

আরেকটি কালো রাত
মেহেদী হাসান
রোববার, ৫ মে, ২০১৩। সারা রাত টিভির সামনে বসে ছিলাম। রাত আড়াইটায় হেফাজতকে সরিয়ে দেয়ার জন্য পুলিশ, র্যাব, বিজিবি’র অভিযান শুরু হল। একাত্তার টিভি, ইন্ডিপেন্ডেট টিভিসহ আরো কয়েকটি চ্যানেল দেখছিলাম ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে। ঘুট ঘুটে অন্ধকারে শুধু গুলির শব্দ এবং রিপোর্টারের ধারা বর্ননা শোনা যাচ্ছিল। এছাড়া আর কিছু দেখা যাচিছলনা। ১০ হাজার আইন শৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক সাড়াশি অভিযান পুরো লাইভ বর্ননা প্রচার করল একাত্তর টিভি, ইন্ডিপেন্ডেন্টহ আরো কয়েকটি চ্যানেল। সেখানকার বিভীষিকাময় পরিস্থিতি বিষয়ে রিপোর্টাররা কিছু কিছু শব্দ উচ্চারন করল। একাত্তর টিভি রিপোর্টার বললেন তিনি ১৫/২০ জনকে রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখেছেন। তারা জীবিত না মৃত তা তিনি বলতে পারবেননা। এনটিভির রিপোর্টার বললেন তিনি ৫০ জনের মত হেফাজত কর্মীকে রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখেছেন । তারাও জীবিত না মৃত তা তিনি জানেননা।
একাত্তার টিভি অভিযান পুরো সময় নিয়ে সরাসরি সম্প্র্রচার করল। অথচ সকাল নয়টার দিকে তাদের স্ক্রলে লেখা দেখানো হল ‘রাত তিনটার দিকে অভিযানের গুজব। শাপলা চত্তর ছেড়ে চলে গেছে হেফাজত।’
তাদের এ মিথ্যাচারে আমি মোটেও অবাক হইনি । কারণ এটাই তাদের স্বাভাবিক চরিত্র। তারা সরাসরি প্রচার করল নির্বিচারে গুলির শব্দ, টিয়ারশেল মারার শব্দ, ক্র্যাকডাউনের ঝনঝনানি। আর সকালে তারা বলতেছে অভিযানের গুজবে হেফাজত চলে গেছে। সকালের আলো ফোটার সাথে সাথে বিশ্ববাসী জানতে শুরু করল কিভাবে তাদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালিয়ে হত্যা করে সেখান থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। আর একাত্তর নিজেদের প্রচারিত তথ্য নিজেরাই অস্বীকার করে বলে দিল অভিযানের গুজবে চলে গেছে হেফাযত।
অন্যান্য টিভি চ্যানেলগুলোর ভাষও ছিল হেফাজত সেচ্ছায় সেখান থেকে চলে গেছে। সংবাদপত্রের ভাষাও ছিল অনেকটা এরকমই। শাপলা চত্তর ছাড়ল হেফাজত। যেন কিছুই হয়নি। সরকারের তরফ থেকেও বলা হল শান্তিপূর্ণ উপায়ে কোন আক্রমন ছাড়া, হতাহত ছাড়া কৌশলে হেফাজতকে সরিয়ে নিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এসব মিথ্যাচারে এখন আর অবাক হইনা। শরীরের রক্তও গরম হয়না। এখন যেটা করতে শুরু করেছি সেটা হল টিভি দেখা বন্ধ করে দিয়েছি এক প্রকার।
আমার বাসা বনশ্রী। টিভিতো লাইভ দেখার সময় মতিঝিলের অপারেশন স্থল থেকে গুলির শব্দ ভেসে আসতে লাগল। সত্যিই মতিঝিলের গুলির শব্দ কি-না যাচাই করার জন্য টিভির সাউন্ড কমিয়ে দিলাম। তারপর শুনতে লাগলাম হ্যা গুলির শব্দ একটু পরপর ভেসে আসছে আমার বাসা পর্যন্ত। মতিঝিল থেকে বনশ্রী এফ ব্লকের দূরত্ব কত?
সকালে বিভিন্ন লোকজনের কাছ থেকে ফোন আসতে লাগল। মধ্য রাতের অভিযানে কত লোক মারা গেছে এ প্রশ্ন সবার। আমি শুধু রাত জেগে আমার টিভি দেখার অভিজ্ঞতার কথা তাদের শেয়ার করলাম। আমি অনুমান করে বললাম শতাধিক হতে পারে। কিন্তু তারা এর তীব্র বিরোধীতা করে বিভিন্ন সূত্রের বরাত দিয়ে নানা পরিসংখ্যান বলতে লাগল। কেউ বলল শত শত, কেউ বলল হাজার হাজার। কেউ বলল সাত ট্রাক লাশ রাতে সরিয়ে ফেলা হয়েছে। অভিযানের সময় ফায়ার সার্ভিস, বিজিবি, ডিসিসি’র কার্ভার্ড ভ্যান কর্তৃক গাড়িতে করে লাশ সরানো হয়েছে। লাশ সরানোর জন্য অনেক ট্রাক প্রস্তুত রাখা হয়েছিল। লাশ সরানোর পর পর পানি দিয়ে রাস্তা ধোয়া হয়েছে। সেজন্য তৈরি ছিল ওয়াসাসহ আরো অনেক কিছু। রাস্তার রক্ত ধোয়ার পর মানুষের রক্তে লাল হয়ে গেছে ড্রেনের পানি। কেউ খবর দিল পিলখানায় লাশ নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সেখানে মাটি চাপা দেয়া হবে তাদের। এভাবে নানান খবর আসতে লাগল।
কত লোক হত্যা করা হয়েছে তা কেউ কোনদিন জানবেনা। কারণ লাশ গুম করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে রাতের আঁধারে। একাজটি খুব দক্ষতার সাথে করতে পেরেছে সরকার। অভিযানের আগে পুরো এলাকায় বিদুু্যুত সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়। যারা অভিযান লাইভ দেখিয়েছে তারা কোন ছবি দেখায়নি। রিপোর্টারের কথা শুনে মনে হয়েছে তারা পুলিশের নিরাপত্তায় থেকে এমবেডেড জার্নালিজমের অংশ হিসেবে অভিযানের ধারা বর্ননা দিচ্ছিলেন। অর্থাৎ পুলিশ র্যাব বিজিবি যতুটুকু বলতে বলেছে ততটুৃকু তারা বলেছে। দিগন্ত টিভির সম্প্রচারের অনেক আয়োজন ছিল হয়ত। কারান তারা দিনের বেলায় অনেক সুন্দরভাবে অনুষ্ঠান সম্প্রচার করেছে। তাদের সেখানে অনেক ক্যামেরা ছিল বলে মনে হয়েছে। বিশাল এলাকাজুড়ে তারা অনেক দৃশ্য ধারন করে সরাসরি প্রচার করেছে সারাদিন। সেজন্য হয়ত রাতের অভিযানকে সামনে রেখে তাদের সম্প্রচার বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। যখন একাত্তরসহ অন্যান্য টিভি অভিযান লাইভ দেখাচ্ছিল তখন বারবার দিগন্ত টিভির চ্যানেলে রিমোট ঘুরিয়েছি। কিন্তু দেখি তারা পুরনো অনুষ্ঠান, অন্যজাতের অনুষ্ঠান প্রচার করছে। খুব মেজাজ খারাপ হচ্ছিল কেন তারা এত বড় একটা ঘটনা বাদ দিয়ে হাবিজাবি জিনিস দেখাচ্ছে। অভিযানের সময় তারা তাদের নির্ধারিত বুলেটিনে শুধু টেলিফোন সংযোগের মাধ্যমে সামান্য কিছু কথা প্রচার করল। পরে জানতে পারলাম অভিযান যখন চলছে তখন তাদের ভবন ঘেরাও করে ফেলেছে আইনশঙ্খলা বাহিনী। পরে দেখতে পেলাম তাদের সম্প্রচার বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।
এভাবে গভীর রাতে পরিকল্পিতভাবে অভিযান পরিচালনা, লাশ সরিয়ে ফেলার পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে রাখা এবং লাশ সরিয়ে ফেলা, রক্ত ধুয়ে ফেলা এবং গণমাধ্যমের ওপর নিয়ন্ত্রনের ফলে কেউ হয়ত কোনদিনই জানতে পারবেনা ইতিহাসের এ বর্বরতম গণহত্যার মাধ্যমে সত্যিকার অর্থে কত মানুষের রক্ত পান করা হয়েছে মসনদ টিকিয়ে রাখার জন্য।















কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন