শুক্রবার, ৮ নভেম্বর, ২০১৩

স্কুলে তাহলে কি শেখাবে?


রাজধানীর নামকরা একটি স্কুলে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি পরীক্ষার জন্য প্রণীত ভর্তি পরীক্ষার নির্দেশিকা দেখুন। আমার প্রশ্ন প্রথম শ্রেণিতে ভর্তির জন্য মা বাবাকে বাসায় বসে একটি বাচ্চাকে যদি এসব শিখিয়ে উপযুক্ত করতে হয় তাহলে স্কুলে কি শেখানো হবে আর স্কুলে ভর্তিরই বা দরকার কি? প্রথম শ্রেণিতে ভর্তির উপযুক্ত করার জন্য  এসব বিষয় শেখাতে গিয়ে  অবুঝ শিশুদের ওপর শারিরীক ও মানসিক নির্যাতন করছেন অনেক মা বাবা এবং গৃহশিক্ষক। হায়  আমাদের ভ্রান্ত শিক্ষা ব্যবস্থা।

আমি আমার মেয়ের ভর্তির জন্য একটি স্কুল থেকে ভর্তি পরীক্ষার এ নির্দেশিকা সংগ্রহ করলাম।

ইংরেজি

ক.A n‡Z Z  পর্যন্ত Letter দিয়ে শব্দ গঠন কর |

খ. শব্দার্থ লিখ
গ.. Letter দ্বারা খালিঘর পূরন কর
ঘ.  Word  দ্বারা খালিঘর পূরন কর
ঙ.  এলোমেলো Letter সাজিয়ে সঠিক Word তৈরি কর
চ..  এলোমেলো Word সাজিয়ে সঠিক বাক্য গঠন  কর
ছ. বিপরীত শব্দ ।
জ. সঠিক উত্তরটিতে টিক চিহ্ন দেওয়া।
ঝ. শব্দের ধাঁধাঁ।
ঞ. ছবি দেখে নাম লেখা (ইংরেজিতে)।
ট. ইংরেজিতে বাক্য রচনা।
ঠ. ইংরেজিতে বার মাসের নাম লেখা।
ড. ইংরেজিতে ৭ দিনের নাম লেখা
ঢ. ইংরেজিতে ৫টি করে পশু, পাখি, রং নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস  ও প্রাকৃতিক বস্তুর নাম লেখা।

গণিত
ক. ১-১০০ পর্যন্ত অংকে ও কথায় লেখা।
খ. জোড় ও বিজোড় সংখ্যা।
গ. যোগ বিয়োগ (দুই সংখ্যার)।
ঘ. ছোট থেকে বড় এবং বড় থেকে ছোট সংখ্যা ক্রমানুসারে সাজানো।
ঙ. কথার অংক : যোগ বিয়োগ (দুই সংখ্যার) ।
চ. গুনের নামতা ১- ১০ পর্যন্ত।
ছ. শূন্যস্থান পূরণ কর।
জ. ১--১০০ পর্যন্ত ইংরেজিতে বানান করে লেখা।
ঝ. সেকেন্ড, মিনিট, ঘন্টা, দিন, সপ্তাহ, মাস, বছর, পক্ষ, যুগ, শতাব্দি ইত্যাদি সম্পর্কে ধারণা।
ঞ. অংকের ধাঁধাঁ।

বাংলা :
ক. স্বরবর্ন ও ব্যঞ্জনবর্ণের পরিচয়।
মাত্রাযুক্ত, মাত্রাহীন ও অর্ধমাত্রাযুক্ত অক্ষরগুলো কয়টি ও কিকি?
খ. স্বরচিহ্ন ও ফলাযোগে শব্দ গঠন।
গ. স্বরবর্ণ ও ব্যঞ্জনবর্ণ দিয়ে শব্দ গঠন
ঘ. এলোমেলো বর্ণ সাজিয়ে সঠিক শব্ত তৈরি।
ঙ. খালিঘর পূরন করে শব্দ গঠন।
চ. খালিঘর পূরন করে বাক্য গঠন।
ছ. নির্দিষ্ট শব্দ দিয়ে বাক্যরচনা।
জ. সঠিক উত্তরটিতে টিক চিহ্ন দেয়া।
ঝ. শব্দের ধাঁধাঁ।
ঞ. বিপরীত শব্দ।
ট. ছন্দ মিলিয়ে শব্দ লেখা । যেমন : কবি = রবি, ছবি, নদী ইত্যাদী।
ঠ. মা, গরু, বিড়াল, ঘোড়া, কুকুর ইত্যাদি দিয়ে ৫টি বাক্য রচনা লেখা।
ড. বাংলা বার মাসের নাম।
ঢ. ছয়ঋতুর নাম।
ণ. ৭ দিনের নাম।
ত. ৫টি করে পশু, পাখি, রং, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস ও প্রাকৃতিক বস্তুর নাম।
থ. জাতীয় বিষয়বস্তুর নামসমূহ।
দ. আত্মীয়ের পরিচয়।
ধ.    নিজের ঠিকানা।


উপরোক্ত বিষয়ে ৬০ নম্বরের লিখিত পরীক্ষা। এছাড়াও তাদের ভর্তি নির্দেশিকায় রয়েছে ৪০ নম্বরের মৌখিক পরীক্ষা।
আমার মেয়েটির বয়স ৬ বছর 3 মাস হয়েছে। ভর্তির নির্দেশিকা অনুযায়ী তার মা তাকে দুই সংখ্যার  বিয়োগ অঙ্ক, অংকের ধাঁধা, খালিঘর পূরন শেখাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে। আমার মেয়েটি হাতে রেখে বিয়োগ অংক মাথায় নিতে পারছেনা। এজন্য মাঝে মাঝে মার খাচ্ছে। বকাঝকা তো নিত্য নৈমক্তিক ব্যাপার। আমি আমার মেয়ের মাকে বলেছি খবরদার এসব পড়াশুনা নিয়ে আমার সামনে কখনো আমার মেয়েকে মারতে পারবেনা। এ নিয়ে ঝগড়া শুরু হয়েছে আমার সাথেও। আমি বলেছি প্রথম শ্রেণিতে ভর্তির প্রস্তুতির জন্য যদি একটি শিশুকে মার খেতে হয় পড়ালেখা শিখতে তাহলে সে পড়াশুনার দরকার নেই। ওই স্কুলে আমি ভর্তি করাবোনা। আমার স্ত্রী চিৎকার শুরু করেছে। তোমার মেয়ে কোথাও চান্স পাবেনা। রাস্তায় রাস্তায় ঘরতে হবে। ঘরে বসে থালা বাসন মাজাও। ঘর ঝাড়– দেয়া শেখাও। তুমি পড়াও। আমি তাকে পড়াতো পারবনা। সে কোথাও চান্স না পেলে তোমার তো কিছু যায় আসেনা। এভাবে প্রায় প্রতিদিনি চলছে তার পড়াশুনা নিয়ে ঝগড়াঝাটি। তারপরও আমি তাকে ঢাকার বড় দুটি নামকরা স্কুল ভিকারুননিসা ও আইডিয়াল স্কুলে ভর্তির চিন্তা মাথা থেকে বিদায় করতে সক্ষম হয়েছি। কারণ আমি আমি তিন/চার বছর শিক্ষা বিটে কাজ করার সময় নামকরা এসব স্কুলের হাজারো অপকর্ম, দুর্নীতি নিয়ে রিপোর্ট করেছি, নাম করা স্কুলে মূলত সমস্ত পড়াশুনা ঘরে বসে অভিভাবকদেরই করাতে হয়, প্রাইভেট মাস্টার রেখে, অথবা শিক্ষকের কাছে ব্যাচে পাঠিয়ে। স্কুলে হয় শুধু হাজিরার কাজ। এসব দেখে দেখে নামি দামি স্কুলের প্রতি আমার মোহ নেই। তাই আমি গিয়েছিলাম মাঝারি গোছের নামকরা একটি স্কুলে। কিন্তু তার  নমুনা হল এই। 

এর নিচে নামার কথা বললে আমার স্ত্রী উত্তর দিল তোমার মেয়েকে বস্তির স্কুলে নিয়ে ভর্তি কর। ছয় বছর ৩ মাস হয়েছে এখনো স্কুলে ভর্তি করাইনি এ নিয়ে তার টেনশনের শেষ নেই। অনেকে চার/পাঁচ বছর বয়সেই ভর্তি করায়।
গত বছরও সে ভর্তি করাতে চেয়েছিল। আমি বলেছি ওয়ানে চান্স পাবেনা। আর জুনিয়র ওয়ানে যা শেখায় তার চেয়ে ঘরে বসে সে ভাল শিখতে পারবে আমরা যদি সময় দেই। জুনিয়র ওয়ানে  যা শেখাবে তাতে স্কুলে আনা নেয়ার হয়রানিই শুধু সার হবে। এসব বিবেচনা করে আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম একবারে ওয়ানেই ভর্তি করাবো।
কিন্তু ওয়ানে ভর্তির নির্দেশিকায় লেখা দেখলাম সামনের জানুয়ারি পর্যন্ত বয়স হতে হবে ৬ বছর ৬ মাস থেকে সাত বছর ৫ মাস। 
প্রথম শ্রেণিতে ভর্তির উপযুক্ত করতে গিয়ে আমার মেয়েটির করুন দশা দেখে আমি সত্যি তার জন্য ব্যথিত। আমার চোখে পানি ঝরছে। আমি বললাম ওদের নিয়ম অনুযায়ী সামনের জানুয়ারি মাসেও আমার মেয়ের বয়স  বছর ৬ মাস হবেনা। চেষ্টা করতে থাক। যদি চান্স পায় তো পাবে। একথা শুনে আমার স্ত্রী ক্ষেপে গেল। তোমার মেয়েকে ঘরে বসে বুড়ি বানাও। স্কুলে ভর্তি করাতে হবেনা। শেষে মেয়ে নিয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘরতে হবে। আমি শেষে বললাম তাহলে এক কাজ কর, জুনিয়র ওয়ান, ওয়ান যেখানে যা আছে সব জায়গায় চেষ্টা কর। যেখানে চান্স পায় ভর্তি করানো হবে এবার।

ছোট্ট শিশুরা আমি তোমাদের জন্য দু:খিত। ভ্রান্ত ব্যবস্থার শিকার আমরা সবাই।



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন