মিল রয়েছে। শাহবাগ জমায়েত থেকে দাবি করা হচ্ছে বিচার নয় ফাঁসি দিতে হবে। যে বিচারই করা হোক না কেন তার মাধ্যমে জামায়াত শিবিরকে খতম করতে হবে। আর আসামী পক্ষ থেকেও অভিযোগ করা হয়েছে বিচারের নামে জামায়াতকে ধ্বংসের সাজানো নাটক মঞ্চস্ত করা হচ্ছে। এ দাবি শুধু যে আসামী পক্ষ এতদিন ধরে করে আসছে তা নয় বরং বিশ্বের বিভিন্ন নামকরা বড় বড় সংস্থা, সংবাদপত্র এবং সংবাদ মাধ্যম থেকেও এ অভিযোগ করা হয়েছে। বর্তমান সরকার তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ধ্বংস এবং শায়েস্তা করতে ট্রাইব্যুনালকে ব্যবহার করছে বলে সরাসরি অভিযোগ করেছে ইকোনমিস্টের মত সাময়িকী।
আসামী পক্ষ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এতদিন ধরে বিচারের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ করে আসছিল তার প্রমান মিলল শাহবাগ জমায়েতের দাবি, ভাষা এবং স্লোগানের মাধ্যমে। ট্রাইব্যুনালের বিরুদ্ধে আসামী পক্ষের অভিযোগ এবং আশঙ্কা স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠেছে শাহবাগের সমাবেশের দাবির চরিত্র থেকে। আর তাহল বিচার নয়, বিচারের নামে প্রতিপক্ষকে ধ্বংসই তাদের আসল লক্ষ্য।
দুই পক্ষের দাবির মিল এখানেই শেষ হয়নি। স্কাইপ কেলেঙ্কারি, সেফ হাউজ কেলেঙ্কারিসহ নানা অভিযোগে অনেক দিন ধরে আসামী পক্ষ থেকে পুনরায় বিচার এমনকি ট্রাইব্যুনাল ভেঙ্গে দেয়ারও দাবি করে আসছিল। তারা নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন বিচার দাবি করেছে বার বার। এবার শাহবাগ জমায়েত থেকেও দাবি করা হয়েছে আবার বিচার করতে হবে। কাদের মোল্লার এ রায় তারা মানোন। ট্রাইব্যুনাল আইন রাজাকারদের পক্ষের আইন। এ আইন সংশোধন করতে হবে। তাদের দাবির মুখে শেষ পর্যন্ত আইনপ্রতিমন্ত্রী অ্যডভোকেট কামরুল ইসলাম আইন সংশোধনের ঘোষনাও দিয়েছেন। আসামী পক্ষসহ বিশ্বের অনেক সংগঠনের পক্ষ থেকেও অনেক দিন ধরে ট্রাইব্যুনাল আইন সংশোধনের দাবি করে আসছিল।
শাহবাগ জমায়েতের দাবি, স্লোগান, এবং পোস্টারের ভাষা কতখানি শোভন অশোভন, আদালত অবমাননার পর্যায়ে পড়ে কি-না সে অভিযোগও উঠেছে। ট্রাইব্যুনালের বিচার নিয়ে কথা বলার কারনে এ পর্যন্ত কতজনকে যে সতর্ক করা হয়েছে এবং ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে তা খাতা কলম নিয়ে হিসাব না করে বলা মুশকিল। সে প্রেক্ষিতে শাহবাগের এ দাবি বিষয়ে অনেকে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন এসব দাবি কি আদালত অবমাননার মধ্যে পড়েনা? ফাঁসি না হলে তারা রায় মানবেননা, ফাঁসিই দিতে হবে এটা কেমন দাবি? ফাঁসি ছাড়া যদি আর কোন কিছু গ্রহণযোগ্য না হয় তাহলে বিচারের দরকার কি? ফাঁসি দিয়ে দিলেই তো হয়। এত আয়োজনের কি প্রয়োজন ছিল? এসব প্রশ্ন করেছেন অনেকে। শাহবাগ জমায়েতে এসব দাবি যারা করছেন তারা এ বিচারের পক্ষের লোক। তাদের অনেকের পরিচয় সরাসরি সরকারি দলের সমর্থক, কেউ কোন না কোন বাম দলের সমর্থক; যেসব বাম দলের বেশ কয়েকটি আবার সরকারের সাথে জোটে রয়েছে। তাদের এ দাবি অনেক আগে থেকেই হয়ত বুঝতে পেরেছিলেন যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে বন্দী সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর স্ত্রী ফারহাত কাদের চৌধুরী। তিনি বলেছিলেন বিচারের দরকার নেই। পল্টনে নিয়ে ফাঁসি দিয়ে দিন। তাতে সরকারের সময় এবং টাকা দুই-ই বাঁচবে।
হারিয়ে গেল পাকিস্তান এবং ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধী সেনা কর্মকর্তা :
স্বাধীনতার মাস মার্চ এবং বিজয়ের মাস ডিসেম্বর আসলে বাংলাদেশের সব টিভি চ্যানেলে মুক্তিযুদ্ধের ওপর ধারাবাহিক বিশেষ অনুষ্ঠান/সংবাদ প্রচার করা হয়। সংবাদপত্রেও একইভাবে মুক্তিযুদ্ধের ওপর খবর প্রকাশ করা হয় মাসজুড়ে। এসব খবরে মুক্তিযুদ্ধের প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখানো হয় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে। জামায়াত নেতাদের বিকৃত ছবি দানব আকারে তুলে ধরা হয়। গত তিন বছর যুদ্ধপরাধের বিচার চলাকালে প্রতিদিন এর ওপর যেসব খবর প্রকাশিত এবং প্রচারিত হয়েছে তাতেও প্রাধান্য পেয়েছে এ বিষয়টি। এসব দেখে দেখে সৈয়দ সাইফুল আলম শোভন নামে একজন সাধারন দর্শক একটি প্রশ্ন করেছেন। প্রশ্নটি হল ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধটা আসলে হয়েছিল কাদের মধ্যে? মুক্তিযোদ্ধা এবং জামায়াতের মধ্যে না মুক্তিযোদ্ধা এবং পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মধ্যে? আর যুদ্ধটাইবা হয়েছিল কাদের বিরুদ্ধে? জামায়াতের বিরুদ্ধে না পাকিস্তানের বিরুদ্ধে? ইতিহাসে আমরা তো পড়েছি মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল পাকিস্তানের বিরুদ্ধে এবং পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধেই লড়াই করেছিলেন আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা। কিন্তু কই, মার্চ মাস, ডিসেম্বর মাসে টিভিতে মুক্তিযুদ্ধের ওপর যে খবর বলা হয় তাতেতো পাকিস্তানের কথা সেভাবে বলা হয়না যেভাবে বলা হয় জামায়াত এবং রাজাকারদের কথা? আমরাতো ইতিহাসে পড়েছি আসল যুদ্ধাপরাধী ছিল পাকিস্তান সেনাবাহিনী। ১৯৫ জন পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে চিহ্নিতও করা হয়েছিল। কই, তাদের অপরাধের কথাতো সেভাবে বলা হয়না যেভাবে বলা হয় জামায়াতের বর্তমান নেতাদের বিরুদ্ধে এবং রাজাকারদের বিরুদ্ধে? বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধারা এতবড় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করল এবং যে পাকিস্তান সেনাবাহিনী এতবড় ধ্বংসযজ্ঞ পরিচালনা করল তা সব নাই হয়ে গেল? যেভাবে এখন প্রচারনাটা চালানো হচ্ছে, যেভাবে ইতিহাসকে তুলে ধরা হচ্ছে তাতে মনে হচ্ছে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধটা হয়েছিল জামায়াতে ইসলাম এবং রাজাকারদের বিরুদ্ধে পাকিস্তান এবং পাকিস্তান সেনাবাহিনরি বিরুদ্ধে নয়। একজন সাধারন পাঠক এবং দর্শকের এই উপলব্ধির কি ব্যাখ্যা দেয়া যাবে? এর জবাব কি?
সৈয়দ সাইফুল আলম শোভনের মতে ১৯৭১ সালে পাকিস্তান নিজের দেশ এবং নিজের মানুষদের রক্ষা না করে তাদের ওপর খতমনীতি পরিচালনা করেছিল। নিজের ঘরের মানুষদের তারা নিজেরা হত্যা করেছে, ধর্ষণ করেছে। নিজের ঘরে নিজেরা আগুন দিয়েছে। সেই পাপের শাস্তি পাকিস্তান আজো ভোগ করে চলছে। আজ যদি আমাদেরকে সেই ইতিহাস পাশ কাটিয়ে ভুল ইতিহাস শেখানো হয় তাহলে তার শাস্তিও একদিন আমাদের পেতে হতে পারে। সৈয়দ সাইফুল আলম শোভন বলেন, আমি বলছিনা পাকিস্তানের এদেশীয় সহযোগীরা কোন অপরাধ করছেনা। কিন্তু কার অপরাধের মাত্রা কতটুকু সে বিবেচনাবোধ যেন আমরা হারিয়ে ফেলছি।
আজকের তরুন প্রজন্মের মাথার ভেতর কৌশলে ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে বাংলাদেশ নামক এই দেশ, বাঙ্গালী নামক এই জাতির চির দুশমন, চির শক্রু হল জামায়াতের এই এই লোকগুলো। এদের মত খারাপ মানুষ পৃথিবীতে আর দ্বিতীয়টি নেই। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে যত অপরাধ সংঘটিত হয়েছে তার জন্য শুধুমাত্র তারাই দায়ী। এই যদি হয় তাদের চিন্তা ধারণা তাহলে যে তরুন প্রজন্ম তাদের বিনাশের দাবিতে রাজপথে অবস্থান নিয়েছে তাদের দোষ দেয়া যায়না।
কিন্তু আসল বাস্তবতা কি? চলুন একটু পেছন ফিরে দেখা যাক আসল যুদ্ধাপরাধী ছিল কারা এবং কারা কিভাবে তাদের ক্ষমা করেছিল । আর এখন ৪১ বছর পর কিভাবে মূল যুদ্ধাপরাধীদের বাদ দিয়ে দেশীয় কয়েকজন সহযোগীকে বিচারের কাঠগড়ায় দাড় করিয়ে ইতিহাসের দায় এবং কলঙ্কমুক্তির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
যুদ্ধাপরাধী কারা এবং কারা তাদের ক্ষমা করেছিল?
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে মানবতার বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের দায়ে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের উদ্যোগ নেয় স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশ সরকার। বেসামরিক নাগরিক হত্যা, ধর্ষন, লুটাপাট এবং অগ্নিসংযোগের মত মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের জন্য ১৯৫ জন পাকিস্তানী যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান এবং অন্যান্য কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ বারবার বিভিন্ন জনসভায় দৃঢ প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন । কিন্তু ১৯৭৪ সালে তাদের সকলকে ক্ষমা করে দেয়া হয়।
যুদ্ধাপরাধীদের বাছাই করার জন্য স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি বিচার বিশ্লেষন করে যুদ্ধাপারধীদের একটি তালিকা তৈরি করে। প্রথমে ৪০০ এবং পরে তা থেকে ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীর একটি চূড়ান্ত তালিকা তৈরি করে। এরা সকলেই ছিল পাকিস্তানী উচ্চ পদস্থ সেনা কর্মকর্তা যারা বাংলাদেশে যুদ্ধ পরিচালনার দায়িত্বে ছিল। ১৯৭৩ সালের ১৭ এপ্রিল সরকার যুদ্বাপরাধী হিসেবে ১৯৫ জন পাকিস্তানী সেনা কর্মকর্তার চূড়ান্ত তালিকা তৈরি এবং তাদের বিচারের কথা ঘোষনা করে। ১৮ এপ্রিল দৈনিক বাংলা পত্রিকায় এ বিষয়ে পরিবেশিত খবরে বলা হয়- “তদন্ত শেষে স্বাক্ষী প্রমানের ভিত্তিতে ১৯৫ জন ব্যক্তির বিচার অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত হয়েছে। তাদের অপরাধের মধ্যে রয়েছে গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ, জেনেভা কনভেনশনের ৩ নং ধারা লঙ্ঘন, নরহত্য, বলাৎকার ও বাড়িঘর পোড়ানো। ঢাকার বিশেষ ট্রাইব্যুনাল তাদের বিচার করবে। মে মাসের শেষের দিকে তাদের ট্রাব্যুনালের সামনে হাজির করা হতে পারে।”
যুদ্ধাপরাধী পাকিস্তানী এসব সেনা কর্মকর্তার বিচারের জন্য ১৯৭৩ সালের ১৮ জুলাই ‘ইন্টারন্যাশনাল ওয়ার ক্রাইমস (ট্রাইবিউনালস ) এ্যাক্ট আইন পাশ হয় সংসদে।
পকিস্তানী এসব সেনাকমর্তাদের তখন মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের জন্যই যুদ্ধাপরাধী হিসেবে সাব্যস্থ করা হয়। বিভিন্ন পত্রপত্রিকার প্রতিবেদন, নেতৃবৃন্দের বক্তব্য এবং ভারত-পাকস্তান ও বাংলাদেশের মধ্যে অনুষ্ঠিত ত্রিদেশীয় ক্ষমা বিষয়ক চুক্তিতে তার নজীর রয়েছে। মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের জন্য এসব যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে সে সময়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ যে দাবি এবং প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছিলেন তার কয়েকটি উদাহরণ সে সময়ের সংবাদপত্র থেকে এখানে তুলে ধরা হল।
দৈনিক বাংলায় ১৯৭২ সালের ৩ জুলাই একটি খবরের হেডলাইন হল “যুদ্ধবন্দীদের বিচার হবেই-কুষ্টিয়া জনসভায় বঙ্গবন্ধু।” ঐ বছর ৩০ নভেম্বর একই পত্রিকার আরেকটি খবরের শিরোনাম হল “হত্যা ধর্ষণ লন্ঠনকারী যুদ্ধাপরাধীদের রেহাই দেয়া হবেনা-পাবনার জনসভায় মনসুর আলী।” খবরে লেখা হয় যোগাযোগমন্ত্রী ক্যাপ্টন মনসুর আলী বলেন, পাকিস্তানী বর্বর সৈন্যরা এখানে মানবতা বিরোধী জঘন্যতম অপরাধেথ লিপ্ত হয়েছিল। মানবতার স্বার্থেই তাদের বিচার করা উচিত।
দৈনিক বাংলা, ৭ জুন ১৯৭২: শীঘ্রই যুদ্ধাপরাধীদের প্রকাশ্যে বিচার করা হবে। কুয়লালামপুরে সাংবাদিকদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সামাদ আজাদ।
১৯৭৩ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি দৈনিক বাংলা পত্রিকার আরেকটি খবরের শিরোনাম হল “বাংলার মাটিতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হবেই- টাঙ্গাইলে বঙ্গবন্ধু।” একই বছর ঐ পত্রিকার আরেকটি খবরের শিরোনাম হল “১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীর বিচার হবেই-নয়া দিল্লীতে বঙ্গবন্ধু।”
এভাবে ১৯৭২ এবং ১৯৭৩ সালের বিভিন্ন পত্রিকায় থেকে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বিষয়ে তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের অসংখ্য দৃড় প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করার উদাহরণ দেয়া যায়।
কিন্তু ১৯৭৪ সালের ৯ এপ্রিল দিল্লীতে ভারত-পাকিস্তান এবং বাংলাদেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত ত্রিদেশীয় চুক্তির মাধ্যমে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের সাথে জড়িত এসব যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষমা ঘোষনা করা হয়। চুক্তির ১৩, ১৪ এবং ১৫ দফায় বলা হয়েছে “পাকিস্তান স্বীয় সামরিক বাহিনীর অপরাধের নিন্দা জ্ঞাপন ও উহার জন্য গভীর অনুশোচনা ও দুংখ প্রকাশ করেছে। ইসলামাবাদ সরকারের এই মনোভাব এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোর ‘ক্ষমা করো এবং ভুলে যাও’ আবেদনের প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ সরকার ১৯৫ জন পাকিস্তানী যুদ্ধপারাধীর বিচার না করে ক্ষমা প্রদর্শনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অত:পর অন্যান্য যুদ্ধবন্দীদের সাথে তাদেরও ভারত হতে পাকিস্তানে ফেরত পাঠানো হবে। উপমাহাদেশে শান্তি, স্থিতি এবং অগ্রগতির লক্ষ্যে এ চুক্তি করা হয়েছে।”
১৯৭৪ সালের ১২ এপ্রিল দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় প্রকাশিত একটি খবরের শিরোনাম হল “ক্ষমা প্রদর্শন করিয়া আমরা বিশ্বের প্রশংসা অর্জন করিয়াছি-ড. কামাল হোসেন”। প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে-“পররাষ্ট্র মন্ত্রী ড. কামাল হোসেন বলিয়াছেন, বাংলাদেশের জনগণের উপর সামরিক বাহিনী যে অত্যাচার করিয়াছে পাকিস্তান সরকার সেজন্য দোষ স্বীকার করিয়া লইয়াছেন, ক্ষমার আবেদন জানাইয়াছেন। ঐ দেশের প্রধানমন্ত্রী সমগ্র বাঙ্গালী জাতির কাছে ক্ষমা চাহিয়াছেন। আমরা সুবিচার প্রতিষ্ঠা করিতে চাহিয়াছিলাম, প্রতিহিংসা চাইনা। ক্ষমা চাওয়া হইয়াছে ক্ষমা দেওয়া হইয়াছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রী বলিয়াছেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করিলে তিনটি বিষয় প্রতিষ্ঠা করা যায়। প্রথমত ইতিহাসে ইহার স্থান দেওয়া, দ্বিতীয়ত যে দেশের লোক এই অন্যায় করিয়াছে তাহা প্রমান করা এবং তৃতীয়ত আমাদের অবর্ণনীয় ক্ষয়ক্ষতির প্রমান দেওয়া। যেহেতু এ ব্যাপারে পাকিস্তান সরকার কোন চ্যালেঞ্জ করেনাই বরং সকল অন্যায় স্বীকার করিয়া নিয়াছে তখন আর বিচার করার সঙ্গত কোন কারণ নাই। এতে কোন লাভ হইবে না। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বন্ধ করায় বাংলাদেশ বিশ্বের প্রশংসা অর্জন করিয়াছে। এর ফলে উপমহাদেশে স্বাভাবিকতা ফিরিয়া আসিবে। এটা সকলে চায়। দিল্লী চুক্তি সকলে গ্রহণ করিয়াছে।”
যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষমা করা বিষয়ক ১৬ দফার ত্রিপাক্ষিক চুক্তির তিনটি মূল কপি দিল্লী, ইসলামাবাদ এবং ঢাকা থেকে একযোগে পূর্ণ বিবরণসহ প্রকাশিত হয়। চুক্তি ১৩ দফায় লেখা হয়েছে-“বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী (ড. কামালা হোসেন) বলেন যে, পাকিন্তানী যুদ্ধাপরাধীরা বিভিন্ন ধরণের অপরাধ যেমন যুদ্ধাপরাধ, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ এবং গণহত্যার মত অপরাধ করেছে।”
আজ মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের দায়ে যে বিচারের কথা বলা হচ্ছে তাও মূলত ঐ পাকিস্তানী ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষেত্রেই প্রয়োগ করা হয়েছে চুক্তিতে।
১৯৭৪ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি লাহোরে এক সংবাদ সম্মেলনে জুলফিকার আলী ভুট্টো বলেন, “ যুদ্ধাপরাধের দয়ে ১৯৫ জন যুদ্ধবন্দীর পরিকল্পিত বিচার বাতিল করা হইবে এই মর্মে দৃঢ় আশ্বাসের বিনিময়ে তিনি বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দান করিবেন। এই প্রতিশ্রুতি কেবল বাংলাদেশকই দিতে হইবে এমন কোন কথা নয়। যেকোন দেশ এই প্রতিশ্রুতি দিতে পারে।” সূত্র ইত্তেফাক, ১৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৪)।
সব কিছু মিলিয়ে বাংলাদেশ যুদ্ধাপরাধীরে ক্ষমার পক্ষে অবস্থান নেয়।
১৯৭২ সালের ১৯ নভেম্বর জুলিও কুরি শান্তি পদক লাভ উপলক্ষে আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধু ভুট্টোর উদ্দেশে বলেন “গণহত্যাকারীরা প্রকাশ্যে মাফ চাও, বাঙ্গালী ক্ষমা করতেও পারে।” এ থেকে বোঝা যায় বঙ্গবন্ধু তাদের মাফ করার পক্ষেই ছিলেন। (সূত্র দৈনিক বাংলা ২০ নভেম্বর,৭২) ।
১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষমার জন্য ত্রিদেশীয় চুক্তি :
১৯৭৪ সালের ৯ এপ্রিল বাংলাদেশ ভারত এবং পাকিস্তানেবর মধ্যে ত্রিদেশীয় দিল্লী চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি অনুযয়ী বাংলাদেশে ১৯৭১ সালের যুদ্ধে গণহত্যা, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ এবং যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত ১৯৫ জন পাকিস্তানী সেনাকর্মকর্তাকে ক্ষমা করে বাংলাদেশ। চুক্তিতে বলা হয়েছে, ১৯৭১ সালের বেদনায়ক ঘটনার কারণে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে বাংলাদেশের কাছে ‘ক্ষমা কর এবং ভুলে যাও’ আবেদনের প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ তাদের বিচার না করে ক্ষমা করে দিয়েছে। যুদ্ধের কারণে ভারতে আটক ৯২ হাজার পাকিস্তানী সৈন্যসহ ৩০ লাখের উপরে বেসামরিক নাগরিক তখন তিন দেশে আটকা পড়ে ছিল । ১৯৭১ সালের যুদ্ধের পরপরই ১৯৭২ সালে ভারত- পাকিস্তানের মধ্যে সিমলা চুক্তি স্বাক্ষর হয় এবং চুক্তিতে দুই দেশের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক এবং সম্প্রীতি স্থাপনে সব ধরণের প্রতিশ্রুতির কথা ব্যক্ত করা হয় উভয় দেশের পক্ষ থেকে। কিন্তু তার কোনটিই বাস্তবায়ন সম্ভব হয়না বাংলাদেশকেন্দ্রিক যুদ্ধউত্তর সমস্যার সমাধান না হওয়ায় । যুদ্ধউত্তর সমস্যার সমাধান এবং তা নিয়ে তিন দেশের মধ্যে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি নিরসনে ১৯৭২ সাল থেকে দফায় দফায় আলোচনাসহ নানামুখী উদ্যোগ নেয়া হয় এবং সবশেষে তা পূর্ণতা পায় ১৯৭৪ সালের ত্রিদেশীয় চুক্তির মাধ্যমে। চুক্তিটি স্বাক্ষরের পর দিল্লী, ইসলামাবাদ এবং ঢাকা থেকে তা একযোগে প্রকাশ করা হয়। চুক্তিতে মোট ১৬টি দফা ছিল।
১৩ দফায় বলা হয় “উপমহাদেশে শান্তি এবং সমৃদ্ধির লক্ষ্যে এবং তিন দেশের মধ্যে আশু বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ও সম্প্রীতি স্থাপনের লক্ষ্যে ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীদের বিষয়টি নিয়ে তিন দেশের তিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আলোচনা করেণ। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. কামাল হোসেন বৈঠকে বলেন যে, জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে গৃহীত প্রস্তাব, আন্তর্জাতিক আইন, যুদ্ধাপরাধ, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ এবং গণহত্যাজনিত অপরাধ বিষয়ে যত আইন আছে তার সবগুলোর বিবেচনাতেই ১৯৫ জন পাকিস্তানী সৈন্য অপরাধী । ঐসব আইনে যুদ্ধাপরাধ, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ, গণহত্যার সংজ্ঞায় যেসব অপরাধের নাম আছে এবং যারা ঐসব অপরাধ করবে তাদের যথাযথ আইনী প্রকৃয়ায় বিচারের আওতায় আনার বিষয়ে সারা বিশ্ব সর্বসম্মতভাবে একমত। আর ১৯৫ জন পাকিস্তানী সৈন্য ঐসব আইনে বর্ণিত অনেক অপরাধ করেছে। পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এসব ঘটনাকে তার সরকার কঠোরভাবে নিন্দা জানায় এবং এ জাতীয় অপরাধ হয়ে থাকলে তার জন্য পাকিস্তান গভীরভাবে অনুতপ্ত।
১৪ তম দফায় বলা হয় “তিন মন্ত্রী একমত হন যে, উপমহাদেশে শান্তি ও অগ্রগতির স্বার্থে তিন দেশের মধ্যে যে সমঝোতা চুক্তি হয়েছে তার আলোকেই ১৯৫ জন সৈনিকের বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত। পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান যে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রনে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শীঘ্রই বাংলাদেশ ভ্রমনে যাবার ঘোষনা দিয়েছেন এবং আপনার দেশের নাগরিকদের কাছে ক্ষমা প্রার্থনার আবেদন জানাবেন । একইভাবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী পাকিস্তানীদের প্রতি ক্ষমা প্রার্থনার আহবান জানিয়ে ঘোষনা দিয়েছিলেন যে, বাংলাদেশের মানুষ ক্ষমা করতে জানে। তাই নতুন করে আবার সবকিছু শুরু করার জন্য ১৯৭১ বাংলাদেশে যে বর্বরতা এবং ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ হয়েছে তা তিনি তার দেশের নাগরিকদের ভুলে যাওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন।
১৫ তম দফায় বলা হয়- ‘ক্ষমা করো এবং ভুলে যাও’ বাংলাদেশের প্রতি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর এই আবেদন এবং মনোভাবের প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ সরকার ১৯৫ জন পাকিস্তানী যুদ্ধপারাধীর বিচার না করে ক্ষমা প্রদর্শনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে ঘোষনা করেণ বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। অত:পর দিল্লী সমঝোতার আলোকে অন্যান্য যুদ্ধবন্দীদের সাথে এই ১৯৫ জন সেনাকর্মকর্তাদেরও ভারত হতে পাকিস্তানে ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়।
চুক্তিতে স্বাক্ষর করেণ: ড. কামাল হোসেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী, বাংলাদেশ সরকার, সরদার শরণ সিং, বিদেশমন্ত্রী, ভারত সরকার এবং আজিজ আহমেদ, পররাষ্ট্র এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রী, পাকিস্তান সরকার।
রাজাকার থেকে যুদ্ধাপরাধ, যুদ্ধাপরাধ থেকে মানবতাবিরোধী অপরাধ
জামায়াতের লোকজনকে আগে বলা হত রাজাকার। এরপর বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর তাদের বলতে শুরু করল যুদ্ধাপরাধী। সর্বশেষ তাও বদলে দিয়ে বলা শুরু করল মানবতা বিরোধী অপরাধী।
যুদ্ধাপরাধী, মানবতাবিরোধী অপরাধী এবং মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর এদেশীয় সহযোগী সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি বিষয় । সেজন্য তাদের বিচারের জন্য দুটি পৃথক আইন হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানী সহযোগীদের বিচারের জন্য ১৯৭২ সালে করা হয় দালাল আইন । আর যুদ্ধাপরাধী এবং মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচারের জন্য ১৯৭৩ সালে করা হয় ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস (ট্রাইব্যুনালল) এ্যাক্ট। যুদ্ধাপরাধী এবং মানবতা বিরোধী অপরাধী হিসেবে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার যাদের চিহ্নিত করেছিল তারা সকলেই (১৯৫ জন) ছিল পাকিস্তানী সেনা কর্মকর্তা, এদেশীয় কোন সহযোগী বা রাজাকার, শান্তি কমিটির লোকজন নয়।
বর্তমান সরকার এদেশীয় সহযোগীদের যুদ্ধাপরাধী হিসেবে বিচারের উদ্যোগ নিয়েছে। যুদ্ধপারধী বলতে যেহেতু পাকিস্তানী সেনা কর্মকর্তাদের বোঝায় তাই সরকার যুদ্ধাপরাধী শব্দের বদলে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ শব্দটি ব্যবহারের কৌশল নিয়েছে। কিন্তু মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধী বলতেও মূলত পাকিস্তানী ঐ সেনাকর্মকর্তাদেরই বোঝানো হয়েছে সবসময়। অতীতে কখনোই পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর এদেশীয় সহযোগী, রাজাকার, শান্তি কমিটির লোকদের যুদ্ধাপরাধী বা মনাবতার বিরুদ্ধে অপরাধী হিসেবে অভিহিত করা হয়নি। এমনকি বর্তমানে যাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে তাদের তো নয়ই। ১৯৭৪ সালে ভারত-পাকিস্তান-বাংলাদেশের মধ্যে অনুষ্ঠিত ত্রিদেশীয় চুক্তি, বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক প্রণীত যুদ্ধাপরাধীদের তালিকা, পাকিস্তানের হামুদুর রহমান কমিশন রিপোর্ট, দালাল আইন, দালাল আইনে করা অসংখ্য মামলা এবং সেসময়কার পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত খবরা-খবর এর স্বাক্ষর বহন করছে।
স্বাধীনতা লাভের দেড় মাসের মধ্যে ১৯৭২ সালের ২৪ জানুয়ারি বাংলাদেশ কোলাবোরেটরস (স্পেশাল ট্রাইব্যুনালস) অর্ডার নামে এ দালাল আইন প্রণয়ন করা হয়। দালাল আইনে এক লাখেরও বেশি লোক গ্রেফতার করা হয়।
দালাল আইন প্রণয়নের সাথে সাথে সারা দেশে তখন ব্যাপক ধরপাকড় এবং গ্রেফতার অভিযান শুরু হয়ে যায়। ১৯৭২ সালের অক্টোবর মাস পর্যন্ত ৪১ হাজার দালাল গ্রেফতার হবার কথা জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল মান্নান (৪ অক্টোবর, দৈনিক বাংলা) । তখনকার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী আব্দুল মালেক উকিল কর্তৃক প্রদত্ত তথ্য এবং স্বাধীনতা পরবর্তী বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে দেখা যায় দালাল আইনে লক্ষাধিক লোক গ্রেফতার হয়। তার মধ্যে ৩৭ হাজার ৪৭১ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়। অভিযুক্ত এ ৩৭ হাজারের মধ্য থেকে ৩৪ হাজার ৬২৩ জনের বিরুদ্ধে স্বাক্ষী প্রমান না থাকায় কোন মামলা দায়ের করা সম্ভব হয়নি। ২ হাজার ৮৪৮ জনকে বিচারের জন্য সোপর্দ করা হয়। বিচারে ৭৫২ জনের শাস্তি হয় এবং বাকী এক লাখ বন্দীদের বেকসুর খালাস দেয়া হয়।
সারা দেশে ব্যাপকভাবে দালাল আইনে ধরপাকড়ের ফলে সদ্য স্বাধীন যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশে একটা অস্থির পরিবেশ সৃষ্টি হয়। ধরপাকড়দের মধ্যে সরকারি কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন শ্রেণী পেশার লোক থাকায় সরকারি কাজকর্মেও বিশৃংখলা এবং নৈরাজ্য দেখা দেয়। স্বাধীনতা যুদ্ধে বিরোধীতা করছে কিন্তু কোন অপরাধমূলক কাজে অংশ নেয়নি এমন লোকদেরও বিভিন্ন অভিযোগের ভিত্তিতে ব্যাপকভাবে গ্রেফতার চলতে থাকে। অসংখ্য লোক গ্রেফতার এড়াতে আত্মপোগন করে। সব মিলিয়ে দেশে এক ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় যা একটি সদ্য স্বাধীন দেশ গড়ার পক্ষে বিরাট অন্তরায় হয়ে দেখা দেয়। নতুন করে হানাহানি, বিভক্তি, অনৈক্য এবং প্রতিহিংসা মাথচাড়া দিয়ে ওঠে। বিভিন্ন মহল থেকে দালাল আইনের বিরুদ্ধে কথা ওঠে এবং এ আইন সংশোধনের প্রস্তাব দেয়া হয়। এমনি পরিস্থিতিতে আসে সাধারণ ক্ষমার বিষয়। দেশের সকল অনৈক্য বিভক্তি, সন্দেহ মুছে ফেলে সবাইকে একতাবদ্ধ হয়ে দেশ গড়ার কাজে ঝাপিয়ে পড়ার জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৩ সালের ৩০ নভেম্বর সাধারণ ক্ষমা ঘোষনা করেন।
১৯৭৩ সালের পয়লা ডিসেম্বর দৈনিক সংবাদ পত্রিকায় এ বিষয়ে পরিবেশিত খবরে বলা হয় “সরকার দালাল আইনে সাজাপ্রাপ্ত এবং বিচারাধীন সকল আটক ব্যক্তির প্রতি সাধারণ ক্ষমা ঘোষনা করেছেন। তবে ধর্ষণ, হত্যা, অগ্নিসংযোগের অভিযোগে যারা সাজা ভোগ করছে কিংবা বিচারাধীন রয়েছে তাদের ক্ষেত্রে এ ক্ষমা প্রদর্শণ কার্যকর হবেনা। তৃতীয় বিজয় দিবস উৎসবে যাতে তারা শরীক হতে পারে সেজন্য ১৬ ডিসেম্বরের আগেই শেখ মুজিবুর রহমান তাদের মুক্তির ব্যবস্থার নির্দেশ দিয়েছেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে। যারা পলাতক তারা আদালতে উপস্থিত হয়ে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করলেই এ ক্ষমার আওতায় পড়বে।”
মানবতা বিরোধী অপরাধের আইনে দেশীয় সহযোগীদের বিচার :
মুক্তিযুদ্ধে এদেশীয় সহযোগীদের বিচারের জন্য হয়েছিল দালাল আইন। আর পাকিস্তানী সেনাকর্মকর্তাদের যুদ্ধাপরাধের/ মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে বিচারের জন্য হয়েছিল ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস (ট্রাইব্যুনালস) এ্যাক্ট। দুটি আইনের উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন । দালাল আইনে এদেশীয় সহযোগীদের বিচার ফয়সালা হয়েছে। কিন্তু যুদ্ধাপরাধী আইনে পাকিস্তানী যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হয়নি । তাদের সবাইকে ক্ষমা করা হয়। এখন পাকিস্তানী সেনা কর্মকর্তাদের বিচারের জন্য যে আইন হয়েছিল সেই আইন ২০০৯ সালে সংশোধন করে এদেশীয় সহযোগীদের বিচারের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ১৯৭৩ সালের আইনে সশস্ত্র বাহিনী, প্রতিরক্ষা বাহিনী বা সহায়ক বাহিনীর সদস্যদের বিচারের কথা বলা হয়েছিল। ২০০৯ সালে তা সংশোধন করে একক ব্যক্তি বা ব্যক্তি গোষ্ঠী (রহফরারফঁধষং ড়ৎ মৎড়ঁঢ় ড়ভ রহফরারফঁধষং) শব্দগুলি সংযোজন করে এদেশীয় সহযোগীদের বিচারের উদ্যোগ নেয়া হয়। একজনের বিচারের জন্য তৈরি আইনের মাধ্যমে অন্য আরেকজনের বিচারের উদ্যোগ নেয়ায় শুরু থেকে এ নিয়ে অনেক বিতর্ক এবং সমালোচনা ওঠে। সব কিছু উপক্ষো করে ২০১০ সালের মার্চ মাসে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। বর্তমানে এ ট্রাইব্যুনালের অধীনে যারা বন্দী রয়েছেন বিচার ও বিচার প্রকৃয়া চলছে তারা হলেন জামায়াতের সাবেক আমীর অধ্যাপক গোলাম আযম, বর্তমান আমীর মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী, সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, ্নায়েবে আমির মাওলানা আব্দুস সোবহান, আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল এটিএম আজহারুল ইসলাম, সহকারি সেক্রেটারি জেনারেল মুহম্মদ কামারুজ্জামান, আব্দুল কাদের মোল্লা, জামায়াতের নির্বাহী পরিষদের সদস্য মীর কাসেম আলী, বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী এবং সাবেক বিএনপি মন্ত্রী আব্দুল আলীম প্রমুখ। এদের মধ্যে আব্দুল কাদের মোল্লা এবং পলাতক থাকা অবস্থায় অপর মাওলানা আবুল কালাম আযদের বিচার শেষে রায় ঘোষনা করা হয়েছে। গত ৫ ফ্রেব্রুয়ারি আব্দুল কাদের মোল্লার যাবজ্জীন কারাদন্ডের রায় ঘোষনার পর তা প্রত্যাখ্যান করে তার ফাঁসির দাবিতে শাহবাগে জমায়েত থাকেন তরুন প্রজন্ম।
দায়মুক্তি কতটুকু : ১৯৭১ সাল আমাদের জাতির জন্য যেমন গৌরবের তেমনি কলঙ্কের এবং গভীর বেদনার। গৌরবের কারণ আমরা স্বাধীনতা লাভ করেছি। আর কলঙ্কের এবং গভীর বেদনার কারণ অগনিত মাতা ভগ্নির গায়ে এখনো ইজ্জত হারানো কলঙ্কের দাগ লেগে আছে। স্বজন হারানো গভীর বেদনা এখনো অনেকে বয়ে বেড়াচ্ছেন। গনহত্যা, হত্যা এবং ধ্বংসের নারকীয় বিভীষিকা আজো তাড়িত করে আমাদের। জীবন দিতে হযেছে লক্ষ লক্ষ মানুষকে। যারা স্বজন হারিয়েছে তাদের স্বজনরা আর কোনদিন ফিরে আসবেনা। কিন্তু এজন্য দায়ীদের উপযুক্ত শাস্তি প্রদানের মাধ্যমে তারা কিছুটা হলেও শান্তি এবং সান্তনা পেতে পারেন এটা অবশ্যই সত্য। মাওলানা আবুল কালাম আযাদের অনুপস্থিতিতে তাকে ফাঁসির রায় প্রদানের পর একটি পত্রিকা হেডলাইন লিখেছিল ইতিহাসের দায় মেটাল বাংলাদেশ। কিন্তু আসলেই কি বাংলাদেশ এর মাধ্যমে এবং পাকিস্তানী আসল যুদ্ধাপরাধীদের ছেড়ে দিয়ে তাদের এদেশীয় সহযোগীদের বিচার করে ইতিহাসের দায় মেটাতে পারবে? পারলেও কতটুকু? এ প্রশ্ন অনেকের। তাছাড়া আজ যারা এদের বিচার করছে সেই আওয়ামী লীগ একদিন এদের সাথেই জোট বেধে ক্ষমতার রাজনীতির আন্দোলন করেছিল। সেকথাতো মানুষ ভুলে যায়নি। কাজেই যুদ্ধাপরাধী বা মানবতাবিরোধী অপরাধী যে নামেই দেশীয় সহযোগীদের আখ্যায়িত করে বিচার করা হোক না কেন এবং যতুটুকুই ইতিহাসের দায় মেটানোর চেষ্টা করা হোকনা কেন তার উদ্দেশ্য নিয়েও প্রশ্ন থেকে যাবে। আজ জামায়াত যদি আওয়ামী লীগের সাথে রাজনৈতিক জোটের সাথে থাকত বা বিএনপির সাথে না থাকত, বা যে লোকগুলোর বিচার চলছে তারা যদি জামায়াতের সাথে না থাকত বা কোন রাজনীতির সাথেই না থাকত তাহলে কি তাদের এভাবে বিচার করত আওয়ামী লীগ? মানুষের এজাতীয় প্রশ্নের জবাব কি?
প্রশ্নবিদ্ধ বিচার
মাওলানা আবুল কালাম আযাদের ফাঁসির রায়ের খবর বিশ্বের সকল মিডিয়ায় ফলাও করে প্রচার করা হয়। বিবিসি, রয়টার্স, এপি, এএফপিসহ বিশ্বের সকল প্রভাবশালী মিডিয়া মাওলানা আযাদ সম্পর্কে তাদের পরিবেশিত খবরে ট্রাইব্যুনালকে বিতর্কিকত, রাজনৈতিক পক্ষপাতদুষ্ট হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। এছাড়া বিশ্বখ্যাত লন্ডনের ইকোনমিস্ট সাময়িকী বারবার কঠোরভাষায় ট্রাইব্যুনালের সমালোচনা করে স্পষ্টভাবে লিখেছে বর্তমান সরকার তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন করার অংশ হিসেবে এ বিচার পরিচালনা করছে। সব মিলিয়ে ট্রাইব্যুনাল গঠন এবং বিচার শুরু থেকে কখনো বিতর্কের উর্ধ্বে উঠতে পারেনি ট্রাইব্যুনাল এবং এর বিচার প্রক্রিয়া।
স্কাইপ কেলেঙ্কারি : ট্রাইব্যুনাল এবং ট্রাইব্যুনালের বিচার সবচেয়ে বেশি প্রশ্নবিদ্ধ এবং বিতর্কিত হয়েছে ট্রাইব্যুনাল-১ এর সাবেক চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হক নাসিমের স্কাইপ কেলেঙ্কারির ফলে। বিচার নিয়ে বেলজিয়ামের ড. আহমেদ জিয়াউদ্দিনের সাথে কথোপকথন ফাঁস হওয়ার ফলে জানা গেল বিভিন্ন সময় ট্রাইব্যুনাল যেসব আদেশ দিয়েছেন তা আসত বেলজিয়াম থেকে। এছাড়া মাওলানা সাঈদীসহ আরো বিভিন্ন রায়ের খসড়াও বেলজিয়ামে প্রস্তুত করা হচ্ছিল। স্কাইপ কেলেঙ্কারির ফাঁসের ফলে বের হয়ে যায় এ বিচার কোথা থেকে কাদের ঈশারায় কিভাবে পরিচালিত হচ্ছিল। শুধু বাংলাদেশ নয় গোটা বিশ্বের গণমাধ্যমে আলোচনার বিষয় হয় এ স্কাইপ কেলেঙ্কারির ঘটনা। বাংলাদেশ তথা বিচার বিভাগের ইতিহাসে এ ধরনের ন্যাকারজনক ঘটনা আগে কখনো ঘটেনি বলে মন্তব্য করেন আইন বিশেষজ্ঞরা। শেষ পর্যন্ত এ কলঙ্কের দায় নিয়ে ১১ জানুয়ারি পদত্যাগ করেন বিচারপতি নিজামুল হক।
সাক্ষী অপহরন : সুখরঞ্জন বালী ছিলেন মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের একজন সাক্ষী । কিন্তু তিনি রাষ্ট্রপক্ষের হয়ে সাক্ষ্য দেয়ার বদলে মাওলানা সাঈদীর পক্ষে সাক্ষ্য দিতে আসেন ৫ নভেম্বর ২০১২। ওইদিন ডিবি পুলিশ তাকে ট্রাইব্যুনালের সামনে থেকে অপহরন করে নিয়ে যায়। এ ঘটনা বিশ্বের প্রভাবশালী বিভিন্ন গনমাধ্যমে পকাশ করা হয় এবং বিচার নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়।
বিচারপতি নিজামুল হককে নিয়ে বিতর্ক : ১৯৯৩ সালে জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে অধ্যাপক গোলাম আযম বিচারের জন্য গণআদালত গঠন করা হয়। গণআদালতের অধীনে গোলাম আযম, নিজামী, সাঈদীসহ বর্তমানে বন্দী প্রায় সব নেতাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তের জন্য একটি গনতদন্ত কমিশন গঠন করা হয়। সে কমিশনের সেক্রেটারিয়েট সদস্য ছিলেন বিচারপতি নিজামুল হক। কাজেই আগে থেকেই তিনি বর্তমান অভিযুক্তদের বিচারের সাথে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগে তার পদত্যাগ দাবি করেন আসামী পক্ষ। কিন্তু তিনি পদত্যাগ করেননি।
আইন নিয়ে বিতর্ক : ১৯৫ জন পাকিস্তানী সেনা কর্মকর্তাকে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে চিহ্নত করে স্বাধীনতা পরবর্তী আওয়ামী লীগ সরকার। তাদের বিচারের জন্য ১৯৭৩ সালে একটি আইন তৈরি করা হয়। কিন্তু ১৯৫ জন পাকিস্তানীকে ক্ষমা করে দেয়ায় ওই আইনে কারো বিচার হয়নি। সেই আইনটি ২০০৯ সালে সংশোধন করে দেশীয় সহযোগীদের বিচারের উদ্যোগ নেয়া হয়। একজনের জন্য তৈরি করা আইন দিয়ে আরেকজনের বিচার এবং আইনের নানা দিক নিয়ে সমালোচনা শুরু হয় ট্রাইব্যুনাল গঠনের পরপরই। এ আইন দিয়ে ন্যায় বিচার করা সম্ভব নয় এবং আন্তর্জাতিক আইনের যে মানদণ্ড তার অনেক নিচে এ আইন। এ আইনের মাধ্যমে আসামীর ন্যায় বিচার নিশ্চিত হবেনা বলে দেশ এবং বিদেশ থেকে সমালোচনা করা হয়। এ আইন নিয়ে বিশ্বের সকল বড় বড় আইনী এবং মানবাধিকার সংস্থা এর সমালোচনা করেছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, আইবিএ, জাতিসংঘসহ সকল বড় বড় সংস্থা আইনের সমালোচনা করে সংশোধন দাবি করে প্রস্তাব পাঠিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধাপরাধ বিষয়ক বিশেষ দূত স্টিফেন জে র্যাপ কয়েক দফা বাংলাদেশ সফর করে আইনের দুর্বল দিক সংশোধন করে প্রস্তাব পেশ করেছেন বাংলাদেশ সরকারের কাছে।
সেফ হাউজ : গত ২০ মার্চ রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের পক্ষ থেকে ট্রাইব্যুনালে একটি আবেদন পেশ করা হয়। আবেদনে বলা হয় মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে ৪৬ জন সাক্ষীকে হাজির করা আদৌ সম্ভব নয়। তাই ৪৬ জন সাক্ষী তদন্ত কর্মকর্তার কাছে যে জবানবন্দী দিয়েছেন তা তাদের অনুপস্থিতিতে আদালতে সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহন করা হোক।
২৯ মার্চ ১৫ জনের সাক্ষীর জবানবন্দী তাদের অনুপস্থিতিতে সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করে আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল।
মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে সাক্ষী হাজির না করার কারণ হিসেবে রাষ্টপক্ষ বলেছিল মাওলানা সাঈদীর পক্ষের অস্ত্রধারীদের হুমকির কারনে কেউ কেউ আত্মগোপন করেছে, কেউ নিখোঁ প্রভৃতি।
পরে আসামী পক্ষ সেফ হাউজের ডকুমেন্ট হাজির করে ট্রাইব্যুনালে। তাতে দেখা যায় ১৫ সাক্ষীর অধিকাংশ এর বাইরেও অনেক সাক্ষী রাষ্ট্রপক্ষের হেফাজনে ঢাকায় একটি বাড়িতে ছিল দীর্ঘদিন ছিল যাকে সেফ হাউজ বলা হয়। কিন্তু তারা তাদের শেখানো কথামত মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে রাজি না হওয়ায় রাষ্ট্রপক্ষ তাদের ট্রাইব্যুনালে হাজির করেনি। আসামী পক্ষ অভিযোগ করে রাষ্ট্রপক্ষ তাদের হেফাজতে সাক্ষী রেখে তারা উল্টো অভিযোগ করছে মাওলানা সাঈদীর সন্ত্রাসীর ভয়ে তারা পারিয়ে আছে। এসব ডকুমেন্ট হাজির করার পরও ট্রাইব্যুনাল ১৫ সাক্ষীর জবানবন্দী বাতিল করেনি। এ ঘটনায়ও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে ট্রাইব্যুনাল।
মাওলানা আবুল কালাম আযাদকে ফাঁসির রায়
বিশিষ্ট ইসলামী ব্যক্তিত্ব মাওলানা আবুল কালাম আযাদকে ফাঁসির আদেশ দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। ২১ জানুয়ারি ২০১৩ জনাকীর্ণ ট্রাইব্যুনাল কক্ষে ফাঁসির রায় ঘোষণা করা হয়। ১৯৭১ সালে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের লক্ষ্যে গঠিত ট্রাইব্যুনালের এটাই প্রথম রায়।
মাওলানা আবুল কালাম আযাদ বর্তমানে পলাতক রয়েছেন। পলাতক অবস্থায় তার বিচার কার্জ সম্পন্ন করে এ রায় ঘোষণা করা হল। মাওলানা আযাদের পক্ষে তার নিযুক্ত কোন আইনজীবী ছিল না। তবে ট্রাইব্যুনাল তার পক্ষে একজন রাষ্ট্রীয় আইজীবী নিয়োগ দেন।
ট্রাইব্যুনাল গঠনের প্রায় তিন বছরের মাথায় কোন অভিযুক্তের বিরুদ্ধে প্রথম এ রায় ঘোষনা করা হয়।
১১২ পৃষ্ঠার মূল রায় থেকে ২৪ পৃষ্টার সামারি রায় পাঠ করে শোনান ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিাচরপতি ওবায়দুল হাসান।
রায়ে জামায়াতে ইসলামীর নাম: মাওলানা আযাদের বিরুদ্ধে রায়ে ১৯৭১ সালে সংগঠিত হত্যা, গণহত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট, নির্যাতন ও মানবতাবিরোধী বিরোধী বিভিন্ন অপরাধের সংক্ষিপ্ত চিত্র তুলে ধরা হয়। রায়ে বলা হয়, পাকিস্তান রক্ষার নামে, নিরস্ত্র বাঙালীদের প্রতিহত করার জন্য জামায়াতে ইসলামী প্যারা মেলেটারি বাহিনী ( অক্সজুলিয়ারি ফোর্স) গঠনে কার্যকরভাবে ভূমিকা পালণ করে।
যেসব অভিযোগে দন্ড : মাওলানা আযাদের বিরুদ্ধে মোট আটটি অভিযোগ আনা হয়। এরমধ্যে ট্রাইব্যুনাল সাতটি অভিযোগে দোষীসাব্যস্ত করেন। চারটি মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেন।
যে সাতটি অভিযোগে তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয় সেগুলো হল, মানবতাবিরোধী অপরাধ, গণহত্যা, হত্যা, ধর্ষণ, অপহরণ, আটক রাখা ও নির্যাতন।
প্রথম অভিযোগ: ’৭১ সালের জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে মাওলানা আযাদ ও তাঁর সহযোগীরা ফরিদপুর শহরের খাবাশপুর থেকে রঞ্জিৎ নাথ ওরফে বাবুনাথকে ধরে নির্যাতন করেন।
দ্বিতীয় অভিযোগ: ’৭১ সালের ২৬ জুলাই আলফাডাঙ্গা থেকে আবু ইউসুফ পাখিকে ধরে এনে ফরিদপুর স্টেডিয়ামে আটক রাখা হয়। মাওলানা আযাদ পাকিস্তানি মেজর আকরামের সঙ্গে আলোচনা করে পাখিকে আটক রাখেন এবং অমানবিক নির্যাতন করেন। ট্রাইব্যুনাল মাওলানা আযাদকে এই অভিযোগ থেকে অব্যাহতি প্রদান করেন।
তৃতীয় অভিযোগ: ’৭১ সালের ১৪ মে মাওলানা আযাদ ফরিদপুরের বোয়ালমারী থানার কলারন গ্রামের জমিদার সুধাংশু মোহন রায় ও তাঁর বড় ছেলে মণিময় রায়কে বাড়ির পাশের রাস্তায় নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে মাওলানা আযাদ পিছন থেকে রাইফেল দিয়ে গুলি করেন। এতে সুধাংশু নিহত ও মণিময় গুরুতর আহত হন।
চতুর্থ অভিযোগ: ’৭১ সালের ১৬ মে মাওলানা আযাদ রাজাকারদের নিয়ে সালথা থানার (সাবেক নগরকান্দা) পুরুরা নমপাড়া গ্রামে মাধবচন্দ্র বিশ্বাসের বাড়িতে লুটপাট করেন। মাধবকে বাড়ি থেকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে মাওলানা আযাদ গুলি করে হত্যা করে।
পঞ্চম অভিযোগ: ’৭১ সালের ৮ জুন আযাদ ও তাঁর চার-পাঁচজন সহযোগী বোয়ালমারীর নতিবদিয়াা গ্রামের এক হিন্দু বাড়িতে দুই নারীকে (দেব রানী ও সুভ রানী) গণধর্ষণ করেন।
ষষ্ঠ অভিযোগ: ’৭১ সালের ৩ জুন আযাদ ও তাঁর সহযোগীরা সালথা থানার ফুলবাড়িয়া গ্রামের হিন্দুপাড়ায় লুটপাট শেষে চিত্তরঞ্জন দাসকে গুলি করে হত্যা করেন।
সপ্তম অভিযোগ: ’৭১ সালের ১৭ মে আযাদ ৩০-৩৫ জন রাজাকারকে নিয়ে বোয়ালমারীর হাসামদিয়া গ্রাম ও মইনদিয়া বাজারে গুলিকরে শরৎচন্দ্র পোদ্দার, সুরেশ পোদ্দার, শ্যামাপদ পোদ্দার, জতীন্দ্র মোহন সাহা, নীল রতন সমাদ্দার, সুবল কয়াল ও মল্লিক চক্রবর্তীকে হত্যা করেন।
অষ্টম অভিযোগ: ’৭১ সালের ১৮ মে আযাদ সাত-আটজন রাজাকারকে নিয়ে সালথা থানার উজিরপুর বাজারপাড়া গ্রামের এক সংখ্যালঘু তরুণীকে (অঞ্জলী দাসকে) অপহরণ করে খাড়দিয়া গ্রামের চান কাজীর বাড়িতে আটকে রেখে নির্যাতন করেন।
৩,৪,৬ এবং ৭ নং অভিযোগে তাকে মৃত্যুদণ্ড এবং অন্য দুটিতে তাকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড প্রদান করা হয়।
এক মাসে বিচার শেষ : গত ২৬ নভেম্বর থেকে মাওলানা আযাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয় এবং গত ২৬ ডিসেম্বর মাত্র এক মাসের ব্যবধানে সাক্ষ্য গ্রহণের পর যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ করে ট্রাইব্যুনাল রায়ের জন্য রাখেন। রাষ্ট্রপক্ষের ২২জন সাক্ষী মাওলানা আযাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেন। এরপর ২৫ দিনের ব্যবধানে ট্রাইব্যুনাল রায় ঘোষণা করবেন। গত ২৬ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ মামলার শেষ ধাপে রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ হওয়ার পর ট্রাইব্যুনাল রায়ে নির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণা না করে সিএভি (কোর্ট অ্যাডজর্ন ফর ভারডিক বা রায়ের জন্য মূলতবি) করেন।
পলাতক অবস্থায় মাওলানা আযাদের বিচার: ৩ এপ্রিল ২০১২ মাওলানা আযাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন ট্রাইব্যুনাল-২। এরপর থেকে তিনি পলাতক রয়েছেন। ওইদিন উত্তরখানে মাওলানা আযাদের বাসভবন গিয়ে পুলিশ তাঁকে পায়নি। ২৫ সেপ্টেম্বর দুটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে আযাদকে সাত দিনের মধ্যে ট্রাইব্যুনালে হাজির হতে বলা হয়। কিন্তু তিনি হাজির না হওয়ায় ট্রাইব্যুনাল তাঁকে পলাতক ঘোষণা করেন এবং তাঁর অনুপস্থিতিতে বিচার শুরু করেন। মাওলা আযাদ পালাতোক থাকায় ৭ অক্টোবর তার পক্ষে মোঃ আবদুস শুকুর খানকে আইনজীবী নিয়োগ দেন ট্রাইব্যুনাল।
গত ৪ নভেম্বর মাওলানা আযাদের বিরুদ্ধে আটটি সুনির্দিষ্ট ঘটনায় অভিযোগে চার্জ গঠন করা হয়।
৭ অক্টোবর ট্রাইব্যুনাল আবুল কালাম আজাদের অনুপস্থিতিতে বিচার শুরুর আদেশ দেন।
ট্রাইব্যুনালের প্রথম রায়: ২০১০ সালের ২৫ মার্চ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ গঠন করা হয়। এরপর ট্রাইব্যুনালের বিচার দ্রুত সম্পন্ন করতে ২০১২ সালের ২২ মার্চ ট্রাইব্যুনাল-২ গঠন করা হয়। ট্রাইব্যুনাল-১ গঠনের দুই বছর পর ট্রাইব্যুনাল-২ গঠন করা হলেও ট্রাইব্যুনাল-২ থেকে প্রথম রায় ঘোষণা করা হল।
কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ গত ৫ ফেবব্রুয়ারি তার বিরুদ্ধে রায় ঘোষণা করেন।
আবদুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ আনিত ছয়টি অভিযোগের মধ্যে পাঁচটিতে সাজা দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। দুটি অভিযোগে যাবজ্জীবন এবং অপর তিনটি অভিযোগে ১৫ বছর করে কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। তবে তিনটি অভিযোগে ১৫ বছর কারাদণ্ড দেয়া হলেও আদেশে মোট সাজা যাবজ্জীবন রাখা হয়েছে। এছাড়া একটি আভিযোগ থেকে আবদুল কাদের মোল্লাকে খালাস দেয়া হয়েছে।
হরতাল চলাকালে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যে ট্রাইব্যুনাল-২-এ আবদুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে রায় ঘোষণা করা হয়। এসময় আব্দুল কাদের মোল্লার পক্ষে কোন সিনিয়র আইনজীবী ট্রাইব্যুনালে উপস্থিতি ছিলেননা। ১৯৭১ সালে সংগঠিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের লক্ষ্যে গঠিত ট্রাইব্যুনালের এটি দ্বিতীয় রায়।
ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান এবং সদস্য বিচারপতি মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারক মোঃ শাহিনুর ইসলাম এ রায় ঘোষণা করেন। ১৩২ পৃষ্ঠার রায় থেকে ৩৫ পৃষ্ঠার সামারি অংশ পড়ে শোনানো হয়।
রায় ঘোষণা শেষ হওয়ার সাথে সাথে আবদুল কাদের মোল্লা দাঁড়ি বলেন, এই বিচারকরা জল্লাদের মোত রায় দিয়েছে। সরকারের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে এ রায় দেয়া হয়েছে। আমি বিশ্ব মানবতার বিবেকের বাছে বিচার প্রার্থনা করছি। মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময় আমি গ্রামের বাড়িতে ছিলাম, আমি ঢাকায় ছিলাম না। আজ এই আদালতে আমি বিচার পেলাম না, আল্লাহর কাছে আমি শেষ বিচারের দিন বিচার পাব।
ছয় অভিযোগ:
১. পল্লব হত্যা: মিরপুর বাঙলা কলেজের ছাত্র পল্লবকে ’৭১ সালের ৫ এপ্রিল গুলি করে হত্যার অভিযোগ হয়।
২. কবি মেহেরুননিসা হত্যা: ’৭১ সালের ২৭ মার্চ কবি মেহেরুননিসা, তাঁর মা ও দুই ভাইকে মিরপুর ৬ নম্বর সেকশনের বাসায় হত্যার অভিযোগ
৩. সাংবাদিক খন্দকার আবু তালেব হত্যা: সাংবাদিক, আইনজীবী এবং সাহিত্যিক খন্দকার আবু তালেবকে মিরপুর ১০ নং জল্লাদখানায় নিয়ে হত্যা
৪. ঘাটার চর এবং ভাওয়াল খান বারি হত্যাকান্ড : ’৭১ সালের ২৫ নভেম্বর সকাল সাড়ে সাতটা থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত শতাধিক নিরস্ত্র গ্রামবাসীকে হত্যা করা হয়। এ অভিযোগ থেকে কাদের মোল্লাকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে।
৫. আলুবদি গনহত্যা : ’৭১ সালের ২৪ এপ্রিল পাকিস্তানি সেনাদের একটি হেলিকপ্টার মিরপুরের আলবপদি গ্রামের পূর্ব দিকে নামে। সেখানে এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়ে ৩৪৪ জনের বেশি মানুষ হত্যা করা হয়।
৬. হযরত আলী হত্যা: ’৭১ সালের ২৬ মার্চ সন্ধ্যা ৬টায় মিরপুরের ১২ নম্বর সেক্টরের ৫ নম্বর কালাপানি লেনের হযরত আলীকে বাসা থেকে ধরে নিয়ে হত্যা করা হয়। একই সঙ্গে তাঁর স্ত্রী আমিনা এবং তিন মেয়ে খাদিজা ও তাসলিমা, আমিনা, দুই বছরের ছেলে বাবুকে হত্যা। দুই মেয়েকে ধর্ষণ। করা হয়।
১,২ এবং ৩ নং অভিযোগে ১৫ বছর করে এবং ৫ ও ৬ নং অভিযোগে যাবজ্জীবন এবং ৪ নং অভিযোগ থেকে খালাস দেয়া হয় ।
মামলার বিবরণ: গত ১৭ জানুয়ারি কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে বিচার শেষ হয়। ওইদিন আদেশ দেয়া হয় যেকোন দিন রায় ঘোষনা করা হবে।
২০১২ সালে ২৮ মে কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে ছয়টি অভিযোগের ঘটনায় চার্জ গঠন করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। ৩ জুলাই কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয়। রাষ্ট্রপক্ষের তালিকাভুক্ত মোট ৫৬ জন সাক্ষীর মধ্যে এ মামলার দুই তদন্ত কর্মকর্তাসহ ১২ জন ট্রাইব্যুনালে এসে সাক্ষ্য দিয়েছেন।
অপর দিকে আসামী পক্ষে সাক্ষ্য দিয়েছেন ৬ জন সাক্ষী।
কাদের মোল্লার পক্ষে ঢাকা বিশ্বাবদ্যালয়ের শহীদুল্লা হলের ৪০ বছরের ইমাম হাফেজ এ আইএম লোকমান ও ৮২ বছরের বৃদ্ধ সুশীল চন্দ্র মন্ডল সাক্ষ্য দিয়ে বলেন, ’৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে সময় কাদের মোল্লা গ্রামের বাড়িতে ছিলেন।
গত ৭ মার্চ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের শুনানি শুরু হয়। এরপর প্রসিকিউশনের আবেদনে গত ১৬ এপ্রিল মামলা ট্রাইব্যুনাল-২-এ স্থানান্তর করা হয়।
২০১০ সালের ১৩ জুলাই সুপ্রিমকোর্টের প্রধান গেট থেকে কাদের মোল্লাকে একটি মামলায় পুলিশ গ্রেফতার করে। ট্রাইব্যুনালে তদন্তকারী সংস্থার এক আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ওই বছরের ২ আগষ্ট কাদের মোল্লাকে মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলায় আটক রাখার আদেশ দেয়া হয়।
মামলার আইনজীবী: কাদের মোল্লার পক্ষে আইনজীবী টিমের প্রধান ছিলেন ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক, । সাক্ষীদের জেরা করেন অ্যাডভোকেট আবদুস সোবহান তরফদার। এ মামলায় অপর গুরুত্বপূর্ণ আইনজীবী ছিলেন অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম, অ্যাডভোকেট সাজ্জাদ আলী চৌধুরী প্রমুখ।
আবদুল কাদের মোল্লার পরিচিতি: পিতার নাম মোঃ সানাউল্লাহ মোল্লা। জন্ম তারিখ ২ ডিসেম্বর ১৯৪৮। জন্ম স্থান জরিপের ডাংগি, ইউনিয়ন- চর বিষ্ণুপুর, থানা ও উপজেলা- সদরপুর, জেলা- ফরিদপুর। ১৯৬৬ সালে ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজ থেকে আইএসসি পাশ করেন। একই কলেজ থেকে ১৯৬৮ সালে বিএসসি পাশ করেন। তিনি ১৯৬৯ সালের ডিসেম্বর মাসের শেষের দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগে এমএসসি কাসে ভর্তি হন এবং ড. মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ হলের আবাসিক ছাত্র ছিলেন।
১৯৭৪ সালে কাদের মোল্লা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইইআর (ইন্সটিটিট অব এডুকেশন এন্ড রিসার্চ) এ ডিপ্লোমা ইন এডুকেশন (সোস্যাল সাইন্স) এ ভর্তি হই। ১৯৭৫ সালে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম স্থান অধিকার করে ডিপ্লোমা ইন এডুকেশন পাশ করি। তিনি বিডিআর সেন্ট্রাল পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। উদয়ন বিদ্যালয়ে ১৯৭৪-১৯৭৫ সালে শিক্ষকতা করেন।
কাদের মোল্লা জাতীয় প্রেস কাবের সদস্য। তিনি ১৯৮২-৮৪ পর্যন্ত ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের দুই বার নির্বাচিত সহ-সভাপতি ছিলেন। ১৯৮৩ সালে ঢাকা মহানগর জামায়াতের সাধারণ সম্পাদক নিয়োজিত হন। ১৯৮৭ সাল আমি ঢাকা মহানগর জামায়াতে আমির নির্বাচিত হন। বর্তমানে তিনি দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন