যুদ্ধাপরাধ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
যুদ্ধাপরাধ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শুক্রবার, ৪ অক্টোবর, ২০১৩

রায় ফাঁস আরেক স্কাইপ কেলেঙ্কারি


মেহেদী হাসান, ৪/১০/২০১৩
স্কাইপ কেলেঙ্কারির মত আরেকটি কেলেঙ্কারীর ঘটনা ঘটল ট্রাইব্যুনাল ঘিরে।  এবার ঘোষনার আগেই ফাঁস হয়ে গেল সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে তৈরি করা রায়। রায় ফাঁস হয়েছে সেটি যতনা গুরুতর  তার চেয়ে অধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়  হল কোথা থেকে এ রায় ফাঁস হল সেটি। আসামী পক্ষের অভিযোগ আইন মন্ত্রণালয়ের কম্পিউটার থেকে উদ্ধার হয়েছে রায়ের অনুলিপি। সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে যে রায় ট্রাইব্যুনাল দিয়েছে তা লেখা হয়েছে আইন মন্ত্রণালয় থেকে। ফাঁস হওয়া রায়ের কপির সঙ্গেই  তার প্রমান রয়েছে। তাদের দাবি আইন মন্ত্রণালয়ের লিখে দেয়া রায়  ট্রাইব্যুনাল পড়ে শুনিয়েছে মাত্র। ট্রাইব্যুনাল এ রায় লেখেনি।
ফাঁস হওয়া রায়ের সাথে আরো যে চাঞ্চল্যকর তথ্য রয়েছে তা হল গত ২৩ মে থেকে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে রায় লেখা শুরু হয়েছে যখন তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষ্য গ্রহণ চলছিল। এ তথ্য অনুসারে  বিচার শেষ হবার তিন মাস আগেই শরু হয়ে যায় রায় লেখার কাজ।

রায় ফাঁসের খবর :
৩০ সেপ্টেম্বর সোমবার ট্রাইব্যুনাল-১ ঘোষনা দেয় আগামীকাল মঙ্গলবার সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে রায় ঘোষনা করা হবে। সোমবার মধ্যরাতের পর বেলজিয়ামের www.tribunalleaks.be নামক একটি ওয়েবসাইট, বিদেশী আরেকটি ওয়েবসাইট
www.justiceconcern.com  এবং www.bdtoday.net  এর ব্লগে  রায় প্রকাশিত হয়। এরপর এর সূত্র ধরে ফেসবুক, বিভিন্ন ব্লগ এবং ইন্টারনেটভিত্তিক বিভিন্ন অনলাইন গনমাধ্যমে এ রায় ফাঁসের  খবর প্রচারিত হতে থাকে। সাথে সাথে ইন্টারনেট, মোবাইল এবং অন্যান্য তথ্য প্রযুক্তির বরাতে অতি দ্রুত এ খবর ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। মঙ্গলবার সকালে রায় প্রকাশের আগে বাংলাদেশেরও কোন কোন অনলাইন সংবাদমাধ্যমে এ খবর প্রচারিত হতে থাকে।

সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে রায় ঘোষনা উপলক্ষে ১ অক্টোবর মঙ্গলবার সকাল থেকেই ট্রাইব্যুনালের সামনে সাংবাদিকসহ বিভিন্ন শ্রেণী পেশার লোকজন ভিড় করতে থাকেন। এসময় হাইকোর্ট এবং ট্রাইব্যুনাল অঙ্গনে রায় ফাঁস হওয়ার ঘটনাটি নিয়ে আলোচনা চলতে থাকে। যারা এ বিষয়ে অনবহিত ছিল তাদের কাছেও এ খবর ছড়িয়ে পড়ে।
এদিকে সকালে হাইকোর্টে সাংবাদিকদের মাঝে ফাঁস হওয়া রায় নিয়ে তৈরি করা একটি বুলেটিন প্রচার করা হয় আসামী পক্ষ থেকে। সেখানে ফাঁস হওয়া রায়ের সারমর্ম এবং  আইন মন্ত্রণালয় থেকে রায় ফাঁস হওয়া বিষয়ে তথ্য প্রমান তুলে ধরা হয়।

ফাঁস হওয়া রায়ের কপি হাতে ট্রাইব্যুনালে প্রবেশ আসামী পক্ষ :
সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর আইনজীবী এবং পরিবারের সদস্যরা ফাঁস হওয়া রায়ের কপি ইন্টারনেট থেকে ডাউনলোড করে  হাজির হন ট্রাইব্যুনালে।  সাড়ে দশটায় ট্রাইব্যুনাল বসার আগেই ট্রাইব্যুনালের সামনে অপেক্ষমান  অনেককে তারা এটি দেখিয়ে বলেন আমরা রায়ের কপি আগেই পেয়ে গেছি। রায় তো ফাঁস হয়ে গেছে ইন্টারনেটে। আইন মন্ত্রণালয়ের কম্পিউটার থেকে এ রায়ের কপি ফাঁস হয়েছে এবং রায় আইন   মন্ত্রনালয় থেকেই লেখা হয়েছে।
এরপর পৌনে  ১১টায়  ট্রাইব্যুনাল রায় ঘোষনা শুরু করে। ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক রায় ঘোষনার সময়ই সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী বলেন এ রায় পড়ে কি লাভ। রায় তো অনলাইনে পাওয়া যাচ্ছে। রায় ঘোষনার পরপরই সাংবাদিকরা হুমড়ি খেয়ে  ঘিরে ধরেন সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর পক্ষের আইনজীবী এবং পরিবারের সদস্যদেরকে তাদের প্রতিকৃয়া জানার জন্য। এসময় সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর আইনজীবী ব্যারিস্টার ফখরুল ইসলাম এবং স্ত্রী ফরহাত কাদের চৌধুরী  টিভি ক্যামেরার সামনে রায়ের কপি উচু করে তুলে ধরে বলেন, এই যে দেখেন রায় আগেই ফাঁস হয়ে গেছে। আমরা ইন্টারনেট এবং অনলাইন গনমাধ্যম থেকে রায়ের কপি ডাউন লোড করে  নিয়ে এসেছি। ট্রাইব্যুনালে একটু আগে যে রায় পড়ে শোনানো হল তার সাথে আমরা ফাঁস হওয়া এ রায় মিলিয়ে দেখেছি। আমাদের কাছে থাকা ফাঁস হওয়া রায়ের সাথে ট্রাইব্যুনালের ঘোষিত রায় হুবহু মিলে গেছে।

তারা যে রায় পড়ে শুনিয়েছেন সেটি আসলে আইন মন্ত্রণালয় থেকে লিখে পাঠানো হয়েছে। ট্রাইব্যুনালের বিচারপতিরা আইন মন্ত্রণালয়ের লেখা রায় পড়ে শুনিয়েছেন মাত্র। এটি তাদের রায় নয়। 
ফরহাত কাদের চৌধুরী বলেন, আমরা  বিস্মিত আইনমন্ত্রণালয়ের লেখা রায় কিভাবে বিচারপতিরা পড়ে শোনাতে পারলেন। তাদের এ রায় ঘোষনা থেকে বিরত থাকা উচিত ছিল। আমরা দেশবাসী ও দুনিয়াকে দেখাতে চাই এখানে জুডিশিয়াল কিলিং হচ্ছে। এখানে কেউ বিচার পাবে না। আমরা বুঝতে পারছি না কোথায় যাব, কোথায় বিচার পাব। আমরা আগে থেকেই জানতাম এখানে বিচার পাব না।

রায় ফাঁস নিয়ে বুলেটিন :
রায় ফাস নিয়ে ১ অক্টোবর মঙ্গলবার সকালে যে বিশেষ বুলেটিন প্রচার করা হয় তাতে ফাঁসের ঘটনা বিষয়ে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
বুলেটিনের প্রতিবেদন এবং অন্যান্য গনমাধ্যমে  রায় ফাঁস নিয়ে রায় যে প্রতিবেদন প্রচারিত হয়েছে তাতে  দাবি করা হয়েছে ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক যে রায় ঘোষনা করা হয়েছে তার  অনুলিপি আইন  মন্ত্রনালয়েল আইন ও বিচার বিভাগের সচিব আবু সালেহ শেখ মোহাম্মদ জহিরুল হকের অফিসের কম্পিউটারে রতি ছিল। আইন মন্ত্রণালয়ের ষষ্ঠ তলার একটি কম্পিউটারে ‘ডি ড্রাইভে’ এ রায়ের কপি পাওয়া যায়। কম্পিউটারের প্রত্যেকটি ফাইল বা ডকুমেন্টের উৎস নির্ণয়ক তথ্য ওই ফাইল বা ডকুমেন্টে সংরক্ষিত থাকে। এই তথ্য ওই ফাইল বা ডকুমেন্টের প্রপারটিস অপশনে গেলে পাওয়া যায়। এই রায়ের কপিটি যে ফাইলে পাওয়া গেছে তার প্রাপারটিস অপশনে গিয়ে যেসব তথ্য পাওয়া গেছে তাহলো- ‘ডি ড্রাইভ’র ‘আলম’ নামে একটি ফোল্ডার রয়েছে। তার অধীনে আরেকটি সাব ফোল্ডারের নাম  ‘ডিফারেন্ট কোর্টস অ্যান্ড পোস্ট ক্রিয়েশন’ । এর অধীনৈ আরেকটি সাব ফোল্ডার হল  ‘ওয়ার ক্রাইমস ট্রাইব্যুনাল’। এই ‘ওয়ার ক্রাইমস ট্রাইব্যুনাল’ এর মধ্যে আরেকটি ফোল্ডার ‘চিফ প্রসিকিউটর-ওয়ার ট্রাইব্যুনাল’ । এর মধ্যে রাখা রায়ের খসড়া কপিটির নাম ছিলো ‘সাকা ফাইনাল-১’। রায় লেখা চূড়ান্ত করার পর খসড়া কপিটির নাম ‘সাকা-১’ পরিবর্তন করে রাখা হয়, ‘আইসিটি বিডি কেস নং ০২ অব ২০১১ (ডেলিভারি অব জাজমেন্ট)(ফাইনাল)’।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়ছে আলম নামের যে ব্যক্তির কম্পিউটারে ফাইলটি পাওয়া গেছে সেই আলম হলেন আইন মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগের সচিব  আবু সালেহ শেখ মো : জহিরুল হক এর কম্পিউটার অপারেটর।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে কম্পিউটারের তথ্যে  দেখা যায় আইন মন্ত্রণালয়ে উক্ত ফাইলটি তৈরি করা হয়েছে চলতি বছর ২৩ মে ১২টা ১ মিনিটের সময় যখন সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে প্রসিকিউশন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ চলছিলো। ফাইলের সাইজ ১৬৭ কেবি। ফাইলটি এডিট করা হয়েছে ২৫৮৭ মিনিট পর্যন্ত।  অর্থাৎ ফাইলটি লিখতে মোট ২৫৮৭ মিনিট ব্যয় করা হয়েছে।
এ তথ্য থেকে আসামী পক্ষ দাবি করেছে বিচার শেষ হওয়ার আগেই ২৩ মে থেকে রায় লেখা শুরু হয়েছিল। গত ১৪ জুলাই সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে মামলার কার্যক্রম শেষে রায় অপেক্ষমান ঘোষনা করা হয়। সে হিসেবে বিচার শেষ হওয়ার ৩ মাস আগে রায় লেখা  শুরু হয়েছে যা বিচার জগতে বিস্ময়কর ঘটনা বলে দাবি করেছে আসামী পক্ষ। 

ফাঁস হওয়া রায়ের সাথে ঘোষিত রায়ের মিল :
মঙ্গলবার ট্রাইব্যুনাল থেকে রায় ঘোষনার  আগে যে রায় ফাঁস হয়েছে এবং ফাঁস হওয়া রায় নিয়ে যেসব প্রতিবেদন এবং বুলেটিন প্রচারিত হয়েছে সেই সব প্রতিবেদনে রায় বিষয়ে যেসব তথ্য পরিবেশিত হয়েছে তার সাথে হুবহু মিলে গেছে ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক ঘোষিত রায়ের তথ্যের সাথে।

মঙ্গলবার সকালে ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক রায় প্রকাশের আগেই বিভিন্ন অনলাইন এবং অন্যান্য গনমাধ্যমে ফাঁস হওয়া রায় নিয়ে তৈরি করা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে  ১৯৭১ সালের মানবতাবিরোধী মোট ২৩টি অভিযোগে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে চার্জ গঠন করা হয়। সেখান থেকে মোট ১৭টি অভিযোগের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষী হাজির করে। যেহেতু রাষ্ট্রপক্ষ ১৭টি অভিযোগের পক্ষে সাক্ষী হাজির করেছে, তাই এ ১৭টি অভিযোগের বিষয়ে রায় লেখা হয়েছে মর্মে তথ্য দেখা যায় আইন মন্ত্রণালয় থেকে পাওয়া রায়ের কপিতে। আইন মন্ত্রণালয় থেকে পাওয়া রায়ে দেখা যায়, ১৭টি অভিযোগের মধ্যে মোট ৯টি অভিযোগে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। আটটি অভিযোগ থেকে তাকে খালাস দেয়া হয়েছে। এছাড়া যে ছয়টি অভিযোগের পক্ষে রাষ্ট্রপক্ষ সাক্ষী হাজির করেনি সেগুলো থেকেও তাকে খালাস দেয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে ২৩টি অভিযোগের মধ্যে ৯টি অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করা হয় এবং ১৪টি অভিযোগ থেকে তাকে খালাস দেয়া হয়। তবে ফাঁস হওয়া রায়ে শাস্তির কথা উল্লেখ ছিলনা।
ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক রায় ঘোষনার পর ফাঁস হওয়া রায়ের তথ্যের সাথে মিলিয়ে দেখা গেছে আগেই পরিবেশিত তথ্য হুবহু এক।
ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান এবং মেম্বারদের সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী মাঝে মধ্যে চেয়ারম্যান সাহেব, মেম্বার সাহেব বলে সম্বোধন করতেন। এসব বিষয়সহ আরো কিছু বিষয়ে রায়ে চৌধুরী সাহেবের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বিচারপতিরা। ট্রাইব্যুনালের রায়ে এ বিষয়টি উল্লেখ আছে। রায় প্রকাশের আগে ফাঁস হওয়া রায় নিয়ে তৈরি করা বুলেটিনেও এ তথ্য উল্লেখ ছিল।

ট্রাইব্যুনালের স্বীকারোক্তি :
সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর রায় ফাঁস হওয়ার কথা স্বীকার করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। তবে ফাঁস হওয়া রায়ের কপিটি  খসড়া রায়ের কপি বলে দাবি করা হয়েছে। রায় ফাঁসের ঘটনা স্বীকার করে  ২ অক্টোবর বুধবার   শাহবাগ থানায় জিডি করা হয়েছে ট্রাইব্যুনালের পক্ষ থেকে।
ট্রাইব্যুনাল-১ এর পক্ষে ট্রাইব্যুনালের মুখপাত্র রেজিস্ট্রার এ কে এম নাসিরউদ্দিন মাহমুদ আনষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে এ তথ্য জানান।  ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে রেজিস্ট্রার বলেন, কথিত ফাঁস হওয়া রায়ের কপি নিতান্তই একটি খসড়া যা রায় ঘোষণার অনেক আগেই কোন না কোনভাবে ‘লিকড’ বা ফাঁস হয়েছে এবং একটি দুষ্টচক্রের হস্তগত হয়েছে। খসড়া এ রায় ট্রাইব্যুনালের কম্পিউটারে কম্পোজ করার পর তা কোন না কোনভাবে ফাঁস হয়েছে। একটি সংঘবদ্ধ দুষ্ট চক্র যারা ট্রাইব্যুনাল ও এর বিচারিক কার্যক্রমকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে চান তারা এবং যারা এই অপকর্মের সুবিধাভোগী তারাই এই অপকর্মটি করেছে।
এই বিষয়টি উদঘাটনের লক্ষ্যে ইতোমধ্যেই ট্রাইব্যুনালের নির্দেশক্রমে থানায় জিডি করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
রেজিস্ট্রার এ কে এম নাসিরউদ্দিন মাহমুদ বলেন, দেখা যায় যে, কথিত ‘লিকড’ হওয়া রায়ের খসড়ার সাথে ঘোষিত রায়ের কিছু সাদৃশ্য রয়েছে। কিন্তু এটি আদৌ কোন রায় নয় যা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণার জন্য প্রস্তুত করা হয়েছিল।
লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন,

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুন্যাল-১-এর মাননীয় চেয়ারম্যান মহোদয়ের নির্দেশক্রমে ট্রাইব্যুনালের স্পোকসম্যান হিসেবে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টিকারী একটি তথ্য সম্পর্কে প্রাথমিক কিছু কথা বলা প্রয়োজন। গত ০১ অক্টোবর ২০১৩ তারিখে ট্রাইব্যুনাল-১ সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর মামলার রায় ঘোষণা করেছেন। এর আগে ৩০ সেপ্টেম্বর তারিখে ট্রাইব্যুনাল উন্মুক্ত আদালতে জানিয়েছেন যে, রায় প্রস্তুত এবং পর দিন অর্থাৎ ০১ অক্টোবর রায় ঘোষিত হবে।

আইন ও বিধি অনুসারে রায় ঘোষণার দিনই সাথে সাথে রায়ের সার্টিফাইড কপি পক্ষগণকে দিতে হয় যা অন্য কোন আইনে দেখা যায় না। তাই সঙ্গত কারণে রায় চূড়ান্তভাবে প্রস্তুত না করে রায় ঘোষণার তারিখ নির্ধারণ ও রায় ঘোষণা করা হয় না। এ কারণে সাধারণত রায় ঘোষণার ২/১ দিন আগে রায় চূড়ান্ত করা হয়ে থাকে। কেবল সাজা সংশ্লিষ্ট অংশটি রায়ের দিন মাননীয় বিচারকগণ একমত হয়ে চূড়ান্ত করে থাকেন।
রেজিস্ট্রার বলেন, আমরা গভীর উদ্বেগের সাথে লক্ষ্য করছি যে, মঙ্গলবার  যথারীতি রায় ঘোষণার পর অভিযুক্ত সাজাপ্রাপ্ত সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর পক্ষে নিয়োজিত আইনজীবী এবং অভিযুক্তের স্ত্রী ও পরিবারের সদস্যদের মিডিয়াকে দেয়া বক্তব্য থেকে জানা যায় যে, রায় আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণার পূর্বে তা ইন্টারনেটে কিছু ওয়েবসাইটে পাওয়া গেছে। তারা এটিও দাবি করেছেন যে, কথিত ‘রায়’ আইন মন্ত্রণালয়ের কম্পিউটারে সংরক্ষিত আছে।

তিনি বলেন, আপনারা জানেন যে, প্রসিকিউটর এবং অভিযুক্ত পক্ষের নিযুক্ত আইনজীবীগণ কোর্টের অফিসার। গতকাল (মঙ্গলবার) রায় ঘোষণার জন্য ট্রাইব্যুনাল আসন গ্রহণের পর অভিযুক্ত পক্ষের বিজ্ঞ আইনজীবীর দায়িত্ব ছিল কোন কোন ওয়েবসাইটে কথিত খসড়া রায় আগের দিন রাতে আপলোডেড পাওয়া গেছে সেই বিষয়টি ট্রাইব্যুনালের নজরে আনা। কিন্তু তিনি তা না করে আনুষ্ঠানিকভাবে রায় ঘোষণার পর কথিত খসড়ার হার্ড কপি দেখিয়ে মিডিয়ার সামনে এটি দাবি করেন যে, রায় আগেই ‘লিকড’ হয়েছে এবং এটি আইন মন্ত্রণালয়ের কম্পিউটারে রয়েছে এবং এটি একটি ‘ডিকটেটেড রায়’। অভিযুক্তের বিজ্ঞ আইনজীবীর এই উদ্দেশ্যমূলক বক্তব্য অসদাচরণ বটে। নিঃসন্দেহে রায় ঘোষণার পর এমন দাবি করা অসৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং ট্রাইব্যুনালকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চক্রান্তের অংশ।

লিখিত বক্তব্যে রেজিস্ট্রার বলেন, দেখা যায় যে, কথিত ‘লিকড’ রায়ের খসড়ার সাথে ঘোষিত রায়ের কিছু সাদৃশ্য রয়েছে। কিন্তু এটি আদৌ কোন রায় নয় যা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণার জন্য প্রস্তুত করা হয়েছিল। আপনারা লক্ষ্য করবেন যে, ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক ঘোষিত রায়ে অনুচ্ছেদ নম্বর উল্লেখ করা হয়েছে। পক্ষান্তরে কথিত ‘লিকড’ খসড়া রায়ে কোন অনুচ্ছেদ নম্বর নেই এবং এটি নিতান্তই একটি খসড়া যা রায় ঘোষণার অনেক আগেই কোনভাবে ‘লিকড’ হয়েছে এবং খসড়া পর্যায়ে লিকড হওয়া খসড়াটি রায় ঘোষণার বেশ ক’দিন পূর্বেই দুষ্ট চক্রের হস্তগত হয়েছে মর্মে অনুমিত। তাই যদি হয় তবে তা পূর্বে প্রকাশ না করে ঠিক আনুষ্ঠানিক রায় ঘোষণার আগের রাতে কথিত ওয়েবসাইটে আপলোডেড পাওয়া গেল কেন এবং কিভাবে? এ থেকে এটি স্পষ্ট অনুমিত যে, একটি সংঘবদ্ধ দুষ্ট চক্র যারা ট্রাইব্যুনাল ও এর বিচারিক কার্যক্রমকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে চান তারা এবং যারা এই অপকর্মের সুবিধাভোগী তারাই এই অপকর্মটি করেছে।

তিনি বলেন, সার্বিক বিবেচনায় প্রাথমিকভাবে এটি অনুমান করা হচ্ছে যে, কথিত খসড়া রায় ট্রাইব্যুনালের কম্পিউটারে কম্পোজ করার পর তা কোন না কোনভাবে ‘লিকড’ হয়েছে। এই বিষয়টি উদঘাটনের লক্ষ্যে ইতোমধ্যেই ট্রাইব্যুনালের নির্দেশক্রমে রেজিস্ট্রার থানায় জিডি করেছেন। আমরা আশা করি, সত্য বেরিয়ে আসবে এবং এই ষড়যন্ত্রের সাথে কারা কারা জড়িত তাদের চিহ্নিত করা যাবে। ট্রাইব্যুনালে কর্মরত কেউ যদি এই অপরাধমূলক কাজের সাথে জড়িত থাকেন তবে তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।

রায় ঘোষণার পর অভিযুক্ত পক্ষে তার বিজ্ঞ আইনজীবী এবং পরিবারের সদস্যরা দাবি করেছেন যে, সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর পক্ষে সাক্ষ্য দেয়ার জন্য বিচারপতি শামীম হাসনাইনকে ট্রাইব্যুনাল অনুমতি দেননি এবং এতে তার অধিকার ুণœ হয়েছে। এটি আদৌ সঠিক নয়। গত ২৭/৬/২০১৩ তারিখের ১৮৯ নং আদেশে ট্রাইব্যুনাল উল্লেখ করেছেন যে,



Ô Proposed witness No. 5 Mr. Justice Shamim Hasnain is the sitting Judge of the Supreme Court of Bangladesh, and as such without obtaining his consent, no summons will be issued upon him.


 ’ কিন্তু দেখা যায় যে, পরবর্তীতে মাননীয় বিচারপতি শামীম হাসনাইন এর নিকট থেকে এ বিষয়ে সম্মতি সংশ্লিষ্ট কোন কিছু ট্রাইব্যুনালকে অবহিত করা হয়নি।

যে বিষয়ে আপনাদের মাধ্যমে সবাইকে অবহিত করা হলো সে বিষয়ে পরবর্তী যে কোন অগ্রগতি যথারীতি আপনাদের অবহিত করা হবে। পরিশেষে এটি বলব যে, ইলেক্ট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার সহযোগিতা আমরা সব সময় পেয়েছি। প্রত্যাশা আগামীতেও এটি অব্যাহত থাকবে।
আপনাদের সবাইকে ধন্যবাদ।

রায় ফাঁসের ঘটনা বিষয়ে জিডি :
ট্রাইব্যুনালের পক্ষ থেকে শাহবাগ থানায় দায়ের করা জিডির কপি সংবাদ সম্মেলনে বিলি করা হয় সাংবাদিকদের মাঝে। জিডির বিবরনে লেখা হয়েছে-
আমি নিম্নস্বাক্ষরকারী এই মর্মে আদিষ্ট হয়ে জানাচ্ছি যে, গত ০১/১০/২০১৩ ইং তারিখ রোজ মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ বিচারাধীন আইসিটি বিডি কেস নং -২/২০১১ চীফ প্রসিকিউটর বনাম সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী-এর রায় প্রচারের জন্য দিন ধার্য ছিল। রায় ঘোষণার পর পরই আসামী সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর পরিবারের সদস্যগণ বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় প্রতিক্রিয়া ব্যক্তকালে জানান যে, উক্ত মামলার রায়ের কপি তারা ইন্টারনেটের মাধ্যমে পূর্বেই প্রাপ্ত হয়েছেন। আসামী সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর স্ত্রী ফারহাত কাদের চৌধুরী ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় প্রতিক্রিয়া ব্যক্তকালে আদালত হতে রায়ের কপি সরবরাহ করার পূর্বেই একটি ডকুমেন্ট ক্যামেরার সামনে প্রদর্শন করে বলেন যে, এই সেই ইন্টারনেট হতে প্রাপ্ত রায়ের কপি যা রায় ঘোষণার পূর্বেই তারা প্রাপ্ত হয়েছেন এবং সেটি নিয়েই তারা আদালত কক্ষে প্রবেশ করেছেন। তিনি আরো বলেন যে, আদালত হতে প্রচারিত রায় এবং ইন্টারনেট হতে প্রাপ্ত রায়ের মধ্যে মিল আছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল হতে প্রচারিত সমস্ত রায় ট্রাইব্যুনালেই প্রস্তুত করা হয়। রায় ঘোষণার পূর্বে রায়ের কোন অংশের কপি অন্য কোনভাবে প্রকাশের সুযোগ নেই। কিন্তু তারপরেও কথিত খসড়া রায়ের অংশ কিভাবে ইন্টারনেটে প্রচারিত হল বা কিভাবে ট্রাইব্যুনাল হতে খসড়া রায়ের অংশবিশেষ ফাঁস (Leaked) হল তা উদ্বেগের বিষয়। বিষয়টি ট্রাইব্যুনালের নিরাপত্তা ও স্বচ্ছতার প্রতি হুমকি স্বরূপ। উল্লেখ্য যে,
www.tribunalleaks.be  ওয়েবসাইটে কথিত খসড়া রায়ের অংশ আপলোডেড দেখা যায়।
এমতাবস্থায় বিষয়টি তদন্ত পূর্বক আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য অনুরোধ করা হল।
এ কে এম নাসির উদ্দিন মাহমুদ
রেজিস্ট্রার
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল
পুরাতন হাইকোর্ট ভবনম ঢাকা।
জিডি নং ৮৫ তাং ০২/১০/ডি

আলোচনায় নতুন মাত্রা :
ট্রাইব্যুনালে যেসব মামলার রায় হয়েছে এবং আরো যেসব মামলা বিচারাধীন রয়েছে তার মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত মামলা ছিল মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী মামলা। এরপর নানা কারনে অন্যতম আলোচিত মামলা ছিল সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী মামলা। রায় প্রকাশের আগেই রায় ফাঁস হয়ে যাবার ঘটনার মধ্য দিয়ে এ মামলায় আলোচনার নতুন মাত্রা যোগ হল।

সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী হলেন  বিএনপির প্রথম কোন নেতা যার বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক রায় প্রদান করা হল। ২০১১ সালে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে বিচারের উদ্যোগ গ্রহন উপলক্ষে তাকে ট্রাইব্যুনালে হাজিরের পর থেকে বিচার চলাকালে নানা ধরনের রসাত্মক, শ্লেষাত্মক এবং ব্যাঙ্গাত্মক মন্তব্য করে বিভিন্ন সময় সংবাদ শিরোনাম হয়েছেন জনপ্রিয় এই রাজনীতিক।

ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন ব্যক্তিবর্গের মধ্যে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী ছিলেন একমাত্র ব্যক্তি যিনি নিজে সাক্ষীকে জেরা করেছেন মাঝে মধ্যে। বিচার শুরুর আগে বিভিন্ন বিষয়ে দায়ের করা আবেদনের ওপর নিজেই  শুনানী করেছেন এবং জ্ঞানগর্ভ যুক্তি ও আলোচনা পেশ করেছেন ট্রাইব্যুনালে।  নিজের মামলায় নিজেই ইংরেজিতে দীর্ঘ জবানবন্দী প্রদান করেছেন। তার পক্ষে তিনি বিশিষ্ট ব্যবসায়ী সালমান এফ রহমান, হাইকোর্টের বিচারপতি শামীম হাসনাইন, আনোয়ার হোসেন মঞ্জুসহ পরিচিত এবং জনপ্রিয় বিভিন্ন ব্যক্তিবর্গকে সাক্ষী মানার ঘটনা দেশজুড়ে আলোচিত হয়েছেন।  বিচারের শুরুতে তিনি তার পক্ষে কোন আইনজীবী নিয়োগ না করে নিজেই নিজের মামলায় লড়বেন বলে ঘোষনা দেন। এরপর তার পক্ষে একজন রাষ্ট্রীয় আইনজীবী নিয়োগ দেয়ার পর তিনি নিজে আবার আইনজীবী নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেন।

রায় ফাঁস এবং  স্কইপ একই মুদ্রার দুই পিঠ
ট্রাইব্যুনালের বিচার কার্যক্রমে বাইরের বিভিন্ন মহলের প্রভাব বিস্তারের মাত্রা, বিস্তৃতি এবং তাৎপর্য উপলব্ধি করা যায় ট্রাইব্যুনালের সাবেক চেয়ারম্যান  বিচারপতি নিজামুল হক এর  স্কাইপ সংলাপের মাধ্যমে। আর রায় ফাঁসের ঘটনাটি স্কাইপের চেয়েও কয়েক ধাপ এগিয়ে রয়েছে। কারণ স্কাইপ সংলাপকে যদি ধরা হয় থিওরি  তবে রায় ফাঁসের ঘটনাটি হল প্রাকটিক্যাল। যাকে বলে কট রেড হ্যান্ডেড । রায় ফাঁসের ঘটনাকে   স্কাইপ ঘটনারই ধারাবাহিক ঘটনা হিসেবে আখ্যায়িত করা যায়। রায় ফাঁসের ঘটনা স্কাইপ কেলেঙ্কারিকে  সুস্পষ্ট ভিত্তির ওপর দাড় করিয়েছে।  স্কাইপ সংলাপ এবং রায় ফাঁসের ঘটনা একই মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ । কেননা  বিচারপতি নিজামুল হক এবং বেলজিয়ামের ড. আহমেদ জিয়াউদ্দিনের মধ্যকার স্কাইপ সংলাপে এটি স্পষ্ট যে, ড. আহমেদ জিয়াউদ্দিন নেপথ্যে থেকে ট্রাইব্যুনালের বিচার কাজে হস্তক্ষেপ করেছেন। বিচারপতি নিজামুল হক ম ট্রাইব্যুনালে এমন অনেক আদেশ পড়ে শুনিয়েছেন যা হুবহু বেলজিয়াম থেকে এসেছে মর্মে দেখা যায়। আসামী পক্ষ এসব ট্রাইব্যুনালে দায়ের করেছে। স্কাইপ সংলাপে আরো যে বিষয়টি স্পষ্ট তা হল বেলজিয়াম ছিল মূলত একটি ভায়া মাধ্যম। বেলজিয়ামে বসে ড. আহেমদ জিয়াউদ্দিন নিয়মিত রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী, বিচার নিয়ে সোচ্চার দেশের বিভিন্ন মহল, সংশ্লিষ্ট  মন্ত্রণালয়সহ সরকারের উচু মহলে যোগাযোগ রাখতেন মর্মে প্রমান রয়েছে স্কাইপ সংলাপে। এসব মহলের দিক নির্দেশনা এবং পরামর্শ মোতাবেক তিনি বেলজিয়ামে বসে কার্যক্রম ঠিক করতেন এবং সে ভিত্তিতে তিনি ভায়া মাধ্যম হিসেবে ট্রাইব্যুনালের কাজে হস্তক্ষেপ করতেন। স্কাইপ সংলাপে আইনমন্ত্রী, আইনপ্রতিমন্ত্রীসহ আরো বিভিন্ন ব্যক্তিবর্গ বিষয়ে আলোচনা রয়েছে ট্রাইব্যুনালের বিচারকে ঘিরে।  এসব কারনে আসামী পক্ষ তখন অভিযোগ করে  ট্রাইব্যুনালের বিচার কাজে  সরকারের সরাসরি প্রভাব রয়েছে। এখন সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর আইনজীবী এবং আসামী পক্ষ অভিযোগ করল আইন মন্ত্রণালয়ের অফিসের কম্পিউটারের থেকে রায় ফাঁস এবং আইন   মন্ত্রণালয়ের অফিসে বসে রায় লেখা হয়েছে।
স্কাইপ এবং রায় ফাঁসের কেলেঙ্কারির ঘটনা নিয়ে আসামী পক্ষের অভিযোগ মেলালে যেটি দাড়ায় তা হল  স্কাইপ কেলেঙ্কারি এবং রায় ফাঁস একই মুদ্রার দুই পিঠ। একটি ঘটনা অপর ঘটনাকে সমর্থন  করছে।

বলির পাঠা হবে কে?
ট্রাইব্যুনাল স্বীকার করেছে ট্রাইব্যুনালের কম্পিউটার থেকে রায়ের খসড়া ফাঁস হয়েছে। ট্রাইব্যুনালের এ স্বীকারোক্তি নিয়ে গুঞ্জন এবং আলোচনা চলছে নানা মহলে। কারো কারো মতে আইন মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্যদের রক্ষার উদ্দেশে ট্রাইব্যুনালকে দিয়ে এ স্বীকারোক্তি করানো হতে পারে।  তারা এখন অপেক্ষায় আছে এ ঘটনায় কারা কারা বলির পাঠা হয় তা দেখার জন্য।

রায়ের সংক্ষিপ্ত বিবরন :
১ অক্টোবর মঙ্গলবার বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য বিশিষ্ট পার্লামেন্টরিয়ান সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে মৃত্যুদন্ডের রায় ঘোষনা করে আন্তর্জঅতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। 

১৯৭১ সালে মানবতাবিরোধী অপরাধেল চারটি অভিযোগে তাকে   মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়েছে। এছাড়া তিনটি অভিযোগের  প্রত্যেকটিতে ২০ বছর এবং আরো দুটি অভিযোগের প্রতিটিতে পাঁচ বছর করে জেল দেয়া হয়েছে তাকে।
যে চারটি অভিযোগে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়েছে সেগুলো হল রাউজানের গহিরায় কুন্ডেশ্বরী কমপ্লেক্সের প্রতিষ্ঠাতা নূতন চন্দ্র সিংহ হত্যাকান্ড, চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগ নেতা মোজাফফর এবং তার ছেলে শেখ আলমগীর হত্যা, রাউজানের  ঊনসত্তরপাড়ায় সশস্ত্র অভিযান চালিয়ে  ৫০ থেকে ৫৫ জন হিন্দুকে  ব্রাশফায়ার করে হত্যা এবং সুলতানপুরে তিনজনকে গুলি করে হত্যা।

এছাড়া রাউজানের গহিরা  গ্রামের  হিন্দু  পাড়ায় সশস্ত্র অভিযান চালিয়ে  পঞ্চবালা শর্মা, সুনীল শর্মা, মতিলাল শর্মা ও দুলাল শর্মা লাল শর্মা হত্যা; জগৎমলপাড়ায় ৩২ জনকে হত্যা এবং  রাউজান পৌরসভা এলাকার সতীশ চন্দ্র পালিতের বাড়িতে  প্রবেশ করে তাকে গুলি করে হত্যার অভিযোগে ২০ বছর করে  জেল দেয়া হয়েছে।
সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে মোট ২৩ টি অভিযোগে  চার্জ গঠন করা হয়েছিল। রাষ্ট্রপক্ষ সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে ২৩টি অভিযোগের মধ্য থেকে ১৭টি অভিযোগের পক্ষে সাক্ষী হাজির করে । ১৭টি অভিযোগ থেকে  তাকে মোট ৯টি অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে ট্রাইব্যুনালের রায়ে। বাকী আটটি অভিযোগ থেকে তাকে খালাস দেয়া  হয়েছে।
এছাড়া রাষ্ট্রপক্ষ বাকী যে ছয়টি অভিযোগের পক্ষে সাক্ষ্য প্রমান হাজির করেনি সে ছয়টি অভিযোগ থেকেও সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে খালাস দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ তাকে মোট  ১৪টি অভিযোগ থেকে তাকে খালাস দেয়া হয়েছে ট্রাইব্যুনালের রায়ে। 
ট্রাইব্যুনাল-১  চেয়ারম্যান বিচারপতি  এটিএম ফজলে কবির, সদস্য বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন ও বিচারপতি আনোয়ারুল হক পালাক্রমে রায় পড়ে শোনান।

পাকিস্তান অবস্থানের দাবি নাকচ :
সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধ শুরুর পর চট্টগ্রামের রাউজান, রাঙ্গুনিয়া এবং বোয়ালিয়া থানায় বিভিন্ন হত্যা, গনহত্যা, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট, মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোকজনকে হত্যা নির্যাতন এবং হিন্দু সম্প্রদায়কে হত্যা, নির্মূল এবং দেশান্তরকরনের অভিযোগ আনা হয় রাষ্ট্রপক্ষ থেকে।  আর সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর দাবি ছিল ১৯৭১ সালের ২৯ মার্চ তিনি পাকিস্তানে চলে যান। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বদলী ছাত্র হিসেবে তিনি  পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং যুদ্ধের পুরো সময় পাকিস্তান অবস্থান করেন। পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অধ্যয়ন শেষে ১৯৭১ সালের অক্টোবার মাসে  লন্ডনে চলে যান এবং লিঙ্কন ইনে ভর্তি হন। সেখান থেকে ১৯৭৪ সালে তিনি সর্বপ্রথম দেশে আসেন বলে দাবি করে তিনি।

১৯৭১ সালে তার পাকিস্তান অবস্থান বিষয়ে বাংলাদেশের এবং পাকিস্তানের জীবিত অনেক ভিআইপি ব্যক্তিবর্গের নাম  উল্লেখ করেছিলেন সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী তার জবানবন্দীতে।  বাংলাদেশে যাদের নাম উল্লেখ করেছেন তাদের মধ্যে রয়েছেন সুপ্রীম কোর্টের বর্তমান বিচারপতি শামীম হাসনাইনের নাম। সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী বলেছেন শামীম হাসনাইন তার সাথে তখন একই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তেন এবং তিনি তার বন্ধু ছিলেন। এছাড়া  বিশিষ্ট ব্যবসায়ী এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বর্তমান উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানও সেসময় পাকিস্তান অবস্থান করছিলেন এবং তার সাথে নিয়মিত দেখা সাক্ষাত হত দাবি করে  তাকেও তিনি সাক্ষী মেনেছিলেন।

১৯৭১ সালে পাকিস্তানে অবস্থান বিষয়ে পাকিস্তানে বর্তমানে জীবিত যেসব গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গের নাম উল্লেখ করেছেন তাদের মধ্যে রয়েছেন পাকিস্তানের সাবেক ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট এবং ২০০৮ সালে কেয়ারটেকার সরকারের প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মিয়া সামরু, সাবেক তথ্যমন্ত্রী ইসকাহ খান খাকওয়ানী, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী সিদ্দিক খান কানজু প্রমুখ। এরা সকলেই তার কাসমেট ছিলেন। সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী ট্রাইব্যুনালে বলেন, আমি যে ১৯৭১ সালে পাকিস্তান ছিলাম সে মর্মে তারাসহ আরো অনেকে এফিডেভিড পাঠিয়েছেন আমাকে। তারা আমার পক্ষে এসে সাক্ষ্য দিতে চান কিন্তু বাংলাদেশ সরকার তাদের এদেশে আসার বিষয়ে ভিসা দিচ্চেনা।

তবে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তার পাকিস্তান অবস্থান বিষয়ে দাবি নাকচ করে দেয়া হয়েছে রায়ে।  দৈনিক পাকিস্তান পত্রিকায় ২৯/৯/১৯৭১ সালে প্রকাশিত একটি খবরের ভিত্তিতে আসামী পক্ষের এ দাবি নাকচ করা হয়েছে। ওই খবরে বলা হয় মুক্তিযোদ্ধাদের বোমা হামলায় সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী তখন আহত হন এবং গাড়িতে থাকা চালক নিহত হয়।

মামলার সংক্ষিপ্ত বিবরন
গত বছর ১৯ এপ্রিল সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে চার্জ গঠনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক বিচার কার্যক্রম শুরু হয়। এক বছর চার মাসের মাথায় আলোচিত এ মামলার সমস্ত বিচার কার্যক্রম শেষ হয় গত ১৪ আগস্ট। ওই দিন যুক্তি উপস্থাপন শেষে রায় অপেক্ষমান ঘোষনা করা হয়। 
২০১০ সালের ১৬ ডিসেম্বর ভোরে গ্রেফতার করা হয় সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে।

১৭টি অভিযোগের পক্ষে রাষ্ট্রপক্ষ মোট ৪১ জন সাক্ষী হাজির করে। অপর দিকে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর পক্ষে আসামী নিজেসহ মোট চারজন সাক্ষী সাক্ষ্য দেন। 

কে এই সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী?
সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে স্বতন্ত্র বৈশিষ্টমন্ডিত একজন  আলোচিত ব্যক্তিত্ব।  বক্তব্যের নিজস্ব স্টাইলের অধিকারী  এবং বাকপটু  এই ব্যক্তিত্ব  তীর্যক এবং স্পষ্ট উচ্চারনের জন্য সমধিক পরিচিত। বাংলাদেশে হাতেগোনা যে কয়জনকে  খ্যাতিমান পার্লামেন্টারিয়ান হিসেবে গন্য করা হয় তিনি তাদের অন্যতম। স্বাধীন বাংলাদেশে তিনি পরপর ছয়বার জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন।
সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী একটি প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান। তার পিতা ফজলুল কাদের চৌধুরী মুসলিম লীগের প্রভাবশালী নেতা ছিলেন এবং পাকিস্তানের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের স্পীকার ছিলেন। স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে ঢাকা কেন্দ্রীয় করাগারে বন্দী অবস্থায় ৫৪ বছর  বয়সে  তার মৃত্যু হয়।

সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর রাজনৈতিক ক্যারিয়ার শুরু হয় পিতার মুসলিম লীগের অনুসারী হিসেবে। ১৯৭৯ সালে তিনি মুসলিম লীগ থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচতি হন। এরপর ৮৮ সালে তিনি ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক লীগ গঠন করেন। ১৯৯৬  সালে দল বিলুপ্ত করে যোগ দেন বিএনপিতে। মাঝখানে জাতীয় পার্টি থেকে তিনি  মন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেন।

তৎকালীন পূর্ব  পাকিস্তান ক্যাডেট কলেজে (বর্তমানে ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজ) ভর্তি হন  ১৯৬০ সালে এবং সেখান থেকে এসএসসি  পাশ করেন ১৯৬৬ সালে। এরপর  নটরডেম কলেজে ১৯৬৬ সালে ভর্তি হন।  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্নাসে ভর্তির পর মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ে বদলি হন এবং সেখানে অধ্যয়ন শেষে ১৯৭১ সালে অক্টোবর মাসে লন্ডনের লিঙ্কন ইনে ভর্র্তি  হন ব্যারিস্টারি পড়ালেখার জন্য। তবে ব্যারিস্টারি পাঠ শেষ করেননি তিনি।  ক্যাডেট কলেজে ভর্তির আগে তিনি পাকিস্তানের বিখ্যাত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সাদিক পাবলিক স্কুলে পড়াশুনা করেন।

সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী ছাত্রজীবনে  সরাসরি কোন ছাত্রসংগঠনের সাথে জড়িত  না থাকলেও আইয়ূব বিরোধী আন্দোলনে যোগদান করেন।  ১৯৭১ সালে ঐতিহাসিক  ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানের সমাবেশেও উপস্থিত ছিলেন বলেন তিনি তার জবানবন্দীতে উল্লেখ করেছেন।

সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর জন্ম ১৯৪৯ সালে ১৩ মার্চ। বর্তমানে তার বয়স ৬৪ বছর ৭ মাস। বিচার চলাকালে তিনি একদিন ওপেন কোর্টে মন্তব্য করেন ঢাকার জেলখানা থেকে আমার পিতার লাশ বের করা হয়েছিল ৫৪ বছর বয়সে। আমার বয়স আমার পিতাকে ছাড়িয়ে গেছে। মৃত্যু নিয়ে আমার কোন আফসোস নেই।
৪/১০/২০১৩



শুক্রবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৩

কাদের মোল্লার মৃত্যুদন্ড// ঘটনাবহুল আলোচিত একটি মামলা


মেহেদী হাসান
২৭/৯/২০১৩
শুধু বাংলাদেশ নয়, নানা কারনে গোটা বিশ্বে একটি আলোচিত এবং ঘটনাবহুল  মামলা হিসেবে স্থান করে নিয়েছে আব্দুল কাদের মোল্লা মামলাটি। ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক কাদের মোল্লার রায়কে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে শাহবাগকেন্দ্রিক আন্দোলন, গণজাগরন মঞ্চ। যার প্রতিকৃয়া হিসেবে উত্থান হয় হেফাজতে ইসলাম এবং শেষ পর্যন্ত যা গড়ায় অপারেশন শাপলা পর্যন্ত। যুদ্ধাপরাধ ইস্যু, আব্দুল কাদের মোল্লা মামলা এবং এরই  ধারাবাহিকতায় একের পর এক ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনা শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের রাজনীতির গতি প্রকৃতির অন্যতম নির্ধারক হিসেবে আবির্ভূত   হয়। শাহবাগের ধারাবাহিকতায় অপারেশন শাপলা এবং এর পরে অনুষ্ঠিত চারটি সিটি নির্বাচনে সরকারের ধরাশয়ী হবার ঘটনা একই সূত্রে গাঁথা বলেই প্রতীয়মান হয়েছে। যুদ্ধাপরাধ ইস্যু তথা আব্দুল কাদের মোল্লা মামলা তাই বাংলাদেশের নির্বাচন কেন্দ্রিক রাজনীতিতে ভোটের বাক্স নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় পরিণত হয়েছে শেষ পর্যন্ত। এটি ছাড়াও আইনী কারনে এ মামলা বাংলাদেশ তথা বিশ্বের বিচার বিভাগের ইতিহাসে একটি আলোচিত ঘটনা হিসেবে স্থান করে নেবে ভবিষ্যতে। কারণ এই বিচারের রায় হয়ে যাবার পর  আইন সংশোধন করা হয়েছে। বিচারিক আদালতের সাজা বাড়িয়ে আসামীকে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে যা অতীতে সুপ্রীম কোর্টে কখনো হয়নি বলে জানিয়েছে আসাসী পক্ষ।

চলতি বছর পাঁচ ফেব্রুয়ারি ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে যাবজ্জীন দণ্ড  দেয়া হয়। এ রায়কে কেন্দ্র করে  শাহবাগকেন্দ্রিক আন্দোলন গড়ে ওঠে । আন্দোলনকারীদের দাবি আব্দুল কাদের মোল্লাকে ফাঁসি দিতে হবে। ফাঁসি ছাড়া অন্য কোন রায় তারা মেনে নিতে রাজি নয়। কাদের মোল্লার যে অপরাধ তাতে ফাঁসিই একমাত্র তার উপযুক্ত শাস্তি। এ  দাবির প্রেক্ষিতে  ১৮ ফেব্রুয়ারি ট্রাইব্যুনাল আইন সংশোধন করা হয়  সরকার পক্ষের জন্য আপিলের বিধান রেখে।  আইন সংশোধনের পর সরকার আব্দুল কাদের মোল্লার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দাবি করে আপিল আবেদন করে সুপ্রীম কোর্টের আপিল বিভাগে। 

ট্রাইব্যুনাল আইনে পূর্বের বিধান ছিল আসামী পক্ষ সাজার বিরুদ্ধে আপিল করতে পারবে। আসামীর সাজা হলে রাষ্ট্রপক্ষের জন্য আপিলের বিধান ছিলনা। আসামীকে খালাস দেয়া হলে সেক্ষেত্রে রাষ্ট্রপক্ষের জন্য আপিলের বিধান ছিল। ১৮ ফেব্রুয়ারি আইন সংশোধন করে উভয় পক্ষকে আপিলের সমান সুযোগ দেয়া হয় এবং আইনের সংশোধনীকে  ২০০৯ সাল থেকে কার্যাকারিতা  প্রদান করা হয়। অর্থাৎ ধরে নিতে হবে এই সংশোধনী এবং সরকার পক্ষের জন্য আপিলের বিধান  ২০০৯ সাল থেকে কার্যকর রয়েছে। 

আইনের সংশোধনীর কারনে আব্দুল কাদের মোল্লার আপিল শুনানী শেষ পর্যন্ত অ্যামিকাস কিউরি পর্যন্ত গড়ায়। ১৮ ফেব্রুয়ারি আইনের যে সংশোধন করা হয়েছে তা আব্দুল কাদের মোল্লার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য কি-না জানতে চেয়ে ২০ জুলাই সুপ্রীম কোর্টের সাতজন বিশিষ্ট আইনজীবীকে অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে নিয়োগ দেয় আপিল বিভাগ।  কারণ আইনটি আব্দুল কাদের মোল্লার রায়কে কেন্দ্র করে সংশোধন করা হলেও তা আব্দুল কাদের মোল্লার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না সামনে যেসব মামলার রায় দেয়অ হবে ট্রাইব্যুনাল থেকে সেক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে তার কোন কিছু নির্দিষ্টভাবে উল্লেখ ছিলনা। সংশোধনীর ভূমিকায় চলমান বিচার কথাটি উল্লেখ ছিল। সেকারনে শুনানীর সময় একজন বিচারপতি এ বিষয়টির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেন এবং তখন থেকে প্রশ্নটি সামনে আসে এ সংশোধনী কাদের মোল্লার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে কি-না। এ প্রশ্নকে কেন্দ্র করে শেষ পর্যন্ত  এ্যামিকাস কিউরি নিয়োগ দেয়া হয়। এরা হলেন, সাবেক বিচারপতি  টি এইচ খান, সাবেক এটর্নি জেনারেল প্রবীন আইনবিদ ব্যারিস্টার রফিক-উল হক, ব্যারিস্টার এম আমীর উল ইসলাম, সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল মাহমুদুল ইসলাম, সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল এএফ হাসান আরিফ, ব্যারিস্টার রোকনউদ্দিন মাহমুদ ও ব্যারিস্টার আজমালুল হোসেন কিউসি । এসব নানা কারনে আব্দুল কাদের মোল্লা মামলাটি গোটা দেশজুড়ে আলোচিত একটি  মামলায় পরিণত হয়।

রায়ে আসামী পক্ষের প্রতিকৃয়া :
আসামী পক্ষের প্রধান আইনজীবী ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক রায়ের পর বলেছেন, বিচারিক আদালত কর্তৃক প্রদত্ত যাবজ্জীবন সাজা বাড়িয়ে সুপ্রীম কোর্টের আপিল বিভাগ কর্র্তৃক মৃত্যুদণ্ড প্রদানের ঘটনা বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথম এবং বিচার বিভাগের জন্য এটি একটি দুর্ভাগ্যজনক অধ্যায়।
আপিল বিভাগে আবদুল কাদের মোল্লার রায় ঘোষণার পরপরই সুপ্রিম কোর্ট বার ভবনের মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি একথা বলেন।

ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক লিখিত বক্তব্যে বলেন, সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ সংখ্যাগরিষ্ঠের ভিত্তিতে আবদুল কাদের মোল্লাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেছেন। একটি প্রতিষ্ঠান হিসাবে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের প্রতি আমরা শ্রদ্ধাশীল, কিন্তু এটি একটি ভুল রায়। আমরা এ রায়ে সংুব্ধ। আমরা বিস্মিত। আমরা মনে করি- এ রায় ন্যায় বিচারের পরিপন্থি।
বিচারিক আদালত যেখানে মৃত্যুদণ্ড দেননি সেখানে প্রথমবারের মতো সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের মৃত্যুদণ্ড প্রদান বাংলাদেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন। তাছাড়া স্কাইপ কেলেঙ্কারির পরও ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান আইনের শাসনের পরিপন্থি। আমাদের সমাপনী বক্তব্যে আমরা বলেছিলাম- যে সাক্ষ্য প্রমাণ আদালতের সামনে উপস্থাপন করা হয়েছে, তার ভিত্তিতে আবদুল কাদের মোল্লাকে দোষী সাব্যস্ত করার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু এটা দুর্ভাগ্যজনক যে, আজ তাকে শুধু দোষী সাব্যস্তই করা হয়নি, মৃত্যুদণ্ডও দেয়া হয়েছে। বিচারের ইতিহাসে এটি একটি দুঃখজনক অধ্যায়।

রিভিউ বিতর্ক
আবদুল কাদের মোল্লাকে আপিল বিভাগ কর্তৃক মৃত্যুদণ্ড প্রদানের পরপরই শুরু হয় রিভিউ আবেদন নিয়ে বিতর্ক।  রায় ঘোষণার পরপরই অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম সাংবাদিকদের বলেন, এই রায়ের বিরুদ্ধে রিভিউ আবেদন দায়ের করার কোন সুযোগ নেই। আপিল বিভাগের রায়ের মধ্য দিয়েই এই মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে।

এরপর আবদুল কাদের মোল্লার আইনজীবীরা সুপ্রিম কোর্ট বার অডিটোরিয়ামে রায় বিষয় অনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া প্রদান করেন। তখন সাংবাদিকরা কাদের মোল্লার প্রধান আইনজীবী ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাকের কাছে অ্যাটর্নি জেনারেলের অভিমতের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সংবিধান আসামীকে রিভিউ আবেদন দায়ের করার সুযোগ দিয়েছে। সংবিধান দেশের সর্বোচ্চ আইন। সুপ্রিম কোর্ট সংবিধানের অধীনে চলে। আর ট্রাইব্যুনাল আইনের উপরে সংবিধান। সুপ্রীম কোর্ট ট্রাইব্যুনালের আইন দিয়ে চলেনা। আমরা সংবিধান ও ট্রাইব্যুনাল আইনে আপিল দায়ের করেছি। একজন যাবজ্জিবন সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে। মৃত্যুদন্ডের  রায়ের বিরুদ্ধে তার রিভিউয়েরও  যদি সুযোগ না থাকে তাহলে সে যাবে কোথায়? কাজেই রিভিউ আবেদনের সুযোগ নেই এটা সঠিক নয়।

ব্যারিস্টার রাজ্জাকের এই যুক্তি সম্পর্কে জানতে চাইলে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম সাংবাদিকদের বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল একটি বিশেষ আইন। এ রায়কে সংবিধান সুরক্ষা দিয়েছে। এ আইনে ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার বিধান আছে, তবে রিভিউ দায়েরের কোন সুযোগ নেই। আপিল বিভাগের রায়ের মধ্য দিয়েই এই মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ। এখন আসামী চাইলে রাষ্ট্রপতির কাছে মা চাইতে পারেন। রাষ্ট্রপতির কাছে মার আবেদন নাকচ হলে রায় কার্যকর করা যাবে।
তিনি বলেন, আমার অভিমত আমি দিয়েছি। রাজ্জাক সাহেব তার অভিমত দিয়েছেন। সেেেত্র রিভিউ করা যাবে কি-না, সেটি সিদ্ধান্ত নেবে আদালত।
অন্যদিকে আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ রায়ের পার মন্ত্রণালয়ে এক ব্রিফিংয়ে বলেছেন, রায় রিভিউ হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। অন্যদেশে এ ধরনের অপরাধে আপিলেরও সুযোগ থাকে না। বিচার বিভাগ বিশেষ আইনে না চললেও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে আপিল হয়েছিল।

বাংলাদেশ সংবিধানের ১০৫ অনুচ্ছেদে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ কর্তৃক ঘষিত রায় বা আদেশ পুনর্বিবেচনা করা বিধান রয়েছে। রিভিউ আবেদন বিষয়ে সংবিধানের ওই অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে ‘আপিল বিভাগের কোন ঘোষিত রায় বা প্রদত্ত আদেশ পুনর্বিবেচনার ক্ষমতা উক্ত বিভাগের থাকিবে।’
এসব বিতর্কের কারনে এখন সবশেষে আইনজ্ঞদের মতে যেহেতু আইনমন্ত্রী, এটর্নি জেনারেল বলেছেন রিভিউ’র সুযোগ নেই এবং বিরোধী পক্ষ বলছে সুযোগ আছে তাই এখন এ বিষয়ে আপিল বিভাগকেই সুরাহা করতে হবে।


মোমেনা বেগমের জবানবন্দী এবং যাদুঘরে রক্ষিত ডকুমেন্টে যা রয়েছে
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লাকে ট্রাইব্যুনাল  যে দুটি  অভিযোগে  যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান  করা হয়েছে তার মধ্যে একটি অভিযোগ হল মিরপুরে কালাপানি লেনে হযরত আলী,  তার ছেলে, মেয়ে, স্ত্রীকে হত্যা ও    মেয়েদের ধর্ষনের ঘটনা। এ ঘটনাটিতেই আপিল বিভাগের রায়ে আব্দুল কাদের মোল্লাকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়েছে।
এবার দেখা যাক মোমেনা বেগম ট্রাইব্যুনালে এসে কি বলেছেন এবং মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘরে তার নামে রক্ষিত ডকুমেন্ট এ কি রয়েছে ।
হযরত আলী লস্কর পরিবার হত্যাকান্ড  ঘটনায় বেঁচে যায় হযরতী আলী লস্করের   বড় মেয়ে মোমেনা বেগম। মোমেনা বেগম ট্রাইব্যুনালে এসে আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছেন এ ঘটনা বিষয়ে । এই  সাক্ষী মোমেনা বেগম তাদের পরিবারের সদস্যদের হত্যা এবং ধর্ষনের ঘটনা বিষয়ে ২০০৭ সালে মুক্তিযুদ্ধ যাদঘর কর্তৃপক্ষের কাছে জবানবন্দী দিয়েছেন। ট্রাইবু্যুনালে মোমেনা বেগম বলেছেন ঘটনার সময় তিনি ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন এবং পরিবারের সদস্যদের হত্যা এবং ধর্ষনের ঘটনা দেখেছেন। তিনি নিজেও  ধর্ষন/ লাঞ্ছনার  শীকার হন এবং এক পর্যায়ে অচেতন হয়ে পড়েন। অপর দিকে মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘরে  কাছে  তিনি  ঘটনার বর্ননা দিয়ে বলেছেন ঘটনার দুই দিন আগে তিনি শশুরবাড়ি চলে যাওয়ায় প্রানে বেঁচে যান। কোর্টে তিনি বললেন ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন আর মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘরে রক্ষিত বক্তব্যে দেখা যায় তিনি ঘটনার দুই দিন আগে শশুর বাড়ি চলে যান।
ক্যামেরা ট্রায়ালের মাধ্যমে (রুদ্ধদ্বার কক্ষে বিচার পরিচালনা)  মোমেন বেগমের  সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয় ট্রাইব্যুনালে।  ফলে সেসময় মোমেনা বেগমের সাক্ষ্য সংবাদ মাধ্যমে প্রচার বা প্রকাশিত হয়নি। তবে মোমেনা বেগম কোর্টে যে জবানবন্দী দিয়েছেন তা আব্দুল কাদের মোল্লার রায়ে  বর্ননা করা হয়েছে বিস্তারিতভাবে।
ট্রাইব্যুনালে মোমেনা বেগমের  জবানবন্দীর উদ্ধৃতি দিয়ে রায়ে বলা হয়েছে, ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ ঘটনা ঘটে। মোমেনা বেগমরা তখন মিরপুর ১২ নম্বর সেকশনের  ৫ নং কালাপানি লেনে ২১ নম্বর বাসায় থাকতেন। মোমেনা বেগম কোর্টে সাক্ষ্য দিয়ে  ঘটনা বিষয়ে বলেন, সন্ধ্যার সময় তার পিতা হযরত আলী হন্তদন্ত হয়ে  ঘরে আসলেন এবং  বললেন কাদের মোল্লা তাকে মেরে ফেলবে। কাদের মোল্লা এবং তার বিহারী সাগরেদ আক্তার গুন্ডা তার পিতাকে হত্যার জন্য ধাওয়া করছে। তার পিতা ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল। এরপর তারা বাইরো বোমা ফাটাল। দরজা খোলার জন্য গালিগালাজ করল। তার মা দাও  হাতে নিয়ে দরজা খুলল। তারা ঘরে ঢুকে গুলি করে হত্যা করল তার মাকে। কাদের মোল্লা তার পিতাকে কলার ধরে টেনে বাইরে নিয়ে গেল। তার সঙ্গীরা তার বোন খাদিজা এবং তাসলিমাকে জবাই করল। দুই বছরের ভাইকে আছড়িয়ে হত্যা করে।
মোমেনা জানায় সে এবং তার  ১১ বছর বয়স্ক অপর বোন আমেনা খটের নিচে আশ্রয় নেয় ঘটনার সময়। আমেনা ভয়ে চিৎকার দেয়ায় তাকে খটের নিচ থেকে টেনে বের করে জামাকাপড় ছিড়ে ফেলে এবং এক পর্যায়ে তার কান্না থেমে যায়।  এক পর্যায়ে তাকেও টেনে বের করে এবং ধারাল অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে। এক পর্যায়ে সে জ্ঞান হারায় এবং জ্ঞান ফিরে পেটে প্রচন্ড ব্যর্থা অনুভব করে। তার পরনের প্যাণ্ট ছিন্নভিন্ন অবস্থায় পান তিনি। পরে এক  ঘরে গিয়ে আশ্রয় নেন এবং তাদের সেবার মাধ্যমে কিছুটা সুস্থ হন। পরে তার শশুর খবর পেয়ে তাকে এসে নিয়ে যান।
রয়ে মোমেনা বেগমের বরাদ দিয়ে তাদের পরিবারের ঘটনার    বর্ননা করা হয়েছে তার সংক্ষিপ্ত চিত্র এটি।

মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘরে রক্ষিত ডকুমেন্ট :
হযরত আলী হত্যাকান্ডসহ আরো অনেক হত্যাকান্ড বিষয়ে  শহীদ পরিবারের আত্মীয় স্বজনদের  সাক্ষাতকার,  লিখিত বক্তব্যের মূল কপি, অডিও ভিডিও বক্তব্য সংরক্ষিত আছে মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর কর্তৃপক্ষের কাছে। এছাড়া লিখিত  বক্তব্যের ডুপ্লিকেট কপি সংরক্ষিত আছে মিরপুর জল্লাদখানা যাদুঘরে।  মিরপুর ১০ নম্বরে অবস্থিত  পাম্প হাউজে  এনে ১৯৭১ সালে বিহারীরা বাঙ্গালীদের হত্যা করত। হত্যার পর তাদের লাশ ফেলে দিত পানির ট্যাংকি এবং পার্শবর্তী ডোবায়। ১৯৯০ দশকে  এখানকার বধ্যভূমিটি আবিষ্কার হয় এবং  অসংখ্য শহীদদের কঙ্কাল উদ্ধার করা হয়। এরপর পাম্প হাউজটিকে  জল্লাদখানা যাদুঘর করা হয় এবং এটি বর্তমানে মুুক্তিযুদ্ধ যাদু ঘরের অংশ।  জল্লাদখানায় ১৯৭১ সালে যাদের হত্যা করা হয়েছে যাদুঘর কর্তৃপক্ষ তাদের পরিবারে অনেক আত্মীয় স্বজনকে খুঁজে বের করে বিভিন্ন  সময়ে তাদের সাক্ষাতকার  বক্তব্য রেকর্ড করে তা যাদুঘরে সংরক্ষন করে মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর কর্তৃপক্ষ।
যে হযরত আলী হত্যাঘটনায় আব্দুল কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে সেই ঘটনার একটি বিবরন রক্ষিত আছে মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘরের কাছে। হযরত আলীর বেঁচে যাওয়া একমাত্র মেয়ে মোমেনা বেগমের বরাত দিয়েই সে ঘটনার বর্ননা  লিপিবদ্ধ এবং সংরক্ষন করা হয়েছে।  মোমেনা বেগমের সাক্ষাতকার গ্রহনের মাধ্যমে এ ঘটনার বিবরন তারা সংগ্রহ করে।    মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘরের কাছে রক্ষিত সে ডকুমেন্টে  লেখা আছে ঘটনার দুই দিন আগে মোমেনা বেগম তার শশুর বাড়ি চলে যান।

হযরত আলী হত্যাকান্ড বিষয়ে তার মেয়ে মোমেনা বেগমের সাক্ষাতকার যাদুঘর কর্তৃপক্ষ গ্রহণ করে ২৮/৯/২০৭  তারিখ। তিনি তখন তাদের কাছে ঘটনার যে বিবরন দেন তা নিম্নরূপ।  ‘ঘটনার বিবরণ : ১৯৭১ সালে মিরপুরের কালাপানি এলাকায় বিহারিদের সঙ্গে কিছু বাঙালি পরিবারও বাস করতো। ৭ মার্চ এর পর থেকে দেশের অবস্থা আশঙ্কাজনক দেখে কিছু কিছু বাঙালি পরিবার এলাকা ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যায়। অনেকের অন্যত্র যাওয়ার অবস্থা ছিল না ফলে এলাকায় রয়ে গেলেন। যে কয়েকটি পরিবার অন্যত্র যেতে পারলেন না তাদের মধ্যে একটি হযরত আলী লস্কর-এর পরিবার।
হযরত আলী লস্কর ছিলেন একজন দর্জি/খলিফা। মিরপুরেই তার দোকান ছিল। সকলে যখন এলাকা ছেড়ে চলে যাচ্ছিলেন তখন হযরত আলী লস্করকেও তারা চলে যেতে বলেছিলেন। কিন্তু তাঁর যাওয়ার জায়গা ছিল না। ২৫ মার্চ রাতে গণহত্যা শুরু হয়ে গেলে ২৬ মার্চ সকাল সাতটার দিকে বিহারির হযরত আলী লস্কর-এর বাড়ি ঘিরে ফেলে এবং তাকে ধরে নিয়ে যায়। কিছুক্ষণ পরই তারা তাঁর স্ত্রী, দুই কন্যা ও শিশু পুত্রকে ধরে নিয়ে যায় এবং সকলকে এক সঙ্গে নির্মমভাবে হত্যা করে পাশের বাড়ির কুয়োতে সব লাশ ফেলে যায়। বিহারিরা তার দ্বিতীয় কন্যা আমেনা বেগমকে ঘরের ভতর সারাদিন আটকে রেখে ধর্ষণ করে। পরে তাকেও হত্যা করে সেই কুয়োতে ফেলে। হযরত আলীর বড় মেয়ে মোমেনা বেগম মাত্র দুইদিন আগে শ্বশুরবাড়িতে চলে যাওয়ায় একমাত্র সেই প্রানে বেঁচে যায়। এখানে উল্লেখ্য যে, হযরত আলী স্ত্রী সে সময় অন্তঃসত্বা ছিল।
কয়েকদিন পরই এ খবর হযরত আলীর বড় মেয়ে মোমেনা বেগম জানতে পারেন। কিন্তু মিরপুরের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে তিনি বাড়ি আসতে পারলেন না। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর নিজ বাড়িতে এসে তিনি আর কিছুই অবশিষ্ট পেলেন না। ভগ্নহৃদয়ে ফিরে গেলেন শ্বশুরবাড়িতে।”

রায়ের পর্যালোচনায় বলা হয়েছে মোমেনা বেগম তার পিতামাতা এবং ভাইবোনকে হত্যার ঘটনাটি যে স্বচক্ষে দেখেছেন তা সন্দেহাতীতভাবে প্রমানিত হয়েছে। তার বয়স ছিল তখন ১৩ বছর এবং অলৌকিকভাবে সে বেঁচে যায়। তাকে অবিশ্বাস করার কোন কারণ নেই।

আসামী পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে মোমেনা বেগমের যে জবানবন্দী মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘরের কাছে রক্ষিত রয়েছে তা  তারা ট্রাইব্যুনালে জমা দিয়েছিলেন।  ট্রাইব্যুনাল তখন তা  নথিভুক্ত করে জানিয়েছিলেন বিষয়টি তারা রায়ের সময় বিবেচনা করবেন। তবে রায়ে এ ডকুমেন্ট বিষয়ে কিছু উল্লেখ করা হয়নি। রায়ে আসামী পক্ষের দাবি উল্লেখ করে বলা হয়েছে, আসামী পক্ষ দাবি করেছে মোমেনা বেগম  হযরত আলী লস্করের মেয়ে নন। তিনি যে হযরত আলী রস্করের মেয়ে সে মর্মে রাষ্ট্রপক্ষ তা তিনি কোন  ডকুমেন্ট হাজির করেনি। তাছাড়া জেরায় আসামী পক্ষ মোমেনা বেগমের যেসব দুর্বল বিষয়   বের  করে আনে তাও উল্লেখ করা হয়নি রায়ে।
আসামী পক্ষ কর্তৃক মোমেনা বগমের জেরার পর্যালোচা করে রায়ে  বলা হয়েছে, জেরায় এক প্রশ্নের জবাবে মোমেনা বেগম জানান, পাকিস্তান আর্মি এবং বিহারীদের সাথে যে বাঙ্গালী এসেছিল তিনি বাংলায় কথা বলছিলেন এবং তার বাবার কলার ধরে যিনি  নিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি হলে কাদের মোল্লা। তিনি   খাটের নিচে লুকিয়ে থেকে এ ঘটনা দেখেন। কাদের মোল্লা যে সেখানে উপস্থিত ছিলেন তা এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলে রায়ে মন্তব্য করা  হয়েছে।
রায়ে বলা হয়েছে মোমেনা বেগমের মা বাবা ভাই বোনকে কাদের মোল্লা নিজে হত্যা করেছে  চার্জে সে অভিযোগ করা হয়েছে বলে মনে হয়না। তবে রায়ে বলা হয়েছে কাদের মোল্লার উপস্থিতিতে, সহায়তায় এবং নৈতিক সমর্থনে এ হত্যার ঘটনা ঘটে। মানবতা বিরোধী এ ধরনের হত্যা ঘটনা  ব্যক্তি সরাসরি ঘটিয়েছে তা প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন  হয়না।

রায়ে আরো বলা হয়েছে এ ঘটনায় একজনমাত্র প্রত্যক্ষদর্শী   জীবিত সাক্ষী এবং ক্ষতিগ্রস্ত হলেন মোমেনা বেগম। তার এভিডেন্সেকে পাশ কাটানো যায়না বা সন্দেহ পোশন করা যায়না।   

আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে মোট ছয়টি অভিযোগে চার্জ গঠন করা  হয় এবং এর মধ্যে পাঁচটি অভিযোগে কারাদান্ড প্রদান করা হয় আব্দুল কাদের মোল্লাকে।  দুটি   হযরত আলী হত্যা ঘটনাটি ছিয় ছয় নম্বর অভিযোগ এবং এ অভিযোগসহ আরো একটি অভিযোগে যাবজ্জীবন প্রদান করা হয়। হযরত আলী লস্কর আওয়ামী লীগ করার কারনে এবং স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নেয়ার কারনে  আব্দুল কাদের মোল্লা বিহারী এবং আর্মিদের সাথে নিয়ে তাকেসহ পরিবারের লোকজনকে হত্যা করে মর্মে অভিযোগ করা হয় রাষ্ট্রপক্ষ থেকে।
আপিল বিভাগেও আসামী পক্ষ থেকে মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘরে রক্ষিত মোমেনা বেগমের জবানবন্দীর বরাতে তৈরি করা প্রতিবেদন জমা দেয়া হয়েছিল। শুনানীর সময় আদালত এ রিপোর্টের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। যাদুঘরের যে এ প্রতিবেদন তৈরি করেছে তাকে হাজির করা হয়েছিল কিনা জানতে চেয়েছেন। জবাবে আসামী পক্ষের প্রধান আইনজীবী ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক বলেছেন আমারা এ রিপোর্ট সংগ্রহ করেছি। এখন  এ রিপোর্ট সত্য কি-না তা প্রমানের দায়িত্ব কোর্টের। কোর্ট এ বিষয়ে উদ্যোগ নিতে পারেন। কোর্ট যাদুঘর কর্তৃপক্ষকে তলব করতে পারেন এবং তাদের কাছে জানতে চাইতে পারেন যে, তাদের কাছে এ ধরনের রিপোর্ট আছে কি-না। তাহলেই বের হয়ে যাবে আমাদের রিপোর্ট সত্য কি মিথ্যা।
কিন্তুআদালত মন্তব্য করেছেন মোমেনা বেগম কোর্টে এসে যে সাক্ষ্য দিয়েছেন সেটাই আসল বিবেচ্য। পরিবারের সবই নিহত  হয়েছে এবং বেঁচে যাওয়া একমাত্র মেয়ে ভুক্তভোগী সাক্ষীর কথা তারা অস্বীকার করে কি করে বলে মন্তব্য করেছেন কোর্ট।
শেষ পর্যন্ত এ ঘটনাতেই আব্দুল কাদের মোল্লাকে মৃত্যুদন্ড প্রদান করা হয়েছে।

অভিযোগ : ট্রাইব্যুনাল  এবং আপিল বিভাগের রায়
রাষ্ট্রপক্ষ আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে ছয়টি অভিযোগ এনেছি। ট্রাইব্যুনাল এর মধ্যে পাঁচটি অভিযোগে তাকে সাজা দেয়া হয়। এসব অভিযোগ বিষয়ে  ট্রাইব্যুনাল এবং আপিল বিভাগ  কর্তৃক সাজা বিষয়ে নিম্নে সংক্ষিপ্ত আকারে তুলে ধরা হল।

১ নং অভিযোগ পল্লব হত্যা :
১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসে  মিরপুর বাংলা কলেজের ছাত্র পল্লব হত্যা ঘটনা। অভিযোগে বলা হয় আব্দুল কাদের মোল্লার নির্দেশে তার সাঙ্গপাঙ্গরা  মিরপুর বাংলা কলেজের ছাত্র পল্লবকে নওয়াবপুর থেকে ধরে এনে নির্যাতন করে হত্যা করে।

ট্রাইব্যুনালের রায় :  ট্রাইব্যুনালের রায়ে এ হত্যা ঘটনার সাথে আব্দুল কাদের মোল্লার সংশ্লিষ্টতার   অভিযোগে তাকে  ১৫ বছরের জেল দেয়া হয়েছে।

ট্রাইব্যুনালের রায়ে পল্লব হত্যার ঘটনা বিশ্লেষন করে উল্লেখ করা হয়েছে এ হত্যা ঘটনার অভিযোগের ভিত্তি হল শোনা কথা।  ট্রাইব্যুনালের হাতে  যা এসেছে তাতে দেখা যায় আব্দুল কাদের মোল্লা  ব্যক্তিগতভাবে কোন অপরাধ সংঘটন করেছেন এমন অভিযোগে তিনি অভিযুক্ত নন।

আপিল বিভাগের রায় : আপিল বিভাগের রায়ে পল্লব হত্যা বিষয়ে ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক প্রদত্ত  ১৫ বছরের সাজা বহাল রাখা হয়েছে।

২ নং অভিযোগ কবি মেহের হত্যাকান্ড :
১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ আব্দুল কাদের মোল্লা তার সহযোগীদের নিয়ে মিরপুর ৬ নং সেকশনে নিজ ঘরে  থাকা অবস্থায় স্বাধীনতাপন্থী কবি মেহেরুননিসা, তার মা এবং দুই ভাইকে হত্যা করে মর্মে অভিযোগ আনা হয় রাষ্ট্রপক্ষ থেকে।

ট্রাইব্যুনালের রায় :  ট্রাইব্যুনালের রায়ে এ অভিযোেেগ আব্দুল কাদের মোল্লাকে  ১৫ বছর করে কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে ।

কবি মেহেরুন্নেসা হত্যাকান্ডের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে আব্দুল কাদের মোল্লাকে  দন্ডিত করে ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক প্রদত্ত রায়ে  বলা হয়েছে  অভিযুক্ত কাদের মোল্লা কবি মেহেরুন্নেসার ঘরে  নিজে প্রবেশ করেননি হত্যাকান্ডের সময় । হত্যাকান্ডে কাদের মোল্লা নিজে সশরীরে অংশগ্রহণও করেননি। তবে  যারা এ হত্যাকান্ড ঘটিয়েছে তাদেরকে তিনি নেতৃত্ব দিয়ে ঘটনাস্থলে নিয়ে গেছেন এবং  এ  কাজে তার নৈতিক সমর্থন ছিল। কাদের মোল্লা নিজে এ অপরাধে অংশ নিয়েছেন সে মর্মে প্রমান নেই।
রায়ে আরো বলা হয়েছে এ হত্যাকান্ডের অভিযোগের বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষ তিনজন শোনা সাক্ষীর ওপর নির্ভর করেছে। অর্থাৎ  অভিযোগের ভিত্তি হল সাক্ষীদের শোনা কথা। 

আপিল বিভাগের রায় : আপিল বিভাগের রায়ে ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক প্রদত্ত ১৫ বছরের সাজা বহাল রাখা হয়েছে।

৩ নং অভিযোগ সাংবাদিক আবু তালেব হত্যা :
১৯৭১ সালে ২৯ মার্চ সাংবাদিক আইনজীবী খন্দকার আবু তালেব তার মিরপুর ১০ নং সেকশনে অবস্থিত বাসা থেকে  আরামবাগ যাচ্ছিলেন। তিনি মিরপুর ১০ নং বাস স্ট্যান্ডে পৌছার পর আব্দুল কাদের মোল্লা অন্যান্য আল বদর সদস্যা, রাজাকার,  দৃষ্কৃতকারী এবং বিহারীদের সাথে নিয়ে তাকে ধরে মিরপুর জল্লাদখানা পাম্প হাউজে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর তাকে সেখানে হত্যা করা হয়।

ট্রাইব্যুনালের রায় : এ অভিযোগে ট্রাইব্যুনালের রায়ে আব্দুল কাদের মোল্লাকে ১৫ বছরের সাজা দিয়েছে। এ ঘটনায়ও আব্দুল কাদের মোল্লাকে কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে দুজন সাক্ষীর শোনা কথার ওপর ভিত্তি করে।

আপিল বিভাগের রায় : আপিল বিভাগের রায়ে ট্রাইব্যুনালের এ সাজা বহাল রাখা হয়েছে।

৪ নং অভিযোগ ঘাটারচরে শতাধিক মানুষ হত্যা:
 ১৯৭১ সালের ২৫ নভেম্বর আব্দুল কাদের মোল্লা ৬০-৭০ জন রাজাকার বাহিনী সদস্য নিয়ে কেরানীগঞ্জের ঘাটারচ এবং ভাওয়ালখান বাগ্রিণামক দুটি গ্রামে হামলা চালিয়ে দুজন মুক্তিযোদ্ধাসহ শতাধিক গ্রামবাসীকে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে হত্যা করে।  সকাল সাড়ে সাতটা থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত শতাধিক নিরস্ত্র গ্রামবাসীকে হত্যা করা হয়।

ট্রাইব্যুনালের রায় : এ অভিযোগ থেকে ট্রাইব্যুনালের রায়ে আব্দুল কাদের মোল্লাকে খালাস  দেয়া হয়েছে।
রাষ্ট্রপক্ষ এ ঘটনায়  তিনজন সাক্ষী হাজির করে। এদের একজন প্রত্যক্ষদর্শী দাবি করা হয়। বাকী দুজন শোনা সাক্ষী। প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী আব্দুল মজিদ পালওয়ান সাক্ষ্য দিয়ে বলেছেন ঘটনার দিন যখন গ্রামের উত্তর দিক থেকে গুলি আসতে শুরু করে তখন তিনি যেদিক থেকে গুলি আসে সেদিকে এগিয়ে যান ।
ট্রাইব্যুনালের রায়ে এ সাক্ষীর সাক্ষ্য পর্যালোচনায় বলা হয়েছে একবার সাক্ষী বলেছেন সকাল ১১টার দিকে ঘটনাস্থল থেকে অপরাধীরা চলে যাবার পর তিনি জানতে পারেন দুস্কৃতকারীদের সাথে পাজামা পাঞ্জাবী পরা লোকটা ছিল আব্দুল কাদের মোল্লা। আবার আরেক জায়গায় বলেছেন তিনি ঘটনা স্থলে গিয়ে আব্দুল কাদের মোল্লাকে রাইফেল হাতে দেখেছেন। একবার বলেছেন ঘটনা ঘটার পর জানতে পেরেছেন পাজামা পাঞ্জাবী পরা লোকটা ছিল কাদের মোল্লা আবার আরেকবার বলেছেন তিনি তাকে রাইফেল হাতে দেখেছেন। ট্রাইব্যুনাল প্রশ্ন করেছেন কোনটা সত্য? তাছাড়া এ ধরনের অভিযানের সময় যখন সাধারনত মানুষ জীবন বাঁচাতে পেছনের দিকে পালিয়ে যায় তখন সাক্ষী বলছেন তিনি গুলির দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। এটিও একটি     অস্বাভাবিক ঘটনা এবং আপিল বিভাগের শুনানীর সময়ও এ সাক্ষীর সাক্ষ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল।                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                     

আপিল বিভাগের রায় : ট্রাইব্যুনালের রায়ে এ অভিযোগ থেকে আব্দুল কাদের মোল্লাকে  খালাস দেয়া হলেও আপিল বিভাগের রায়ে এ অভিযোগে আব্দুল কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন সাজা দেয়া হয়েছে।

৫ নং অভিযোগ আলুবদি হত্যাকান্ড :
 এতে বলা হয়- ১৯৭১ সালের ২৪ এপ্রিল সকাল  সাড়ে চারটার সময় আব্দুল কাদের মোল্লার  সদস্যরা (মেম্বারস)  পাকিস্তান আর্মি সাথে নিয়ে মিরপুর পল্লবীর  আলুবদি গ্রামে নিরীহ বেসামরিক লোকজনের ওপর আক্রমন পরিচালনা করে । আক্রমনের অংশ হিসেবে তারা নির্বিচারে গুলি চালায় এবং এতে ৩৪৪ জন বেসামরিক ব্যক্তি নিহত হয়।
ট্রাইব্যুনালের রায় : ট্রাইব্যুনালের রায়ে  এ অভিযোগে কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করা হয়।
আপিল বিভাগের রায় : আপিল বিভাগের রায়ে এ সাজা বহাল রাখা হয়েছে।

৬ নং অভিযোগ হযরত আলী হত্যাকান্ড : ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ ঘটনা ঘটে। মিরপুর ১২ নম্বর সেকশনের  ৫ নং কালাপানি লেনে ২১ নম্বর বাসায় হযরত আলী,  তার ছেলে, মেয়ে, স্ত্রীকে হত্যা ও    মেয়েদের ধর্ষনের ঘটনা ঘটে আব্দুল কাদের মোল্লার নেতৃত্বে।

ট্রাইব্যুনালের রায় : এ অভিযোগে ট্রাইব্যুনাল কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করে। রায়ে বলা হয়েছে কাদের মোল্লার উপস্থিতিতে, সহায়তায় এবং নৈতিক সমর্থনে এ হত্যার ঘটনা ঘটে।

আপিল বিভাগের রায় :  আপিল বিভাগের রায়ে ট্রাইব্যুনালের যাবজ্জীবন সাজা বাড়িয়ে কাদের মোল্লাকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়।



মামলার সংক্ষিপ্ত বিবরন :
ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে রায় প্রদানের  এক মাসের মাথায় আসামী পক্ষ এবং     রাষ্ট্রপক্ষ থেকে  রায়ের বিরুদ্ধে আপিল আবেদন করা হয়।  গত ২৩ জুলাই দীর্ঘ শুনানী শেষে আপিল বিভাগ মামলার রায় অপেক্ষমান ঘোষনা করে।
এর আগে গত ৩১ মার্চ প্রধান বিচারপতি মো : মোজাম্মেল হোসেন এর নেতৃত্বে ছয় সদস্যের আপিল বেঞ্চ গঠন করা হয় আপিল আবেদন শুনানীর জন্য। ১ এাপ্রিল থেকে শুনানী শুরু হয়। তবে বিচারপতি সিদ্দিকুর রহমান আব্দুল কাদের মোল্লা মামলার  শুনানী শেষ হবার আগেই অবসরে চলে গেছেন। প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের আপিল বেঞ্চ কাদের মোল্লা মামলার আপিল শুনানী গ্রহণ করেন শেষ পর্যন্ত। প্রধান বিচারপতি ছাড়া অপর চার বিচারপতি হলেন বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা, বিচারপতি আব্দুল ওয়াহ্হাব মিঞা, বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন এবং বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দীন চৌধুরী।
২০১০ সালের ১৩ জুলাই সুপ্রিমকোর্টের প্রধান গেট থেকে কাদের মোল্লাকে পুলিশ গ্রেফতার করে। ট্রাইব্যুনালে তদন্তকারী সংস্থার এক আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ওই বছরের ২ আগষ্ট কাদের মোল্লাকে মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলায় আটক রাখার আদেশ দেয়া হয়।
২০১২ সালের গত ২৮ মে কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে ছয়টি অভিযোগের ঘটনায় চার্জ গঠন করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। ৩ জুলাই কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয়। রাষ্ট্রপক্ষে ১২ জন এবং আসামী পক্ষে ছয় জন সাক্ষী সাক্ষ্য প্রদান করে।
এর আগে ২০১২ সালের  ৭ মার্চ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের শুনানি শুরু হয়। এরপর ২০১২ সালের ২৫ মার্চ দ্বিতীয় ট্রাইব্যুনাল গঠনের পর এ মামলাটি সেখানে স্থানান্তর করা হয়।

বাংলাদেশ এর সর্বোচ্চ আদালত যথা সুপ্রীম কোর্ট এর আপিল বিভাগ  আব্দুল কাদের মোল্লাকে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে।  প্রধান বিচারপতি মো: মোজাম্মেল হোসেন এর নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের আপিল বেঞ্চ  আলোচিত এবং ঘটনাবহুল  এ মামলার রায় ঘোষনা করেন ১৭ সেপ্টেম্বর ।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ গত ৫ ফেব্রুয়ারি জামায়াতে ইসলামীর সহকারি সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছিল । আপিল বিভাগ ট্রাইব্যুনালের  যাবজ্জীবন সাজার মেয়াদ বাড়িয়ে মৃত্যুদণ্ড দিল। রাষ্ট্রপক্ষ ট্রাইব্যুনালে  আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালে মানবতাবিরোধী অপরাধের  মোট ছয়টি অভিযোগ এনেছিল। ট্রাইব্যুনাল একটি অভিযোগ থেকে আব্দুল কাদের মোল্লাকে খালাস দিয়েছিল। কিন্তু আপিল বিভাগ ছয়টি অভিযোগেই তাকে সাজা দিয়েছে।

পাঁচ সদস্যের আপিল বেঞ্চ সংখ্যাগরিষ্ঠের ভিত্তিতে (৪ : ১) আব্দুল কাদের মোল্লাকে মৃত্যুদন্ড দিয়েছে।
অর্থাৎ চার জন বিচারপতি মৃত্যুদন্ডের পক্ষে এবং একজন বিচারপতি মৃত্যুদন্ডের বিপক্ষে রয়েছেন। এছাড়া অপর যে পাঁচটি অভিযোগে আপিল বিভাগ কাদের মোল্লাকে সাজা দিয়েছে তার প্রত্যেকটিতেই একজন বিচারপতি ভিন্নমত পোষন করেছেন। অর্থাৎ ছয়টি অভিযোগেই সাজা দেয়া হয়েছে ৪  অনুপাত ১ এর ভিত্তিতে।
ট্রাইব্যুনাল আব্দুল কাদের মোল্লাকে দুইটি অভিযোগে যাবজ্জীবন, তিনটি অভিযোগে ১৫ বছর করে কারাদন্ড এবং একটি অভিযোগ থেকে খালাস দিয়েছিল। আপিল বিভাগের রায়ে একটি যাবজ্জীবনের সাজা বাড়িয়ে আব্দুল কাদের মোল্লাকে মৃত্যুদন্ড দিয়েছে। এ অভিযোগটি হল  মিরপুরে কালাপানি লেনে হযরত আলী,  তার ছেলে, মেয়ে, স্ত্রীকে হত্যা ও    মেয়েদের ধর্ষনের ঘটনা । এটি ছিল আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের আনীত ছয় নং অভিযোগ।

ট্রাইব্যুনালের রায়ে চার নং অভিযোগ (কেরানীগঞ্জের ঘাটারচর হত্যাকান্ড) থেকে আব্দুল কাদের মোল্লাকে  খালাস দেয়া হয়েছিল। আপিল বিভাগের রায়ে খালাস দেয়া এ অভিযোগটিতে কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন সাজা দেয়া হয়েছে।
এছাড়া অপর যে চারটি অভিযোগে ট্রাইব্যুনাল  সাজা দিয়েছিল তা বহাল রাখা হয়েছে আপিল বিভাগের রায়ে। ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক প্রদত্ত যে চারটি সাজা আপিল বিভাগের রায়ে বহাল রাখা হয়েছে সেগুলো হল অভিযোগ নং ১, ২, ৩ এবং ৫।
সরকার পক্ষ  আব্দুল কাদের মোল্লার সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড এবং  ট্রাইব্যুনাল যে অভিযোগ থেকে তাকে খালাস দিয়েছে সেই অভিযোগে সাজা প্রদানের জন্য  আপিল আবেদন করেছিল। আপিল বিভাগের রায়ের মাধ্যমে  সরকার পক্ষের আবেদন পুরোপুরি গৃহীত হল। অপর দিকে আসামী পক্ষ আব্দুল কাদের মোল্লার খালাস চেয়ে আবেদন করেছিল আপিল বিভাগে। রায়ে তাদের  আবেদন বাতিল বা নামঞ্জুর হল।
আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে আপিলের রায়ের মাধ্যমে এই প্রথম মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক সাজাপ্রাপ্ত কোন আসামীর বিরুদ্ধে চূড়ান্ত রায় দেয়া হল।

কাদের মোল্লার সংক্ষিপ্ত পরিচিতি :
আব্দুল কাদের মোল্লার জন্ম ১৯৪৮ সালে ফরিদপুর জেলার সদরপুর উপজেলায়।  তিনি প্রথম বিভাগে এসএসসি পাশ করার পর ১৯৬৬ সালে ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজ থেকে আইএসসি পাশ করেন। একই কলেজ থেকে ১৯৬৮ সালে বিএসসি পাশ করেন। ১৯৬৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগে এমএসসি কাসে ভর্তি হন । মেধাবী ছাত্র আব্দুল কাদের মোল্লা প্রাইমারী এবং জুনিয়র স্কুল পরীক্ষায় বৃত্তি লাভ করেন যথাক্রমে ১৯৫৯ এবং ১৯৬১ সালে।
১৯৭৪ সালে তিনি  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইইআর (ইন্সটিটিট অব এডুকেশন এন্ড রিসার্চ) এ ডিপ্লোমা ইন এডুকেশন (সোস্যাল সাইন্স) এ ভর্তি হই। ১৯৭৫ সালে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম স্থান অধিকার করেন এ কোর্সে। এরপর তিনি ১৯৭৭ সালে এডুকেশনাল এডমিনিস্ট্রেশন তেকে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম স্থান অধিকার করে  এম এ ডিগ্রি অর্জন করেন।
আব্দুল কাদের মোল্লা  স্কুল জীবনে কমিউনিস্ট পার্টির ছাত্র সংগঠন ছাত্র ইউনিয়নের সাথে সম্পৃক্ত হন এবং ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত এ সংগঠনের সাথে সম্পৃক্ত থাকেন। ১৯৬৬ সালে তিনি তৎকালীন ইসলামী ছাত্রসংঘের সাথে জড়িত হন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে তিনি ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ হলের আবাসিক ছাত্র ছিলেন।
বিডিআর সেন্ট্রাল পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। উদয়ন বিদ্যালয়ে ১৯৭৪-১৯৭৫ সালে শিক্ষকতা করেন। এছাড়া বাইশরশি শিব সুন্দরী একাডেমীতে শিক্ষকতা এবং  ইসলামী ফাউন্ডেশনেও  চাকুরী করেছেন তিনি।
আব্দুল কাদের মোল্লা ১৯৮২-৮৩ সালে পরপর  দুই বার ঢাকা ইউনিয়ন অব জার্নালিস্ট (ডিউজে)  সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।
রাজনৈতিক জীবনে আব্দুল কাদের মোল্লা  ১৯৮৩ সালে ঢাকা মহানগর জামায়াতের সাধারণ সম্পাদক  এবং   ১৯৮৭ একই শাখার আমির নির্বাচিত হন। ২০০০ সালে তিনি জামায়াতে ইসলামীর সহকারি সেক্রেটারি জেনারেল নির্বাচিত হন। জামায়াতের নেতৃত্ব পর্যায়ের ভূমিকা পালনের সময় তিনি বিভিন্ন পর্যায়ে জোটগদ রাজনীতির কারনে রাজনৈতিক সমস্যা সমাধানে মধ্যস্থতার ভূমিকাও পালন করেছেন। ১৯৬৪ সালে আইউব বিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক কারনে তাকে  চারবার কারাবরন করতে হয়েছে।
আব্দুল কাদের মোল্লার চার মেয়ে এবং দুই পুত্র সন্তানের পিতা।
আব্দুল কাদের মোল্লা মামলায় আসামী পক্ষে প্রধান আইনজীবী ছিলেন ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক। এছাড়া অ্যাডভোকেট ফরিদ উদ্দিন খান, তাজুল ইসলাম, শিশির মো: মনির, সাজ্জাদ আলী চৌধুরী প্রমুখ দায়িত্ব পালন করেন।
রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম, মোহাম্মদ আলী প্রমুখ।

রবিবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৩

যুদ্ধাপরাধ বিচারে ভারতের সমর্থন এবং ১৯৭৪ সালে ১৯৫ যুদ্ধাপরাধীকে ক্ষমায় ভারতের ভূমিকা


মেহেদী হাসান
বাংলাদেশের  চলমান যুদ্ধাপরাধ বিচারের প্রতি পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করেছে ভারত। দেশের সর্বোচ্চ আদালত যথা সুপ্রীম কোর্ট এর আপিল বিভাগ কর্তৃক আব্দুল কাদের মোল্লাকে মৃত্যুদন্ড প্রদানের একদিন পর ১৮ ফেব্রুয়ারি বুধবার ভারত তাদের সমর্থনের কথা প্রকাশ করেছে। বিবিসি বাংলা সার্ভিসের কাছে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মাটিতে যে ভয়াবহ অপরাধ সংঘটিত হয়েছিল  তার বিচার এবং ‘কোসার’ বা নিষ্পত্তি চাইবার অধিকার বাংলাদেশের মানুষের আছে।
বিবিসর খবরে উল্লেখ করা হয়েছে ‘এর আগে যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে ঢাকার শাহবাগে যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল, তার প্রতি প্রকাশ্যেই সংহতি জানিয়েছিলেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সলমন খুরশিদ কিংবা ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা শিবশঙ্কর মেনন।’

তবে আজ ভারত বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধ বিচারের পক্ষে প্রকাশ্য অবস্থান নিলেও আজ থেকে ৩৮ বছর আগে ১৯৭৪ সালে ত্রিদেশীয় দিল্লী চুক্তি সম্পাদনের মাধ্যমে ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীকে ক্ষমা করে দেয়ার পক্ষে ভারতই মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিল। সেদিন পাকিস্তানী  চিহ্নিত  যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষমা করে দেয়া এবং আজ এদেশীয় পাকিস্তানী সহযোগীদের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পক্ষে ভারতের অবস্থান গভীর তাৎপর্যপূর্ণ। 
স্বাধীনতা পরবর্তী তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার যুদ্ধাপরাধী হিসেবে বাছাইকৃত ১৯৫ জন পাকিস্তানী সেনাকর্মকর্তার বিচারের জন্য জনতার কাছে সর্বাত্মক প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, সমস্ত প্রস্তুতি গ্রহণ করেছিল এবং সংসদে স্বতন্ত্র একটি আইন তৈরি করেছিল ১৯৭৩ সালে। কিন্তু ১৯৭৪ সালে তাদের সবাইকে ক্ষমা করে দিয়ে ৯২ হাজার পাকিস্তানী সৈন্যদের ভারত থেকে পাঠিয়ে দেয়া হয় পাকিস্তানে। কিন্তু আজ ভারত এতকাল পরে বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পক্ষে প্রকাশ্যে মুখ খুলেছে এবং এর পক্ষে প্রকাশ্য অবস্থান ব্যক্ত করেছে।  কিন্তু কেন?

ভারত সেদিন কেন পাকিস্তানী ১৯৫ জন চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীকে ক্ষমার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল তা উপলব্ধির আগে জানা দরকার সেদিন যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার কি উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল এবং এ বিষয়ে তাদের অবস্থান কি ছিল।
এ বিষয়ে পরিষ্কার এবং স্পষ্ট ধারণা পেতে ১৯৭২ থেকে ১৯৭৪ সালে প্রকাশিত দৈনিক  ইত্তেফাক, দৈনিক বাংলা. দৈনিক গণকণ্ঠ এবং দৈনিক সংবাদ  এ প্রকাশিত কিছু খবরের শিরোনাম এবং প্রতিবেদন এখানে তুলে ধরা হল। এসব  খবরের আলোকে  ১৯৫ জন যুদ্ধপরাধীদের ক্ষমার প্রেক্ষাপট, দালাল আইন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান  এবং অন্যান্য আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ  সেদিন কি বলেছিলেন তা  বোঝা যাবে।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে  মানবতার বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের দায়ে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের উদ্যোগ নেয়  স্বাধীনতা পরবর্তী  বাংলাদেশ সরকার। যুদ্ধাপরাধীদের  বাছাই  করার জন্য একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।   কমিটি বিচার বিশ্লেষন করে যুদ্ধাপারধীদের একটি তালিকা তৈরি করে। প্রথমে ৪০০ এবং পরে তা থেকে ১৯৫  জন যুদ্ধাপরাধীর  একটি চূড়ান্ত তালিকা তৈরি করে। এরা সকলেই ছিল পাকিস্তানী উচ্চ পদস্থ সেনা কর্মকর্তা যারা বাংলাদেশে যুদ্ধ পরিচালনার দায়িত্বে ছিল।   বেসামরিক নাগরিক হত্যা, ধর্ষন, লুটাপাট এবং  অগ্নিসংযোগের মত  মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের জন্য ১৯৫ জন পাকিস্তানী সেনা কর্মকর্তাকে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে সাব্যস্ত করা হয়। তাদের বিচারের জন্য তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান এবং আওয়ামী লীগের অন্যান্য কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ বারবার বিভিন্ন জনসভায় এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে   দৃঢ  প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন । 

১৯৭৩ সালের ১৭ এপ্রিল এক প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে  সরকার যুদ্বাপরাধী হিসেবে ১৯৫ জন পাকিস্তানী সেনা কর্মকর্তার চূড়ান্ত তালিকা  তৈরি এবং তাদের বিচারের কথা ঘোষনা করে। ১৮  এপ্রিল দৈনিক  বাংলা পত্রিকায় এ বিষয়ে পরিবেশিত খবরে বলা হয়- “তদন্ত শেষে স্বাক্ষী প্রমানের ভিত্তিতে ১৯৫ জন ব্যক্তির বিচার অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত   হয়েছে।  তাদের   অপরাধের মধ্যে  রয়েছে গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ, জেনেভা কনভেনশনের ৩ নং ধারা লঙ্ঘন, নরহত্য, বলাৎকার ও বাড়িঘর পোড়ানো। ঢাকার বিশেষ ট্রাইব্যুনাল তাদের বিচার করবে। মে মাসের শেষের দিকে তাদের  ট্রাব্যুনালের সামনে হাজির করা হতে পারে।”
মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের জন্য এসব যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে সে সময়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ যে দাবি এবং প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছিলেন তার কয়েকটি উদাহরণ  সে সময়ের সংবাদপত্র থেকে এখানে  তুলে ধরা হল।

দৈনিক বাংলায় ১৯৭২ সালের  ৩ জুলাই একটি খবরের  হেডলাইন হল “যুদ্ধবন্দীদের বিচার হবেই-কুষ্টিয়া জনসভায় বঙ্গবন্ধু।” ঐ বছর ৩০ নভেম্বর একই  পত্রিকার আরেকটি  খবরের শিরোনাম হল “হত্যা ধর্ষণ লুন্ঠনকারী যুদ্ধাপরাধীদের রেহাই দেয়া হবেনা-পাবনার জনসভায় মনসুর আলী।”  খবরে লেখা হয় যোগাযোগমন্ত্রী ক্যাপ্টন মনসুর   আলী বলেন, পাকিস্তানী বর্বর সৈন্যরা এখানে মানবতা বিরোধী জঘন্যতম অপরাধেথ লিপ্ত হয়েছিল। মানবতার স্বার্থেই তাদের বিচার করা উচিত।

দৈনিক বাংলা, ৭ জুন ১৯৭২: “শীঘ্রই যুদ্ধাপরাধীদের প্রকাশ্যে বিচার করা হবে। কুয়লালামপুরে সাংবাদিকদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সামাদ আজাদ।”
১৯৭৩ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি দৈনিক বাংলা পত্রিকার  আরেকটি  খবরের শিরোনাম হল “বাংলার মাটিতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হবেই- টাঙ্গাইলে বঙ্গবন্ধু।” একই বছর ঐ পত্রিকার  আরেকটি খবরের শিরোনাম হল “১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীর বিচার হবেই-নয়া দিল্লীতে বঙ্গবন্ধু।” 

এভাবে ১৯৭২ এবং ১৯৭৩ সালের বিভিন্ন পত্রিকায় থেকে  যুদ্ধাপরাধীদের বিচার  বিষয়ে তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের অসংখ্য দৃঢ় প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করার উদাহরণ দেয়া যায়। সেমময়কার পত্রিকার পাতায়  পাতায় এর স্বাক্ষর রয়েছে। 

পাকিস্তানী ১৯৫ জন  সেনা কর্মকর্তার  বিচারের জন্য ১৯৭৩ সালের ১৮ জুলাই   ‘ইন্টারন্যাশনাল ওয়ার ক্রাইমস (ট্রাইবিউনালস ) এ্যাক্ট  আইন পাশ হয় সংসদে। কিন্তু এত আয়োজন, এত প্রশ্রুতি সত্ত্বেও

১৯৭৪ সালের ৯ এপ্রিল দিল্লীতে  ভারত-পাকিস্তান এবং বাংলাদেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত ত্রিদেশীয় চুক্তির মাধ্যমে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের সাথে জড়িত এসব যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষমা ঘোষনা করা হয়।
চুক্তির ১৩, ১৪ এবং ১৫ দফায় বলা হয়েছে “পাকিস্তান স্বীয় সামরিক বাহিনীর অপরাধের নিন্দা জ্ঞাপন ও উহার জন্য  গভীর অনুশোচনা ও দুংখ প্রকাশ  করেছে।  ইসলামাবাদ সরকারের এই মনোভাব এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোর ‘ক্ষমা করো এবং ভুলে যাও’ আবেদনের প্রেক্ষিতে  বাংলাদেশ সরকার ১৯৫ জন পাকিস্তানী যুদ্ধপারাধীর বিচার  না করে  ক্ষমা প্রদর্শনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।  অত:পর অন্যান্য যুদ্ধবন্দীদের সাথে তাদেরও ভারত হতে পাকিস্তানে ফেরত পাঠানো হবে।  উপমাহাদেশে শান্তি,  স্থিতি এবং অগ্রগতির লক্ষ্যে  এ চুক্তি করা   হয়েছে।”

১৯৭৪ সালের ১২ এপ্রিল  দৈনিক ইত্তেফাক  পত্রিকায় প্রকাশিত এ বিষয়ক একটি খবরের শিরোনাম ছিল “ক্ষমা প্রদর্শন করিয়া আমরা বিশ্বের  প্রশংসা অর্জন করিয়াছি-ড. কামাল হোসেন”। প্রতিবেদনটিতে লেখা হয়-“পররাষ্ট্র মন্ত্রী ড. কামাল হোসেন বলিয়াছেন,  বাংলাদেশের জনগণের উপর সামরিক বাহিনী যে অত্যাচার করিয়াছে পাকিস্তান সরকার সেজন্য দোষ স্বীকার করিয়া লইয়াছেন, ক্ষমার আবেদন জানাইয়াছেন। ঐ দেশের প্রধানমন্ত্রী সমগ্র বাঙ্গালী জাতির  কাছে ক্ষমা  চাহিয়াছেন। আমরা সুবিচার প্রতিষ্ঠা করিতে চাহিয়াছিলাম, প্রতিহিংসা চাইনা। ক্ষমা চাওয়া হইয়াছে ক্ষমা দেওয়া হইয়াছে।

পররাষ্ট্র  মন্ত্রী  বলিয়াছেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করিলে তিনটি বিষয় প্রতিষ্ঠা করা যায়। প্রথমত ইতিহাসে ইহার স্থান দেওয়া, দ্বিতীয়ত যে দেশের লোক এই অন্যায় করিয়াছে তাহা প্রমান করা এবং তৃতীয়ত আমাদের অবর্ণনীয় ক্ষয়ক্ষতির প্রমান দেওয়া। যেহেতু এ ব্যাপারে পাকিস্তান সরকার কোন চ্যালেঞ্জ করেনাই বরং সকল অন্যায় স্বীকার করিয়া নিয়াছে তখন আর বিচার করার সঙ্গত কোন কারণ নাই।  এতে কোন লাভ হইবে না। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বন্ধ করায় বাংলাদেশ বিশ্বের প্রশংসা অর্জন করিয়াছে। এর ফলে উপমহাদেশে স্বাভাবিকতা ফিরিয়া আসিবে। এটা সকলে চায়। দিল্লী চুক্তি সকলে গ্রহণ করিয়াছে।”

যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষমা করা বিষয়ক ১৬ দফার ত্রিপাক্ষিক চুক্তির তিনটি মূল কপি  দিল্লী, ইসলামাবাদ এবং ঢাকা থেকে  একযোগে  পূর্ণ বিবরণসহ প্রকাশিত হয়।

ত্রিদেশীয় দিল্লী চুক্তিতেও মূলত পাকিস্তানী ১৯৫ জন সেনা কর্মকর্তাকে যুদ্ধাপরাধী তথা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধী হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে।  চুক্তির ১৩ দফায় লেখা হয়েছে-“বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী (ড. কামালা হোসেন) বলেন যে,  পাকিন্তানী  যুদ্ধাপরাধীরা  বিভিন্ন ধরণের অপরাধ যেমন যুদ্ধাপরাধ, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ এবং গণহত্যার মত অপরাধ করেছে।”

১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীকে ক্ষমার পেক্ষাপট
১৯৭৪ সালের ৯ এপ্রিল বাংলাদেশ ভারত এবং পাকিস্তানেবর মধ্যে  ত্রিদেশীয় দিল্লী চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।   চুক্তি অনুযয়ী বাংলাদেশে  ১৯৭১ সালের যুদ্ধে  গণহত্যা,   মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ এবং  যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত ১৯৫ জন পাকিস্তানী সেনাকর্মকর্তাকে ক্ষমা করে বাংলাদেশ।  চুক্তিতে বলা হয়েছে, ১৯৭১ সালের বেদনায়ক  ঘটনার কারণে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে বাংলাদেশের কাছে  ‘ক্ষমা কর এবং ভুলে যাও’ আবেদনের প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ তাদের বিচার না করে   ক্ষমা করে দিয়েছে। যুদ্ধের কারণে  ভারতে আটক ৯২ হাজার পাকিস্তানী সৈন্যসহ ৩০ লাখের উপরে বেসামরিক নাগরিক তখন তিন দেশে  আটকা পড়ে ছিল ।  ১৯৭১ সালের যুদ্ধের পরপরই ১৯৭২ সালে ভারত- পাকিস্তানের মধ্যে সিমলা চুক্তি স্বাক্ষর হয় এবং চুক্তিতে   দুই দেশের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক এবং  সম্প্রীতি  স্থাপনে সব ধরণের প্রতিশ্রুতির কথা ব্যক্ত করা হয় উভয় দেশের পক্ষ থেকে।   কিন্তু তার কোনটিই বাস্তবায়ন সম্ভব হয়না  বাংলাদেশকেন্দ্রিক যুদ্ধউত্তর সমস্যার সমাধান না হওয়ায় । যুদ্ধউত্তর সমস্যার সমাধান এবং তা নিয়ে তিন দেশের মধ্যে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি নিরসনে ১৯৭২ সাল থেকে  দফায় দফায় আলোচনাসহ নানামুখী উদ্যোগ নেয়া হয় এবং সবশেষে তা পূর্ণতা পায়  ১৯৭৪ সালের  ত্রিদেশীয় চুক্তির মাধ্যমে। 

১৯৭২ থেকে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত ১৯৫ জন  পাকিস্তানী যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের উদ্যোগ; বিচার, যুদ্ধবন্দী বিনিময়, বাংলাদেশকে স্বীকৃতিদানসহ সেময়কার এবিষয়ক অন্যান্য ইস্যুগুলো নিয়ে বাংলাদেশ, ভারত এবং পাকিস্তানের তৎকালীন নেতৃবৃন্দের বক্তব্য বিবৃতি এবং অবস্থান বিশ্লেষন করলে ১৯৫ জন চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদের ছেড়ে দেয়া এবং ত্রিদেশীয় চুক্তির প্রেক্ষাপট স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে।

এসব বিষয় বিশ্লেষন থেকে এটি অনুমেয় যে, যুদ্ধাপরাধী হিসেবে বাছাইকৃত ১৯৫ জন সেনা কর্মকর্তাদের ছেড়ে দেয়ার বিষয়ে বাংলাদেশের  দিক থেকে বিবেচ্য বিষয় ছিল  পাকিস্তানসহ মুসলিম বিশ্বের ¯ীকৃতি আদায় এবং  পাকিস্তানে আটকে পড়া বাংলাদেশী সামরিক ও বেসামরিক নাগরিকদের ফিরিয়ে আনা।

বাংলাদেশ পাকিস্তান থেকে আলাদা হয়েছে, পাকিস্তান ভেঙ্গে গেছে; এটি ছিল তখন ভারতের কাছে পরম পাওয়া। বিশ্বেষন থেকে এটি অনুমেয় যে, পাকিস্তান ভাঙ্গতে পারার আনন্দে ভারত তখন বিভোর ছিল।  যুদ্ধাপরাধের বিচার  নিয়ে আর বেশি ঘাটাঘাটি  করে পরিস্থিতি ঘোলাটে করে বিজয়কে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার ঝুকি তারা নিতে চায়নি।   ভারতয় সেনাবাহিনী এবং সোভিয়েত ইউনিয়নও তখন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে পরিস্থিতি ঘোলাটে করার পক্ষে ছিলনা।  তাছাড়া পাকিস্তান বাংলাদেশকে দীর্ঘদিন ধরে স্বীকৃতি না দেয়ায় পরাজয়ের প্রতিশোধ হিসেবে পাকিস্তানের পক্ষ থেকে পুনরায় হামলার আশঙ্কাও  করেছিল ভারত। সর্বোপরি শত্রু রাষ্ট্রে পাকিস্তানের ৯৩ হাজার বন্দী সৈন্যের বিশাল বোঝা নিয়ে ভারত তখন এক   বিরূপ পরিস্থিতির  মুখোমুখি অবস্থানে এসে দাড়ায়।  সেসময়কার সংবাদপত্রের খবর বিশ্লেষন করলে এসব চিত্র  বেরিয়ে আসে।

পাকিস্তান বাংলাদেশকে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত  স্বীকৃতি দেয়নি। পরাজিত  এবং ুব্ধ পাকিস্তান বাংলাদেশকে নিজের দেশ দাবি করে আবার যুদ্ধ বাঁধিয়ে দিতে পারে এমন আশঙ্কা ছিল ভারত এবং বাংলাদেশ উভয়ের পক্ষ থেকে।

যেমন ১৯৭৩ সালের ২ এপ্রিল দৈনিক বাংলা পত্রিকার একটি  খবরের হেডলাইন “পিন্ডির যুদ্ধ উন্মাদনা এখনো শেষ হয়নি। আবার আঘাত হানতে পারে-  ভারতীয় সমর বিশেষজ্ঞদের অভিমত।”   প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে “ তাদের পক্ষ থেকে এখনো বিপদের আশঙ্কা রয়েছে । ভারতের দুর্বল  স্থানে আঘাত হানতে পারে। চন্ডীগড় থেকে ইউএনআই পরিবেশিত খবরে বলা হয়- ফিল্ড মার্শাল মানকেশ আজ এখানে বলেন, ১৯৭১ সালের যুদ্ধে ভারতের নিকট পরাজয়কে পাকিস্তান যে এখনো স্বীকার করতে পারেনি সে বিষয়ে তিনি একমত।”
১৯৭৩ সালের ১৭ এপ্রিল  ঢাকা দিল্লী যৌথ ঘোষনায় বলা হয়- উপমহাদেশের বাস্তবতাকে স্বীকৃতিদানে ব্যর্থতার দরুণ  উপমহাদেশে বন্ধুত্ব ও সম্প্রীতির কাজে কোন অগ্রগতি হয়নি। পাকিস্তান এখনো বাংলাদেশের প্রতি শত্রুতা অব্যাহ রেখেছে। ভারতের প্রতিও সে শত্রুতা বহাল রেখেছে। (সূত্র দৈনিক বাংলা ১৮ এপ্রিল)

এমনকি  পাকিস্তানের কাছ থেকে বাংলাদেশের স্বীকৃতি আদায় ছাড়াই ভারত পাকস্তানী যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষমা করার পক্ষপাতি ছিল। ১৯৭৩ সালের ২২ জানুয়ারি দৈনিক বাংলা পত্রিকায় এ মর্মে একটি খবর বের হয়। পাকিস্তানী সাংবাদিকদের সাথে সাক্ষাৎকারে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শরন সিং বলেছেন “যদি ভারত-পাকিস্তান বাংলাদেশ সমঝোতা সম্ভব হয় তবে বাংলাদেশকে পাকিস্তানের স্বীকতি ছাড়াই যুদ্ধবন্দীদের স্বদেশে প্রত্যাবর্তন সম্ভব।” অবশ্য নয়াদিল্লীতে অবস্থানরত বাসসের তখনকার প্রতিনিধি আতাউস সামাদের কাছে প্রদত্ত একটি সাক্ষাতকারে শরণ সিং এ কথা  অস্বীকার করেন। ২৪ জানুয়ারি দৈনিক বাংলায় এ খবর প্রচারিত হয়। কিন্তু পরবর্তীতে ইন্দিরা গান্ধীর অন্য এক বিবৃতিতে শরন সিং যে একথা বলেছিলেন তার সত্যতা ধরা পড়ে। ১৯৭৩ সালের ২৮ মে নয়াদিল্লীতে অস্ট্রেলীয় ব্রডকাস্টিং
করপোরেশনের সাথে সাক্ষাৎকারে ইন্দিরা গান্ধী বলেন, “বাংলাদেশ ইতোমধ্যে অনেকখানি ছাড় দিয়েছে। আগে স্বীকৃতি দিতে হবে সে শর্তও বাদ দিয়েছে” ।

যুদ্ধবন্দীদের নিয়ে ভারতও তখন যে বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখে পড়ে তাতে তাদের অবস্থান ছিল ছেড়ে দিতে পারলেই যেন বাঁচি অবস্থা। বিষয়টি সুরাহা করার জন্য মুসলিম বিশ্বসহ অনেক দেশ থেকে তাদের ওপর চাপ আসে।   ভারত বাংলাদেশ মিলে তাদের বিচারের উদ্যোগ নিলে  উপমহাদেশ দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত এবং অশান্তির দিকে পা বাড়াবে বলে মনে করে ভারত।

তখনকার খবরগুলো বিশ্লেষন করলে দেখা যায় যুদ্ধবন্দীদের বিচারের বিষয়ে বাংলাদেশের সামনে প্রধানত তিনটি সমস্যার উদ্ভব হয় তখন। প্রথমত পাকিস্তান থেকে স্বীকৃতি না পাওয়া, দ্বিতীয়ত পাকিস্তানে আটকে পড়া সামরিক ও বেসামরিক লোকদের ফেরত আনা এবং  তৃতীয়ত সৌদী আরবসহ  মুসলিম বিশ্ব থেকে স্বীকৃতি না পাওয়ার সমস্যা।

পাকিস্তান বাংলাদেশের  জাতিসংঘের  সদস্য হবার বিরুদ্ধে লবিং করছে বলে অভিযোগ করা হয় বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে। এছাড়া পাকিস্তানে আটক বাংলাদেশী সেনা সদস্যদের প্রতি নির্মম আচরণের পথ বেছে নেয় পাকিস্তান। ১৯৭৩ সালে ১০ এপ্রিল খবর বের হয়- পাকিস্তান সরকার সেখানে আটক ৫ জন বাঙ্গালী সেনা অফিসারকে গুলি করে হত্যা করেছে। বাংলাদেশ যুদ্ধবন্দীদের বিচার করলে পাকিস্তানও সেখানে আটক বাংলাদেশীদের বিচার করবে বলে হুমকি দেয় ভুট্টো। ১৯৭২ সালে ২ জুলাই  ভারতের সিমলায় তিনি বলেন“ বাংলাদেশে পাকিস্তানের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু হলে পরিস্থিতি এমন এক পর্যায়ে পৌছব যেখান থেকে আর ফিরে আসা সম্ভব হবেনা।

যুদ্ধবন্দীদের বিচারের জন্য ভারত যাতে পাকিস্তানী   সৈন্যদের বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর  না করে সেজন্য ভারতের কাছে  পাকিস্তান জোরালো লবিং করে আসছিল।

১৯৭৪ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি লাহোরে এক সংবাদ সম্মেলনে জুলফিকার আলী ভুট্টো বলেন, “ যুদ্ধাপরাধের দয়ে ১৯৫ জন যুদ্ধবন্দীর পরিকল্পিত বিচার বাতিল করা হইবে এই মর্মে  দৃঢ় আশ্বাসের বিনিময়ে তিনি বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দান করিবেন। এই প্রতিশ্রুতি কেবল বাংলাদেশকই দিতে হইবে এমন কোন কথা নয়। যেকোন দেশ এই প্রতিশ্রুতি দিতে পারে।” সূত্র ইত্তেফাক, ১৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৪)।

যুদ্ধাপরাযুদ্ধাপরাধীদের ক্ষমা করার বিষয়টি যে ভারতের নিয়ন্ত্রনে ছিল সে বিষয়ে সাবেক সচিব আসাফ্  উদ্দৌলাহ  একটি  প্রবন্ধে লিখেছেন, “১৯৭৪ সালে মে মাসে দিল্লীর রাষ্ট্রপতি ভবনে  যখন মুজিব-ইন্দিরা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় তখন সেই ঐতিহাসিক সভায় যোগদানের সুযোগ আমার হয়েছিল।...... সে  সময় হঠাৎ করে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সর্দার সরওয়ান সিং বঙ্গবন্ধুকে বললেন, লাহোরে তার ওআইসির সম্মেলনে যোগদান নিয়ে ভারতের জনমনে কিছু বিভ্রান্তি সৃষ্টি  হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশ সরকারের সাথে ভারত সরকার এরকম একটি সমঝোতায় পৌছায় যে, উভয় সরকার তাদের বৈদেশিক নীতি অনুসরনে একে অন্যের সাথে আলোচনা ও সমন্বয় সাধন করবে। সরওয়ান সিং জানান, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর লাহোরে ওআইসি সম্মেলনে যোগদান করার বিষয়ে সেই সমন্বয় সাধন হয়নি। বঙ্গবন্ধু এর জবাবে ইন্দিরা গান্ধীকে বললেন, “আমিও তাহলে আপনাকে একটি কথা জিজ্ঞেস করব। বাংলার জনমানুষকে  আমি জোরগলায় জসসভায় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম  পাকিস্তানী যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা হবে বাংলার মাটিতেই। অথচ আপনি ও ভুট্টো সিমলায় স্থির করলেন যে, চিহ্নিত ১৯৫ জন সহ সব পাকিস্তানী সৈনিককে বিনা বিচারে পাকস্তানে চলে যেতে দেয়া হবে। আর এ সিদ্ধান্ত নেয়া হল আমাকে না জানিয়ে।” (সূত্র- বিবেচনা ও বিদ্বেষ, দৈনিক নয়া দিগন্ত, ৮ এপ্রিল ২০১০।

১৯৭৪ সালে পাকিস্তানী  যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষমার পক্ষে এবং আজ দেশীয় সহযোগীদের যুদ্ধাপরাধী হিসেবে বিচারের পক্ষে ভারতের প্রকাশ্য অবস্থান গভীর তাৎপর্যপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছিলাম লেখার শুরুতে। ইতিহাস বিষয়ে পাঠ আছে এমন সকলেই জানেন, ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবের আলোকে ১৯৪৭ সালে পূর্ববঙ্গ, পশ্চিম বঙ্গ এবং আসামসহ অন্যান্য বাংলাভাষী অঞ্চল  নিয়ে বৃহৎ অখন্ড স্বাধীন বাংলা প্রতিষ্ঠার পক্ষে মত দিয়েছিলেন মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। অপর দিকে এর বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিনে কংগ্রেসের নেতৃবৃন্দ। স্বাধীন ভারতের পাশে এতবড় একটি স্বাধীন দেশকে মেনে নিতে তারা অপরাগ ছিল। তাছাড়া  অতীতের বিভিন্ন নির্বাচনে দেখা গেছে অখন্ড স্বাধীন বঙ্গে হিন্দু মুসলমানদের ভোটের যে অনুপাত তাতে সবসময় মুসলমানদের মধ্য থেকে নেতৃত্ব নির্বাচিত হয়েছেন। কাজেই এ  অখন্ড স্বাধীন বাংলা যে আরেকটি পাকিস্তান হবে কংগ্রেস নেতৃবৃন্দ সেটা তখনই খুব ভাল করে বুঝতে পেরেছিল। তাই তারা এর বিপক্ষে  অবস্থান নেয়। পূর্ববাংলা তথা বাংলাদেশকে পশ্চিম পাকিস্তানের সাথে  একত্র করে এক  পাকিস্তান এর পক্ষে ভারত অবস্থান নিয়েছিল ভিন্ন একটি আশাবাদ থেকে। তাহল ভারত তখনই বুঝতে পেরেছিল মাঝখানে হাজার মাইলের ব্যবধানে অবস্থিত দুটি ভূখন্ড খুব বেশিদিন একত্র থাকতে পারবেনা এবং অচিরেই পূর্ব বাংলা ভারতের সাথে একাকার হয়ে যাবে। যাহোক ভারতের তৎকালীন সে আশাবাদ আজো বাস্তবায়িত হয়নি।
১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ভারত কর্তৃক বাংলাদেশের পক্ষে প্রকাশ্য অবস্থান, কার্যকরি অবদান এবং শেষ পর্যন্ত যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া বিষয়ে  একটি প্রতিষ্ঠিত অভিযোগ হল স্বাধীনতা যুদ্ধে বাংলাদেশের পাশে দাড়ানো এবং সহযোগিতার বিষয়টি  যতটা না গরুত্বপূর্ণ তার চেয়ে বেশি জরুরি ছিল পাকিস্তান ভাঙ্গার আকাঙ্খা এবং পরিকল্পনা বাস্তবায়ন।  সে কারনে পাকিস্তান ভাঙ্গতে পারা ছিল তখন তাদের জন্য  গৌরবময় অধ্যায়। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় কোটি কোটি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ, পিতা মাতা ভাই বোন সন্তান আপনজন হারানো  লক্ষ লক্ষ মানুষের দু:খ বেদনা, ইজ্জত হারানো অগনিত মা বোন আত্মীয় স্বজনদের বুকফাঁটা ক্রন্দন এবং তাদের বিচার পাবার আকঙ্খা তখন ভারতের কাছে কোন বিষয় ছিলনা। কিন্তু আজ বাংলাদেশের মানুষের বিচার পাবার আকঙ্খার তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দেখা দিয়েছে, তাদের বিচার পাবার আকাঙ্খার  প্রতি তারা অবস্থান নিয়েছে এবং চলমান বিচারকে তারা বাংলাদেশের সেইসব ক্ষত বিক্ষত বেদনাহত কোটি কোটি  মানুষের বিচার পাবার আকঙ্খার বাস্তবায়ন বলে মনে করছে।  বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ভারতের বিরুদ্ধে আরেকটি প্রতিষ্ঠিত অভিযোগ হচ্ছে গত ৪২ বছরে দুই দেশের মধ্যে যে বিরাজমান সম্পর্ক তাতে এটি স্পষ্ট যে, মাথা উচু করে স্বগৌরবে দাড়ানো একটি শক্তিশালী বাংলাদেশ তাদের কাছে কাম্য নয়। তাদের কাছে কাম্য সদা অস্থির, দুর্বল, অস্থিতিশীল, নতজানু একটি দেশ এবং এর মাধ্যমে ফায়দা হাসিল করা। এই অভিযোগের মধ্যেই হয়ত নিহিত রয়েছে আজকের চলমান যুদ্ধাপরাধ বিচারের প্রতি তাদের প্রকাশ্য অবস্থান। তাছাড়া বর্তমান চলমান রাজনৈতিক সঙ্কট এর দিক বিবেচনায়ও এর আরো অনেক তাৎপর্য রয়েছে । বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধ বিচার যে বিচ্ছিন্ন  কোন বিষয় নয় এবং এর সাথে যে আরো অনেক যোগসূত্র রয়েছে তাও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ভারতের এ প্রকাশ্য অবস্থান ব্যক্ত করার মধ্য দিয়ে। ২০/৯/২০১৩

সোমবার, ২৯ এপ্রিল, ২০১৩

বিচার আবেগ রাজনীতি এবং দায়মুক্তি


মেহেদী হাসান, ১০/২/২০১৩
শাহবাগে জমায়েতের  শুরু  হয়  আব্দুল কাদের মোল্লার ফাঁসির দাবিতে। এ দাবি শেষ পর্যন্ত  গিয়ে ঠেকেছে জামায়াতে ইসলামকে নিষিদ্ধ করা,  বাংলাদেশ থেকে এদেরকে চিরতরে  সমূলে উৎখাত  এবং  বিনাশের  মধ্যে। জামায়াত শিবির সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠান, বয়কট এবং নিষিদ্ধ করতে হবে।  জামায়াত শিবির যারা সমর্থন করে তাদের  বাংলাদেশী নাগরিকত্বও বাতিল করতে হবে।   দাবি যতই ডালপালা মেলছে ততই এ জমায়েতের অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য এবং  চরিত্র প্রকাশ পেয়েছে।  জমায়েতের বক্তব্য, ভাষা, স্লোগান এবং দাবি দাওয়া সবকিছুই স্পষ্ট করে বলে দিচ্ছে বিচার করা বা বিচার চাওয়া   কোন বিষয় নয়; গোষ্ঠী বা শ্রেণী বিশেষকে দমন, উচ্ছেদ, নির্মুল, খতম  এবং ধ্বংস করা তাদের মূল লক্ষ্য।  মুখে যতই বলুক তারা সাধারন পাবলিক,  অরাজনৈতিক কিন্তু তাদের ভাষা, দাবি এবং স্লোগান, পোস্টারের মুলমন্ত্র যা প্রকাশ করছে তা হল এর চেয়ে প্রান্তিক রাজনৈতিক কাজ  আর কিছু হতে পারেনা।   একটি গণমাধ্যমে একে তুলনা  করা হয়েছে ফ্যাসিবাদের উত্থানের  সাথে।

জমায়েতের দাবি, স্লোগান, ব্যানার, ফেস্টুন,  পোস্টার,  কার্টুন থেকে এটা পরিষ্কার যে,  তারা বিচার চাননা। ফাঁসি চান। বিচার হতে পারে তবে তার একমাত্র রায় হতে হবে ফাঁসি। কার ফাঁসি? প্রথমে শুধু আব্দুল কাদের মোল্লার ফাঁসি চেয়েছেন তারা। তারপর জামায়াতের সব নেতার ফাঁসি  চাওয়া হল।   এখানেই শেষ নয়। জামায়াত শিবিরের সবাইকে রাজাকার আখ্যায়িত করে তাদের সবার ফাঁসি দাবি করেছে তারা। যারা ফাঁসির আওতায় পড়বেনা তাদের সবার  নাগরিকত্ব বাতিল করতে হবে। ফাঁসি দিয়ে তাদের লাশও এদেশে  কবর  দেয়া যাবেনা।  পাকিস্তান পাঠিয়ে দিতে হবে।
জামায়াত শিবির সমর্থিত সকল প্রতিষ্ঠান বয়কট, বন্ধ এবং বাজেয়াপ্ত করতে হবে। লাঠি নিয়ে হামলা করতে হবে।  নয়া দিগন্ত, দিগিন্ত টিভি,  আমার দেশ, সংগ্রাম, ইসলামী ব্যাংক, ইবনে সিনা, রেটিনা, ফোকাসসহ যাবতীয় প্রতিষ্ঠান বয়কট এবং বন্ধ করার ডাক দেয়া হয়েছে জমায়াত থেকে।  

এভাবে ক্রমে এক ব্যক্তির ফাঁসির দাবি থেকে ক্রমে দাবির ডালপালা মেলেছে এবং জমায়েতের চরিত্র ফুটে উঠেছে। এবার দেখা যাক ফাঁসির দাবির ধরনটা কেমন ছিল। সমাবেশের আয়োজক,  সমর্থক  এবং সংহতি প্রকাশকারী ব্যক্তিবর্গ এবং আগতদের বক্তব্য সংক্ষেপ করলে দাড়ায়   ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক আব্দুল কাদের মোল্লাকে প্রদত্ত যাবজ্জীবন  কারাদন্ডের রায় তারা কেউ মানেননা। ফাঁসি ছাড়া আর কোন  বিকল্প রায় হতে পারেনা।  ফাঁসি ছাড়া আর কিছু  মেনে নেয়া হবেনা, আর কোন  বিকল্প শাস্তি গ্রহণযোগ্য নয়।  ফাঁসিই একমাত্র   উপযুক্ত শাস্তি, ফাঁসি ছাড়া ঘরে  ফেরা হবেনা।   কেউ কেউ দাবি করেছেন বিচার ছাড়াই ফাঁসি দিতে হবে।  স্পটে গুলি করে মারতে হবে জামায়াতের নেতাদের।  তাদেরকে শাহবাগ জমায়েতের  হাতে তুলে  দিতে হবে; তারাই তাদের বিচারের নামে ফাঁসির আয়োজন করবে। অন্য আসামীদের রায় কি হবে তা নিয়েও তারা আতঙ্কিত, উদ্বিগ্ন। তাদেরও কাউকে যাবজ্জীন দিলে চলবেনা; ফাঁসি দিতে হবে। ফাঁসি না দিলে হরতাল এমনকি গৃহযুদ্ধেরও হুমকি দেয়া হয়েছে ।  

জমায়েতের স্লোগানগুলোর মধ্যেও নিহিত ছিল একটি গোষ্ঠী এবং শ্রেণীকে নির্মূলের আহবান। যেমন আড়াই হাত লাঠি ধর, জামায়াত শিবির ধোলাই কর, দড়ি ধরে দেব টান ফাঁসি দিয়ে নেব জান, একটা করে শিবির ধর, সকাল বিকাল জবাই কর। 
তাদের এ  দাবি, বক্তব্য এবং স্লোগান    ব্যাখ্যা করলে সোজা  এবং পরিষ্কার যে অর্থ দাড়ায় তা হল  বিচার টিচার আসলে কিছু না। বিচারের নামে ফাঁসি দিয়ে একটি দল, শ্রেনী এবং গোষ্ঠীকে নির্মূল করাই হল তাদের  আসল চাওয়া।  বিচার হতে হবে তাদের  ধ্বংস করার জন্য।  তাদের বাঁচিয়ে রাখার জন্য নয়; বিচারের মাধ্যমে তাদের নির্দোষ ঘোষনা করার জন্য নয়।   যে বিচারে জামায়াত শিবির উৎখাত হবেনা, তাদের  ধ্বংস এবং  নির্মূল হবেনা, জামায়াত শিবির ধনে প্রানে মরবেনা  সে বিচার কোন বিচারই নয়।  সে বিচার মানা যাবেনা।

যুদ্ধাপরাধের নামে ট্রাইব্যুনালে যাদের বিচার করা হচ্ছে, তাদের দল, তাদের পক্ষে নিযুক্ত আইনজীবীদের পক্ষ থেকে বার বার দাবি করা হয়েছে    ট্রাইব্যুনালে  বিচারের নামে  সাজানো নাটক চলছে। বিচারের নামে এমন সাজানো নাটক পৃথিবীর ইতিহাসে আর কখনো মঞ্চস্ত  হয়নি। সরকারের নির্দেশে  এ বিচার  নাটক মঞ্চস্ত হচ্ছে। বিচারের নামে সরকার তাদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামকে ধ্বংস করতে চায়; তাদের শায়েস্তা করতে চায়। রাজনৈতিক উদ্দেশে আয়োজন করা হয়েছে এ বিচার; ন্যায়বিচার  প্রতিষ্ঠার জন্য নয়। তাই এখানে ন্যায় বিচার পাবার কোন আশা নেই। তারা বারবার ট্রাইব্যুনালকে অবৈধ আখ্যায়িত করে একে ভেঙ্গে দেয়ারও দাবি জানিয়েছে। অনেকে এ বিচারকে আখ্যায়িত করেছেন দুটি প্রতিপক্ষ দলের মধ্যে রাজনৈতিক লড়াইয়ের অংশ হিসেবে।
আসামী পক্ষের এ দাবির সাথে শাহবাগ  জমায়েতের  দাবি এবং দাবির চরিত্রের  আশ্চর্য মিল রয়েছে। শাহবাগ জমায়েত থেকে  দাবি করা হচ্ছে বিচার নয় ফাঁসি দিতে হবে। যে বিচারই করা হোক না কেন   তার মাধ্যমে জামায়াত শিবিরকে খতম করতে হবে। আর আসামী পক্ষ থেকেও অভিযোগ করা হয়েছে বিচারের নামে জামায়াতকে ধ্বংসের সাজানো নাটক মঞ্চস্ত করা হচ্ছে। এ দাবি শুধু যে আসামী পক্ষ  এতদিন  ধরে করে আসছে তা নয় বরং বিশ্বের বিভিন্ন  নামকরা বড় বড় সংস্থা, সংবাদপত্র এবং সংবাদ মাধ্যম থেকেও এ  অভিযোগ করা হয়েছে।  বর্তমান সরকার তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ধ্বংস এবং শায়েস্তা করতে  ট্রাইব্যুনালকে ব্যবহার করছে বলে সরাসরি অভিযোগ  করেছে  ইকোনমিস্টের মত সাময়িকী।
আসামী পক্ষ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এতদিন ধরে বিচারের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ করে আসছিল তার প্রমান মিলল শাহবাগ জমায়েতের  দাবি, ভাষা এবং স্লোগানের মাধ্যমে।  ট্রাইব্যুনালের বিরুদ্ধে আসামী পক্ষের অভিযোগ এবং আশঙ্কা স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠেছে শাহবাগের সমাবেশের দাবির চরিত্র থেকে।   আর তাহল বিচার নয়, বিচারের নামে প্রতিপক্ষকে  ধ্বংসই তাদের আসল  লক্ষ্য।

দুই পক্ষের দাবির মিল এখানেই শেষ হয়নি।  স্কাইপ কেলেঙ্কারি, সেফ হাউজ কেলেঙ্কারিসহ নানা অভিযোগে অনেক দিন ধরে আসামী পক্ষ থেকে পুনরায় বিচার এমনকি ট্রাইব্যুনাল ভেঙ্গে দেয়ারও  দাবি করে আসছিল। তারা নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন বিচার দাবি করেছে বার বার। এবার শাহবাগ জমায়েত থেকেও দাবি করা হয়েছে আবার বিচার করতে হবে। কাদের মোল্লার এ রায় তারা মানোন।  ট্রাইব্যুনাল আইন রাজাকারদের পক্ষের আইন। এ আইন সংশোধন করতে হবে। তাদের দাবির মুখে শেষ পর্যন্ত আইনপ্রতিমন্ত্রী অ্যডভোকেট কামরুল ইসলাম আইন সংশোধনের ঘোষনাও দিয়েছেন। আসামী পক্ষসহ বিশ্বের অনেক সংগঠনের পক্ষ থেকেও অনেক দিন ধরে  ট্রাইব্যুনাল আইন সংশোধনের দাবি করে আসছিল।

শাহবাগ জমায়েতের দাবি, স্লোগান, এবং পোস্টারের ভাষা কতখানি শোভন অশোভন, আদালত অবমাননার পর্যায়ে পড়ে কি-না সে  অভিযোগও উঠেছে। ট্রাইব্যুনালের বিচার নিয়ে কথা বলার কারনে এ পর্যন্ত কতজনকে যে সতর্ক করা হয়েছে এবং ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে তা খাতা কলম নিয়ে হিসাব না করে বলা মুশকিল।    সে প্রেক্ষিতে শাহবাগের এ দাবি বিষয়ে অনেকে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন এসব দাবি কি আদালত অবমাননার মধ্যে পড়েনা? ফাঁসি না হলে তারা রায় মানবেননা, ফাঁসিই দিতে হবে এটা কেমন দাবি? ফাঁসি ছাড়া যদি আর কোন কিছু গ্রহণযোগ্য না  হয় তাহলে বিচারের  দরকার কি? ফাঁসি দিয়ে দিলেই তো হয়। এত আয়োজনের কি প্রয়োজন ছিল? এসব প্রশ্ন করেছেন অনেকে। শাহবাগ জমায়েতে এসব দাবি যারা করছেন তারা এ বিচারের পক্ষের লোক। তাদের অনেকের পরিচয় সরাসরি সরকারি দলের সমর্থক, কেউ কোন না কোন বাম দলের সমর্থক;  যেসব বাম দলের বেশ কয়েকটি আবার সরকারের  সাথে জোটে রয়েছে।  তাদের এ দাবি অনেক আগে থেকেই হয়ত বুঝতে পেরেছিলেন যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে বন্দী  সালাহউদ্দিন  কাদের চৌধুরীর স্ত্রী ফারহাত কাদের চৌধুরী। তিনি বলেছিলেন  বিচারের দরকার নেই। পল্টনে নিয়ে ফাঁসি দিয়ে দিন। তাতে সরকারের সময় এবং টাকা দুই-ই বাঁচবে।

হারিয়ে গেল পাকিস্তান এবং ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধী সেনা কর্মকর্তা :
স্বাধীনতার মাস মার্চ এবং বিজয়ের মাস  ডিসেম্বর আসলে বাংলাদেশের সব টিভি চ্যানেলে   মুক্তিযুদ্ধের ওপর ধারাবাহিক  বিশেষ অনুষ্ঠান/সংবাদ প্রচার করা হয়। সংবাদপত্রেও একইভাবে  মুক্তিযুদ্ধের ওপর খবর প্রকাশ করা হয় মাসজুড়ে। এসব খবরে মুক্তিযুদ্ধের প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখানো হয় বাংলাদেশ  জামায়াতে ইসলামীকে। জামায়াত নেতাদের বিকৃত ছবি দানব আকারে তুলে ধরা হয়। গত তিন বছর  যুদ্ধপরাধের বিচার চলাকালে প্রতিদিন  এর ওপর যেসব খবর প্রকাশিত এবং প্রচারিত হয়েছে তাতেও  প্রাধান্য পেয়েছে এ বিষয়টি। এসব দেখে  দেখে সৈয়দ সাইফুল আলম শোভন নামে একজন  সাধারন দর্শক একটি প্রশ্ন করেছেন। প্রশ্নটি হল ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধটা আসলে হয়েছিল কাদের মধ্যে? মুক্তিযোদ্ধা এবং জামায়াতের মধ্যে না মুক্তিযোদ্ধা এবং পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মধ্যে? আর যুদ্ধটাইবা হয়েছিল কাদের বিরুদ্ধে? জামায়াতের বিরুদ্ধে না পাকিস্তানের বিরুদ্ধে?  ইতিহাসে আমরা তো পড়েছি মুক্তিযুদ্ধ  হয়েছিল পাকিস্তানের বিরুদ্ধে এবং পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধেই লড়াই করেছিলেন আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা। কিন্তু কই,  মার্চ মাস, ডিসেম্বর মাসে টিভিতে  মুক্তিযুদ্ধের ওপর যে খবর বলা হয় তাতেতো পাকিস্তানের কথা সেভাবে বলা হয়না যেভাবে বলা হয় জামায়াত এবং রাজাকারদের কথা? আমরাতো ইতিহাসে পড়েছি  আসল যুদ্ধাপরাধী ছিল পাকিস্তান সেনাবাহিনী। ১৯৫ জন পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে চিহ্নিতও করা হয়েছিল। কই, তাদের অপরাধের কথাতো  সেভাবে বলা হয়না যেভাবে বলা হয় জামায়াতের বর্তমান নেতাদের বিরুদ্ধে এবং রাজাকারদের বিরুদ্ধে? বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধারা এতবড় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করল এবং যে পাকিস্তান সেনাবাহিনী এতবড় ধ্বংসযজ্ঞ পরিচালনা করল তা সব  নাই হয়ে  গেল?  যেভাবে এখন প্রচারনাটা চালানো হচ্ছে, যেভাবে ইতিহাসকে তুলে ধরা হচ্ছে তাতে মনে হচ্ছে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধটা হয়েছিল জামায়াতে ইসলাম এবং রাজাকারদের বিরুদ্ধে পাকিস্তান এবং পাকিস্তান সেনাবাহিনরি বিরুদ্ধে নয়। একজন সাধারন পাঠক এবং দর্শকের এই উপলব্ধির কি ব্যাখ্যা দেয়া যাবে? এর জবাব কি?
সৈয়দ সাইফুল আলম শোভনের মতে ১৯৭১ সালে পাকিস্তান নিজের দেশ এবং নিজের মানুষদের রক্ষা না করে তাদের ওপর খতমনীতি পরিচালনা করেছিল। নিজের ঘরের মানুষদের  তারা নিজেরা হত্যা করেছে, ধর্ষণ করেছে। নিজের ঘরে নিজেরা আগুন দিয়েছে। সেই পাপের শাস্তি পাকিস্তান আজো ভোগ করে চলছে। আজ যদি আমাদেরকে সেই  ইতিহাস পাশ কাটিয়ে ভুল ইতিহাস শেখানো হয় তাহলে তার শাস্তিও একদিন আমাদের পেতে হতে পারে। সৈয়দ সাইফুল আলম শোভন  বলেন, আমি বলছিনা পাকিস্তানের এদেশীয় সহযোগীরা কোন অপরাধ করছেনা। কিন্তু কার অপরাধের মাত্রা কতটুকু সে বিবেচনাবোধ যেন আমরা হারিয়ে ফেলছি।

আজকের তরুন প্রজন্মের মাথার ভেতর কৌশলে ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে বাংলাদেশ নামক এই দেশ, বাঙ্গালী  নামক এই জাতির চির দুশমন, চির শক্রু হল জামায়াতের এই এই লোকগুলো। এদের মত খারাপ মানুষ পৃথিবীতে আর দ্বিতীয়টি নেই। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে যত  অপরাধ সংঘটিত হয়েছে তার জন্য শুধুমাত্র তারাই দায়ী। এই যদি হয় তাদের চিন্তা ধারণা তাহলে যে তরুন প্রজন্ম তাদের বিনাশের দাবিতে রাজপথে অবস্থান নিয়েছে তাদের দোষ দেয়া যায়না।


কিন্তু আসল বাস্তবতা কি? চলুন একটু পেছন ফিরে দেখা যাক আসল যুদ্ধাপরাধী ছিল কারা এবং কারা  কিভাবে তাদের ক্ষমা করেছিল । আর এখন ৪১ বছর পর কিভাবে  মূল যুদ্ধাপরাধীদের বাদ দিয়ে দেশীয় কয়েকজন সহযোগীকে বিচারের কাঠগড়ায় দাড় করিয়ে  ইতিহাসের দায় এবং কলঙ্কমুক্তির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

যুদ্ধাপরাধী কারা এবং কারা তাদের ক্ষমা করেছিল?
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে  মানবতার বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের দায়ে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের উদ্যোগ নেয়  স্বাধীনতা পরবর্তী  বাংলাদেশ সরকার। বেসামরিক নাগরিক হত্যা, ধর্ষন, লুটাপাট এবং  অগ্নিসংযোগের মত  মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের জন্য ১৯৫ জন পাকিস্তানী যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান এবং অন্যান্য কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ বারবার বিভিন্ন জনসভায়   দৃঢ  প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন ।  কিন্তু  ১৯৭৪ সালে তাদের সকলকে ক্ষমা করে দেয়া হয়। 

যুদ্ধাপরাধীদের  বাছাই  করার জন্য স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে  একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।   কমিটি বিচার বিশ্লেষন করে যুদ্ধাপারধীদের একটি তালিকা তৈরি করে। প্রথমে ৪০০ এবং পরে তা থেকে ১৯৫  জন যুদ্ধাপরাধীর  একটি চূড়ান্ত তালিকা তৈরি করে। এরা সকলেই ছিল পাকিস্তানী উচ্চ পদস্থ সেনা কর্মকর্তা যারা বাংলাদেশে যুদ্ধ পরিচালনার দায়িত্বে ছিল।  ১৯৭৩ সালের ১৭ এপ্রিল সরকার যুদ্বাপরাধী হিসেবে ১৯৫ জন পাকিস্তানী সেনা কর্মকর্তার চূড়ান্ত তালিকা  তৈরি এবং তাদের বিচারের কথা ঘোষনা করে। ১৮  এপ্রিল দৈনিক  বাংলা পত্রিকায় এ বিষয়ে পরিবেশিত খবরে বলা হয়- “তদন্ত শেষে স্বাক্ষী প্রমানের ভিত্তিতে ১৯৫ জন ব্যক্তির বিচার অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত   হয়েছে।  তাদের   অপরাধের মধ্যে  রয়েছে গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ, জেনেভা কনভেনশনের ৩ নং ধারা লঙ্ঘন, নরহত্য, বলাৎকার ও বাড়িঘর পোড়ানো। ঢাকার বিশেষ ট্রাইব্যুনাল তাদের বিচার করবে। মে মাসের শেষের দিকে তাদের  ট্রাব্যুনালের সামনে হাজির করা হতে পারে।”
যুদ্ধাপরাধী পাকিস্তানী এসব সেনা কর্মকর্তার  বিচারের জন্য ১৯৭৩ সালের ১৮ জুলাই   ‘ইন্টারন্যাশনাল ওয়ার ক্রাইমস (ট্রাইবিউনালস ) এ্যাক্ট  আইন পাশ হয় সংসদে।

পকিস্তানী এসব সেনাকমর্তাদের তখন মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের জন্যই যুদ্ধাপরাধী হিসেবে সাব্যস্থ করা হয়। বিভিন্ন পত্রপত্রিকার প্রতিবেদন, নেতৃবৃন্দের বক্তব্য এবং  ভারত-পাকস্তান ও বাংলাদেশের মধ্যে অনুষ্ঠিত ত্রিদেশীয় ক্ষমা বিষয়ক চুক্তিতে তার নজীর রয়েছে। মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের জন্য এসব যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে সে সময়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ যে দাবি এবং প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছিলেন তার কয়েকটি উদাহরণ  সে সময়ের সংবাদপত্র থেকে এখানে  তুলে ধরা হল।

দৈনিক বাংলায় ১৯৭২ সালের  ৩ জুলাই একটি খবরের  হেডলাইন হল “যুদ্ধবন্দীদের বিচার হবেই-কুষ্টিয়া জনসভায় বঙ্গবন্ধু।” ঐ বছর ৩০ নভেম্বর একই  পত্রিকার আরেকটি  খবরের শিরোনাম হল “হত্যা ধর্ষণ লন্ঠনকারী যুদ্ধাপরাধীদের রেহাই দেয়া হবেনা-পাবনার জনসভায় মনসুর আলী।”  খবরে লেখা হয় যোগাযোগমন্ত্রী ক্যাপ্টন মনসুর   আলী বলেন, পাকিস্তানী বর্বর সৈন্যরা এখানে মানবতা বিরোধী জঘন্যতম অপরাধেথ লিপ্ত হয়েছিল। মানবতার স্বার্থেই তাদের বিচার করা উচিত।

দৈনিক বাংলা, ৭ জুন ১৯৭২: শীঘ্রই যুদ্ধাপরাধীদের প্রকাশ্যে বিচার করা হবে। কুয়লালামপুরে সাংবাদিকদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সামাদ আজাদ।
১৯৭৩ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি দৈনিক বাংলা পত্রিকার  আরেকটি  খবরের শিরোনাম হল “বাংলার মাটিতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হবেই- টাঙ্গাইলে বঙ্গবন্ধু।” একই বছর ঐ পত্রিকার  আরেকটি খবরের শিরোনাম হল “১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীর বিচার হবেই-নয়া দিল্লীতে বঙ্গবন্ধু।” 
এভাবে ১৯৭২ এবং ১৯৭৩ সালের বিভিন্ন পত্রিকায় থেকে  যুদ্ধাপরাধীদের বিচার  বিষয়ে তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের অসংখ্য দৃড় প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করার উদাহরণ দেয়া যায়।

কিন্তু ১৯৭৪ সালের ৯ এপ্রিল দিল্লীতে  ভারত-পাকিস্তান এবং বাংলাদেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত ত্রিদেশীয় চুক্তির মাধ্যমে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের সাথে জড়িত এসব যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষমা ঘোষনা করা হয়।  চুক্তির ১৩, ১৪ এবং ১৫ দফায় বলা হয়েছে “পাকিস্তান স্বীয় সামরিক বাহিনীর অপরাধের নিন্দা জ্ঞাপন ও উহার জন্য  গভীর অনুশোচনা ও দুংখ প্রকাশ  করেছে।  ইসলামাবাদ সরকারের এই মনোভাব এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোর ‘ক্ষমা করো এবং ভুলে যাও’ আবেদনের প্রেক্ষিতে  বাংলাদেশ সরকার ১৯৫ জন পাকিস্তানী যুদ্ধপারাধীর বিচার  না করে  ক্ষমা প্রদর্শনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।  অত:পর অন্যান্য যুদ্ধবন্দীদের সাথে তাদেরও ভারত হতে পাকিস্তানে ফেরত পাঠানো হবে।  উপমাহাদেশে শান্তি,  স্থিতি এবং অগ্রগতির লক্ষ্যে  এ চুক্তি করা   হয়েছে।”

১৯৭৪ সালের ১২ এপ্রিল  দৈনিক ইত্তেফাক  পত্রিকায় প্রকাশিত একটি খবরের শিরোনাম হল “ক্ষমা প্রদর্শন করিয়া আমরা বিশ্বের  প্রশংসা অর্জন করিয়াছি-ড. কামাল হোসেন”। প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে-“পররাষ্ট্র মন্ত্রী ড. কামাল হোসেন বলিয়াছেন,  বাংলাদেশের জনগণের উপর সামরিক বাহিনী যে অত্যাচার করিয়াছে পাকিস্তান সরকার সেজন্য দোষ স্বীকার করিয়া লইয়াছেন, ক্ষমার আবেদন জানাইয়াছেন। ঐ দেশের প্রধানমন্ত্রী সমগ্র বাঙ্গালী জাতির  কাছে ক্ষমা  চাহিয়াছেন। আমরা সুবিচার প্রতিষ্ঠা করিতে চাহিয়াছিলাম, প্রতিহিংসা চাইনা। ক্ষমা চাওয়া হইয়াছে ক্ষমা দেওয়া হইয়াছে।
পররাষ্ট্র  মন্ত্রী  বলিয়াছেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করিলে তিনটি বিষয় প্রতিষ্ঠা করা যায়। প্রথমত ইতিহাসে ইহার স্থান দেওয়া, দ্বিতীয়ত যে দেশের লোক এই অন্যায় করিয়াছে তাহা প্রমান করা এবং তৃতীয়ত আমাদের অবর্ণনীয় ক্ষয়ক্ষতির প্রমান দেওয়া। যেহেতু এ ব্যাপারে পাকিস্তান সরকার কোন চ্যালেঞ্জ করেনাই বরং সকল অন্যায় স্বীকার করিয়া নিয়াছে তখন আর বিচার করার সঙ্গত কোন কারণ নাই।  এতে কোন লাভ হইবে না। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বন্ধ করায় বাংলাদেশ বিশ্বের প্রশংসা অর্জন করিয়াছে। এর ফলে উপমহাদেশে স্বাভাবিকতা ফিরিয়া আসিবে। এটা সকলে চায়। দিল্লী চুক্তি সকলে গ্রহণ করিয়াছে।”

যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষমা করা বিষয়ক ১৬ দফার ত্রিপাক্ষিক চুক্তির তিনটি মূল কপি  দিল্লী, ইসলামাবাদ এবং ঢাকা থেকে  একযোগে  পূর্ণ বিবরণসহ প্রকাশিত হয়। চুক্তি ১৩ দফায়  লেখা হয়েছে-“বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী (ড. কামালা হোসেন) বলেন যে,  পাকিন্তানী  যুদ্ধাপরাধীরা  বিভিন্ন ধরণের অপরাধ যেমন যুদ্ধাপরাধ, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ এবং গণহত্যার মত অপরাধ করেছে।”

আজ মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের  দায়ে যে বিচারের কথা বলা হচ্ছে তাও মূলত ঐ পাকিস্তানী ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষেত্রেই প্রয়োগ করা হয়েছে চুক্তিতে।  

১৯৭৪ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি লাহোরে এক সংবাদ সম্মেলনে জুলফিকার আলী ভুট্টো বলেন, “ যুদ্ধাপরাধের দয়ে ১৯৫ জন যুদ্ধবন্দীর পরিকল্পিত বিচার বাতিল করা হইবে এই মর্মে  দৃঢ় আশ্বাসের বিনিময়ে তিনি বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দান করিবেন। এই প্রতিশ্রুতি কেবল বাংলাদেশকই দিতে হইবে এমন কোন কথা নয়। যেকোন দেশ এই প্রতিশ্রুতি দিতে পারে।” সূত্র ইত্তেফাক, ১৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৪)।
সব কিছু মিলিয়ে বাংলাদেশ যুদ্ধাপরাধীরে ক্ষমার পক্ষে অবস্থান নেয়।
১৯৭২ সালের ১৯  নভেম্বর  জুলিও কুরি শান্তি পদক লাভ  উপলক্ষে আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে  বঙ্গবন্ধু ভুট্টোর উদ্দেশে বলেন  “গণহত্যাকারীরা প্রকাশ্যে মাফ চাও, বাঙ্গালী ক্ষমা করতেও পারে।” এ থেকে বোঝা যায় বঙ্গবন্ধু তাদের মাফ করার  পক্ষেই ছিলেন। (সূত্র দৈনিক বাংলা ২০ নভেম্বর,৭২) ।

১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষমার জন্য ত্রিদেশীয় চুক্তি :
১৯৭৪ সালের ৯ এপ্রিল বাংলাদেশ ভারত এবং পাকিস্তানেবর মধ্যে  ত্রিদেশীয় দিল্লী চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।   চুক্তি অনুযয়ী বাংলাদেশে  ১৯৭১ সালের যুদ্ধে  গণহত্যা,   মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ এবং  যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত ১৯৫ জন পাকিস্তানী সেনাকর্মকর্তাকে ক্ষমা করে বাংলাদেশ।  চুক্তিতে বলা হয়েছে, ১৯৭১ সালের বেদনায়ক  ঘটনার কারণে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে বাংলাদেশের কাছে  ‘ক্ষমা কর এবং ভুলে যাও’ আবেদনের প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ তাদের বিচার না করে   ক্ষমা করে দিয়েছে। যুদ্ধের কারণে  ভারতে আটক ৯২ হাজার পাকিস্তানী সৈন্যসহ ৩০ লাখের উপরে বেসামরিক নাগরিক তখন তিন দেশে  আটকা পড়ে ছিল ।  ১৯৭১ সালের যুদ্ধের পরপরই ১৯৭২ সালে ভারত- পাকিস্তানের মধ্যে সিমলা চুক্তি স্বাক্ষর হয় এবং চুক্তিতে   দুই দেশের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক এবং  সম্প্রীতি  স্থাপনে সব ধরণের প্রতিশ্রুতির কথা ব্যক্ত করা হয় উভয় দেশের পক্ষ থেকে।   কিন্তু তার কোনটিই বাস্তবায়ন সম্ভব হয়না  বাংলাদেশকেন্দ্রিক যুদ্ধউত্তর সমস্যার সমাধান না হওয়ায় । যুদ্ধউত্তর সমস্যার সমাধান এবং তা নিয়ে তিন দেশের মধ্যে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি নিরসনে ১৯৭২ সাল থেকে  দফায় দফায় আলোচনাসহ নানামুখী উদ্যোগ নেয়া হয় এবং সবশেষে তা পূর্ণতা পায়  ১৯৭৪ সালের  ত্রিদেশীয় চুক্তির মাধ্যমে।  চুক্তিটি স্বাক্ষরের পর দিল্লী, ইসলামাবাদ এবং ঢাকা থেকে তা  একযোগে প্রকাশ করা হয়। চুক্তিতে মোট   ১৬টি দফা ছিল।  

১৩ দফায় বলা হয় “উপমহাদেশে  শান্তি এবং সমৃদ্ধির লক্ষ্যে  এবং তিন দেশের মধ্যে  আশু বন্ধুত্বপূর্ণ  সম্পর্ক ও সম্প্রীতি স্থাপনের লক্ষ্যে ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীদের বিষয়টি  নিয়ে তিন দেশের তিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী  আলোচনা করেণ।  বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. কামাল হোসেন বৈঠকে বলেন যে, জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে গৃহীত প্রস্তাব, আন্তর্জাতিক আইন, যুদ্ধাপরাধ, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ এবং গণহত্যাজনিত অপরাধ বিষয়ে যত আইন আছে তার সবগুলোর বিবেচনাতেই ১৯৫ জন পাকিস্তানী সৈন্য অপরাধী । ঐসব আইনে যুদ্ধাপরাধ, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ, গণহত্যার সংজ্ঞায় যেসব অপরাধের নাম আছে এবং যারা ঐসব অপরাধ করবে তাদের যথাযথ আইনী প্রকৃয়ায়  বিচারের আওতায় আনার বিষয়ে সারা বিশ্ব সর্বসম্মতভাবে একমত। আর ১৯৫ জন পাকিস্তানী সৈন্য ঐসব আইনে বর্ণিত অনেক অপরাধ করেছে।  পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এসব ঘটনাকে তার  সরকার কঠোরভাবে নিন্দা জানায়  এবং এ জাতীয় অপরাধ হয়ে থাকলে তার জন্য পাকিস্তান গভীরভাবে অনুতপ্ত।

১৪ তম দফায় বলা হয় “তিন মন্ত্রী একমত হন যে,  উপমহাদেশে শান্তি ও অগ্রগতির স্বার্থে তিন দেশের মধ্যে যে সমঝোতা চুক্তি হয়েছে তার আলোকেই ১৯৫ জন সৈনিকের বিষয়টি  বিবেচনা করা উচিত। পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান যে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর  আমন্ত্রনে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শীঘ্রই বাংলাদেশ ভ্রমনে যাবার ঘোষনা দিয়েছেন  এবং   আপনার দেশের নাগরিকদের কাছে ক্ষমা প্রার্থনার  আবেদন জানাবেন । একইভাবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী  পাকিস্তানীদের  প্রতি ক্ষমা  প্রার্থনার  আহবান জানিয়ে ঘোষনা দিয়েছিলেন যে, বাংলাদেশের মানুষ   ক্ষমা করতে  জানে।  তাই নতুন করে আবার সবকিছু শুরু করার জন্য ১৯৭১ বাংলাদেশে যে   বর্বরতা এবং  ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ হয়েছে তা তিনি তার দেশের নাগরিকদের ভুলে যাওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন।

১৫ তম দফায় বলা হয়-   ‘ক্ষমা করো এবং ভুলে যাও’  বাংলাদেশের প্রতি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর এই আবেদন এবং মনোভাবের  প্রেক্ষিতে  বাংলাদেশ সরকার ১৯৫ জন পাকিস্তানী যুদ্ধপারাধীর বিচার  না করে  ক্ষমা প্রদর্শনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে  বলে ঘোষনা করেণ বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী।   অত:পর দিল্লী সমঝোতার আলোকে অন্যান্য যুদ্ধবন্দীদের সাথে এই ১৯৫ জন সেনাকর্মকর্তাদেরও  ভারত হতে পাকিস্তানে ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়। 

চুক্তিতে স্বাক্ষর করেণ: ড. কামাল হোসেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী, বাংলাদেশ সরকার, সরদার শরণ সিং, বিদেশমন্ত্রী, ভারত সরকার এবং আজিজ আহমেদ, পররাষ্ট্র এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রী, পাকিস্তান সরকার।

রাজাকার থেকে যুদ্ধাপরাধ, যুদ্ধাপরাধ থেকে মানবতাবিরোধী অপরাধ
জামায়াতের লোকজনকে আগে বলা হত রাজাকার। এরপর বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর তাদের বলতে শুরু করল যুদ্ধাপরাধী। সর্বশেষ তাও বদলে দিয়ে বলা শুরু করল মানবতা বিরোধী অপরাধী।

যুদ্ধাপরাধী, মানবতাবিরোধী অপরাধী  এবং মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর এদেশীয় সহযোগী সম্পূর্ণ ভিন্ন  দুটি বিষয় । সেজন্য তাদের বিচারের  জন্য  দুটি পৃথক আইন হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানী সহযোগীদের বিচারের জন্য ১৯৭২ সালে  করা হয় দালাল আইন ।  আর যুদ্ধাপরাধী এবং মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচারের জন্য ১৯৭৩ সালে করা হয় ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস (ট্রাইব্যুনালল) এ্যাক্ট। যুদ্ধাপরাধী  এবং মানবতা বিরোধী অপরাধী হিসেবে  তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার যাদের  চিহ্নিত  করেছিল  তারা সকলেই (১৯৫ জন) ছিল পাকিস্তানী সেনা কর্মকর্তা, এদেশীয় কোন সহযোগী বা রাজাকার, শান্তি কমিটির লোকজন নয়।

বর্তমান সরকার এদেশীয় সহযোগীদের যুদ্ধাপরাধী হিসেবে বিচারের উদ্যোগ নিয়েছে। যুদ্ধপারধী বলতে যেহেতু পাকিস্তানী সেনা কর্মকর্তাদের বোঝায় তাই  সরকার যুদ্ধাপরাধী শব্দের বদলে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ শব্দটি ব্যবহারের কৌশল নিয়েছে। কিন্তু মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধী বলতেও  মূলত পাকিস্তানী ঐ সেনাকর্মকর্তাদেরই বোঝানো হয়েছে সবসময়।  অতীতে কখনোই পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর এদেশীয় সহযোগী, রাজাকার, শান্তি কমিটির লোকদের  যুদ্ধাপরাধী বা মনাবতার বিরুদ্ধে অপরাধী হিসেবে অভিহিত করা হয়নি। এমনকি বর্তমানে যাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে তাদের  তো নয়ই। ১৯৭৪ সালে ভারত-পাকিস্তান-বাংলাদেশের মধ্যে অনুষ্ঠিত ত্রিদেশীয় চুক্তি, বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক প্রণীত যুদ্ধাপরাধীদের তালিকা,  পাকিস্তানের হামুদুর রহমান কমিশন রিপোর্ট,  দালাল আইন, দালাল আইনে করা অসংখ্য মামলা এবং সেসময়কার পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত খবরা-খবর এর  স্বাক্ষর বহন করছে।  

স্বাধীনতা লাভের দেড় মাসের মধ্যে ১৯৭২ সালের ২৪ জানুয়ারি বাংলাদেশ কোলাবোরেটরস (স্পেশাল ট্রাইব্যুনালস) অর্ডার নামে এ দালাল আইন  প্রণয়ন করা হয়।  দালাল আইনে  এক লাখেরও বেশি লোক গ্রেফতার করা হয়।

দালাল আইন প্রণয়নের সাথে সাথে সারা দেশে তখন ব্যাপক ধরপাকড় এবং  গ্রেফতার অভিযান  শুরু হয়ে যায়। ১৯৭২ সালের অক্টোবর মাস পর্যন্ত ৪১ হাজার দালাল গ্রেফতার হবার কথা জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল মান্নান (৪ অক্টোবর, দৈনিক বাংলা) ।  তখনকার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী আব্দুল মালেক উকিল কর্তৃক প্রদত্ত তথ্য এবং স্বাধীনতা পরবর্তী বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে দেখা যায়  দালাল আইনে  লক্ষাধিক লোক গ্রেফতার  হয়।  তার মধ্যে ৩৭ হাজার ৪৭১ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়। অভিযুক্ত এ ৩৭ হাজারের মধ্য থেকে  ৩৪ হাজার ৬২৩ জনের বিরুদ্ধে স্বাক্ষী প্রমান না থাকায় কোন মামলা দায়ের করা সম্ভব হয়নি। ২ হাজার ৮৪৮ জনকে বিচারের জন্য সোপর্দ করা হয়। বিচারে ৭৫২ জনের শাস্তি হয় এবং বাকী এক লাখ বন্দীদের  বেকসুর  খালাস দেয়া হয়।

সারা দেশে ব্যাপকভাবে দালাল আইনে ধরপাকড়ের ফলে সদ্য স্বাধীন যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশে একটা  অস্থির পরিবেশ  সৃষ্টি হয়। ধরপাকড়দের মধ্যে সরকারি কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন শ্রেণী পেশার লোক থাকায় সরকারি কাজকর্মেও বিশৃংখলা এবং নৈরাজ্য দেখা দেয়। স্বাধীনতা যুদ্ধে বিরোধীতা করছে কিন্তু কোন অপরাধমূলক কাজে অংশ নেয়নি এমন  লোকদেরও বিভিন্ন  অভিযোগের ভিত্তিতে ব্যাপকভাবে গ্রেফতার চলতে থাকে। অসংখ্য লোক গ্রেফতার এড়াতে  আত্মপোগন করে। সব মিলিয়ে দেশে এক ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় যা একটি সদ্য স্বাধীন দেশ গড়ার পক্ষে বিরাট অন্তরায় হয়ে দেখা দেয়। নতুন করে হানাহানি, বিভক্তি, অনৈক্য এবং প্রতিহিংসা মাথচাড়া দিয়ে ওঠে।  বিভিন্ন মহল থেকে দালাল আইনের বিরুদ্ধে কথা ওঠে এবং এ আইন সংশোধনের  প্রস্তাব দেয়া হয়। এমনি পরিস্থিতিতে  আসে সাধারণ ক্ষমার বিষয়। দেশের সকল অনৈক্য বিভক্তি,  সন্দেহ মুছে ফেলে সবাইকে  একতাবদ্ধ হয়ে দেশ গড়ার কাজে ঝাপিয়ে পড়ার জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৩ সালের ৩০ নভেম্বর সাধারণ ক্ষমা ঘোষনা করেন।

১৯৭৩ সালের পয়লা ডিসেম্বর দৈনিক সংবাদ পত্রিকায় এ বিষয়ে পরিবেশিত  খবরে বলা  হয় “সরকার দালাল আইনে সাজাপ্রাপ্ত এবং বিচারাধীন সকল আটক ব্যক্তির প্রতি সাধারণ ক্ষমা ঘোষনা করেছেন। তবে ধর্ষণ, হত্যা, অগ্নিসংযোগের অভিযোগে যারা সাজা ভোগ করছে কিংবা বিচারাধীন রয়েছে তাদের ক্ষেত্রে এ ক্ষমা প্রদর্শণ কার্যকর হবেনা। তৃতীয় বিজয় দিবস উৎসবে যাতে তারা শরীক হতে পারে সেজন্য ১৬ ডিসেম্বরের আগেই শেখ মুজিবুর রহমান তাদের মুক্তির ব্যবস্থার নির্দেশ দিয়েছেন স্বরাষ্ট্র   মন্ত্রণালয়কে। যারা পলাতক তারা আদালতে উপস্থিত হয়ে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করলেই এ ক্ষমার আওতায় পড়বে।”

মানবতা বিরোধী অপরাধের আইনে দেশীয় সহযোগীদের বিচার :
মুক্তিযুদ্ধে এদেশীয় সহযোগীদের বিচারের জন্য হয়েছিল দালাল আইন। আর পাকিস্তানী সেনাকর্মকর্তাদের যুদ্ধাপরাধের/ মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে বিচারের জন্য হয়েছিল ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস (ট্রাইব্যুনালস) এ্যাক্ট। দুটি আইনের উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন । দালাল আইনে এদেশীয় সহযোগীদের বিচার ফয়সালা হয়েছে। কিন্তু যুদ্ধাপরাধী আইনে পাকিস্তানী যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হয়নি । তাদের সবাইকে ক্ষমা করা হয়।  এখন পাকিস্তানী সেনা কর্মকর্তাদের বিচারের জন্য যে আইন হয়েছিল সেই আইন ২০০৯ সালে সংশোধন করে এদেশীয় সহযোগীদের  বিচারের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ১৯৭৩ সালের আইনে সশস্ত্র বাহিনী, প্রতিরক্ষা বাহিনী বা সহায়ক বাহিনীর সদস্যদের বিচারের কথা  বলা হয়েছিল। ২০০৯ সালে তা সংশোধন করে একক ব্যক্তি বা ব্যক্তি গোষ্ঠী (রহফরারফঁধষং ড়ৎ মৎড়ঁঢ় ড়ভ রহফরারফঁধষং) শব্দগুলি সংযোজন করে এদেশীয় সহযোগীদের বিচারের উদ্যোগ নেয়া হয়। একজনের বিচারের জন্য তৈরি আইনের মাধ্যমে অন্য আরেকজনের বিচারের  উদ্যোগ নেয়ায় শুরু থেকে এ নিয়ে অনেক বিতর্ক এবং সমালোচনা ওঠে। সব কিছু উপক্ষো করে ২০১০ সালের মার্চ মাসে  আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। বর্তমানে এ ট্রাইব্যুনালের অধীনে যারা বন্দী রয়েছেন বিচার  ও বিচার প্রকৃয়া চলছে তারা হলেন জামায়াতের সাবেক আমীর অধ্যাপক গোলাম আযম, বর্তমান আমীর মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী, সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ,  ্নায়েবে আমির মাওলানা আব্দুস সোবহান,  আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী,  ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল এটিএম আজহারুল ইসলাম, সহকারি সেক্রেটারি জেনারেল মুহম্মদ কামারুজ্জামান, আব্দুল কাদের মোল্লা, জামায়াতের নির্বাহী পরিষদের সদস্য মীর কাসেম আলী, বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী এবং সাবেক বিএনপি মন্ত্রী আব্দুল আলীম প্রমুখ। এদের মধ্যে আব্দুল কাদের মোল্লা এবং  পলাতক থাকা অবস্থায় অপর মাওলানা আবুল কালাম আযদের বিচার শেষে রায় ঘোষনা করা হয়েছে। গত ৫ ফ্রেব্রুয়ারি আব্দুল কাদের মোল্লার যাবজ্জীন কারাদন্ডের রায় ঘোষনার পর তা প্রত্যাখ্যান করে  তার ফাঁসির দাবিতে শাহবাগে জমায়েত থাকেন তরুন প্রজন্ম।

দায়মুক্তি কতটুকু : ১৯৭১ সাল আমাদের জাতির জন্য যেমন গৌরবের তেমনি কলঙ্কের এবং গভীর বেদনার। গৌরবের কারণ  আমরা স্বাধীনতা লাভ করেছি। আর কলঙ্কের এবং গভীর বেদনার কারণ অগনিত মাতা ভগ্নির গায়ে এখনো ইজ্জত হারানো কলঙ্কের দাগ লেগে আছে। স্বজন হারানো  গভীর বেদনা এখনো অনেকে বয়ে বেড়াচ্ছেন। গনহত্যা, হত্যা এবং ধ্বংসের  নারকীয় বিভীষিকা আজো  তাড়িত করে আমাদের।  জীবন দিতে হযেছে লক্ষ লক্ষ মানুষকে।  যারা স্বজন হারিয়েছে তাদের স্বজনরা আর কোনদিন ফিরে আসবেনা। কিন্তু এজন্য দায়ীদের উপযুক্ত শাস্তি প্রদানের মাধ্যমে তারা কিছুটা হলেও শান্তি এবং সান্তনা পেতে পারেন এটা অবশ্যই সত্য।  মাওলানা আবুল কালাম আযাদের অনুপস্থিতিতে তাকে ফাঁসির রায় প্রদানের পর একটি পত্রিকা হেডলাইন লিখেছিল ইতিহাসের দায় মেটাল বাংলাদেশ। কিন্তু আসলেই কি বাংলাদেশ এর মাধ্যমে এবং  পাকিস্তানী আসল যুদ্ধাপরাধীদের ছেড়ে দিয়ে  তাদের  এদেশীয় সহযোগীদের বিচার করে ইতিহাসের দায় মেটাতে পারবে?  পারলেও কতটুকু? এ প্রশ্ন অনেকের। তাছাড়া আজ যারা এদের বিচার করছে সেই আওয়ামী লীগ  একদিন এদের সাথেই জোট বেধে ক্ষমতার রাজনীতির আন্দোলন করেছিল। সেকথাতো মানুষ ভুলে যায়নি। কাজেই যুদ্ধাপরাধী বা মানবতাবিরোধী অপরাধী যে নামেই দেশীয় সহযোগীদের আখ্যায়িত করে বিচার করা হোক না কেন এবং যতুটুকুই ইতিহাসের   দায় মেটানোর চেষ্টা করা হোকনা কেন তার উদ্দেশ্য নিয়েও  প্রশ্ন থেকে যাবে। আজ  জামায়াত যদি আওয়ামী লীগের সাথে রাজনৈতিক জোটের সাথে থাকত বা বিএনপির সাথে না থাকত, বা যে লোকগুলোর বিচার চলছে তারা যদি জামায়াতের সাথে না থাকত বা কোন রাজনীতির সাথেই না থাকত তাহলে কি তাদের এভাবে বিচার করত আওয়ামী লীগ? মানুষের এজাতীয়  প্রশ্নের জবাব কি?




প্রশ্নবিদ্ধ বিচার
মাওলানা আবুল কালাম আযাদের ফাঁসির রায়ের খবর বিশ্বের সকল মিডিয়ায় ফলাও করে  প্রচার করা হয়।  বিবিসি, রয়টার্স, এপি, এএফপিসহ বিশ্বের সকল প্রভাবশালী মিডিয়া  মাওলানা আযাদ সম্পর্কে তাদের পরিবেশিত খবরে ট্রাইব্যুনালকে বিতর্কিকত, রাজনৈতিক পক্ষপাতদুষ্ট হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।  এছাড়া বিশ্বখ্যাত লন্ডনের ইকোনমিস্ট সাময়িকী বারবার কঠোরভাষায় ট্রাইব্যুনালের সমালোচনা করে স্পষ্টভাবে লিখেছে বর্তমান সরকার তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন করার অংশ হিসেবে এ বিচার পরিচালনা করছে। সব মিলিয়ে ট্রাইব্যুনাল গঠন এবং বিচার শুরু থেকে কখনো বিতর্কের উর্ধ্বে উঠতে পারেনি ট্রাইব্যুনাল এবং এর বিচার প্রক্রিয়া।

স্কাইপ কেলেঙ্কারি : ট্রাইব্যুনাল এবং ট্রাইব্যুনালের বিচার সবচেয়ে বেশি প্রশ্নবিদ্ধ এবং বিতর্কিত হয়েছে ট্রাইব্যুনাল-১ এর সাবেক চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হক নাসিমের স্কাইপ কেলেঙ্কারির ফলে। বিচার নিয়ে বেলজিয়ামের ড. আহমেদ জিয়াউদ্দিনের সাথে কথোপকথন  ফাঁস হওয়ার ফলে জানা গেল বিভিন্ন সময় ট্রাইব্যুনাল যেসব আদেশ দিয়েছেন তা আসত বেলজিয়াম থেকে। এছাড়া  মাওলানা সাঈদীসহ আরো বিভিন্ন রায়ের খসড়াও বেলজিয়ামে প্রস্তুত করা হচ্ছিল। স্কাইপ কেলেঙ্কারির ফাঁসের ফলে  বের হয়ে যায় এ বিচার কোথা থেকে কাদের ঈশারায় কিভাবে পরিচালিত হচ্ছিল। শুধু বাংলাদেশ নয় গোটা বিশ্বের গণমাধ্যমে আলোচনার বিষয় হয় এ স্কাইপ কেলেঙ্কারির ঘটনা। বাংলাদেশ তথা বিচার বিভাগের ইতিহাসে এ ধরনের ন্যাকারজনক ঘটনা আগে কখনো  ঘটেনি বলে মন্তব্য করেন আইন বিশেষজ্ঞরা। শেষ পর্যন্ত এ কলঙ্কের দায় নিয়ে ১১ জানুয়ারি পদত্যাগ করেন বিচারপতি নিজামুল হক।

সাক্ষী অপহরন : সুখরঞ্জন বালী ছিলেন মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের একজন সাক্ষী । কিন্তু তিনি রাষ্ট্রপক্ষের হয়ে সাক্ষ্য দেয়ার বদলে মাওলানা সাঈদীর পক্ষে সাক্ষ্য দিতে আসেন ৫ নভেম্বর ২০১২। ওইদিন ডিবি পুলিশ তাকে ট্রাইব্যুনালের সামনে থেকে অপহরন করে নিয়ে যায়। এ ঘটনা বিশ্বের প্রভাবশালী বিভিন্ন গনমাধ্যমে পকাশ করা হয় এবং বিচার নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়।

বিচারপতি নিজামুল হককে নিয়ে বিতর্ক : ১৯৯৩  সালে  জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে অধ্যাপক গোলাম আযম বিচারের জন্য গণআদালত গঠন করা হয়। গণআদালতের অধীনে গোলাম আযম, নিজামী, সাঈদীসহ বর্তমানে বন্দী প্রায় সব নেতাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ  তদন্তের জন্য একটি গনতদন্ত কমিশন গঠন করা হয়। সে কমিশনের সেক্রেটারিয়েট সদস্য ছিলেন বিচারপতি নিজামুল হক। কাজেই আগে থেকেই তিনি বর্তমান অভিযুক্তদের বিচারের সাথে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগে তার পদত্যাগ দাবি করেন আসামী পক্ষ। কিন্তু তিনি পদত্যাগ করেননি।

আইন নিয়ে বিতর্ক : ১৯৫ জন পাকিস্তানী সেনা কর্মকর্তাকে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে চিহ্নত করে স্বাধীনতা পরবর্তী আওয়ামী লীগ সরকার। তাদের বিচারের জন্য ১৯৭৩ সালে একটি আইন তৈরি করা হয়। কিন্তু ১৯৫ জন পাকিস্তানীকে ক্ষমা করে দেয়ায় ওই আইনে  কারো বিচার হয়নি। সেই আইনটি ২০০৯ সালে সংশোধন করে দেশীয় সহযোগীদের বিচারের উদ্যোগ নেয়া হয়। একজনের জন্য তৈরি করা আইন দিয়ে আরেকজনের বিচার এবং আইনের নানা দিক  নিয়ে সমালোচনা শুরু হয় ট্রাইব্যুনাল গঠনের পরপরই। এ আইন দিয়ে ন্যায় বিচার করা সম্ভব নয় এবং আন্তর্জাতিক আইনের যে মানদণ্ড তার অনেক নিচে এ আইন। এ আইনের মাধ্যমে আসামীর ন্যায় বিচার নিশ্চিত হবেনা বলে দেশ এবং বিদেশ থেকে সমালোচনা করা হয়। এ আইন নিয়ে বিশ্বের সকল বড় বড় আইনী এবং মানবাধিকার সংস্থা এর সমালোচনা করেছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, আইবিএ, জাতিসংঘসহ সকল বড় বড় সংস্থা আইনের সমালোচনা করে সংশোধন দাবি করে প্রস্তাব পাঠিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধাপরাধ বিষয়ক বিশেষ দূত স্টিফেন জে র‌্যাপ কয়েক দফা বাংলাদেশ সফর করে আইনের দুর্বল দিক সংশোধন করে প্রস্তাব পেশ করেছেন বাংলাদেশ সরকারের কাছে।

সেফ হাউজ  : গত ২০ মার্চ রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের পক্ষ থেকে ট্রাইব্যুনালে একটি আবেদন পেশ করা হয়। আবেদনে বলা হয়  মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে  ৪৬ জন  সাক্ষীকে  হাজির করা আদৌ সম্ভব নয়। তাই  ৪৬ জন সাক্ষী  তদন্ত কর্মকর্তার কাছে যে  জবানবন্দী  দিয়েছেন তা  তাদের অনুপস্থিতিতে আদালতে সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহন করা হোক।

২৯ মার্চ  ১৫ জনের সাক্ষীর জবানবন্দী  তাদের অনুপস্থিতিতে সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ  করে আদেশ দেন  ট্রাইব্যুনাল। 

মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে সাক্ষী হাজির না করার কারণ হিসেবে রাষ্টপক্ষ বলেছিল  মাওলানা সাঈদীর পক্ষের অস্ত্রধারীদের হুমকির কারনে কেউ কেউ  আত্মগোপন করেছে, কেউ নিখোঁ প্রভৃতি।
পরে আসামী পক্ষ সেফ হাউজের ডকুমেন্ট হাজির করে ট্রাইব্যুনালে। তাতে দেখা যায় ১৫ সাক্ষীর অধিকাংশ এর বাইরেও অনেক সাক্ষী রাষ্ট্রপক্ষের হেফাজনে ঢাকায় একটি বাড়িতে ছিল দীর্ঘদিন ছিল  যাকে সেফ হাউজ বলা হয়। কিন্তু তারা তাদের শেখানো কথামত মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে রাজি না হওয়ায় রাষ্ট্রপক্ষ তাদের ট্রাইব্যুনালে হাজির করেনি। আসামী পক্ষ অভিযোগ করে রাষ্ট্রপক্ষ  তাদের হেফাজতে সাক্ষী রেখে তারা  উল্টো অভিযোগ করছে মাওলানা সাঈদীর সন্ত্রাসীর ভয়ে তারা পারিয়ে  আছে। এসব ডকুমেন্ট হাজির করার পরও ট্রাইব্যুনাল ১৫ সাক্ষীর জবানবন্দী বাতিল করেনি। এ ঘটনায়ও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে ট্রাইব্যুনাল।



মাওলানা আবুল কালাম আযাদকে ফাঁসির রায়

বিশিষ্ট ইসলামী ব্যক্তিত্ব মাওলানা আবুল কালাম আযাদকে ফাঁসির আদেশ দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। ২১ জানুয়ারি ২০১৩  জনাকীর্ণ ট্রাইব্যুনাল কক্ষে ফাঁসির রায় ঘোষণা করা হয়। ১৯৭১ সালে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের লক্ষ্যে গঠিত ট্রাইব্যুনালের এটাই প্রথম রায়।

মাওলানা আবুল কালাম আযাদ বর্তমানে পলাতক রয়েছেন। পলাতক অবস্থায় তার বিচার কার্জ সম্পন্ন করে এ রায় ঘোষণা করা হল। মাওলানা আযাদের পক্ষে তার নিযুক্ত কোন আইনজীবী ছিল না। তবে ট্রাইব্যুনাল তার পক্ষে একজন রাষ্ট্রীয় আইজীবী নিয়োগ দেন।

ট্রাইব্যুনাল গঠনের প্রায় তিন বছরের মাথায় কোন অভিযুক্তের বিরুদ্ধে প্রথম এ রায় ঘোষনা করা হয়।
১১২ পৃষ্ঠার মূল রায় থেকে  ২৪ পৃষ্টার সামারি রায় পাঠ করে শোনান ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিাচরপতি ওবায়দুল হাসান। 

রায়ে জামায়াতে ইসলামীর নাম: মাওলানা আযাদের বিরুদ্ধে রায়ে ১৯৭১ সালে সংগঠিত হত্যা, গণহত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট, নির্যাতন ও মানবতাবিরোধী বিরোধী বিভিন্ন অপরাধের সংক্ষিপ্ত চিত্র তুলে ধরা হয়। রায়ে বলা হয়, পাকিস্তান রক্ষার নামে, নিরস্ত্র বাঙালীদের প্রতিহত করার জন্য জামায়াতে ইসলামী প্যারা মেলেটারি বাহিনী ( অক্সজুলিয়ারি ফোর্স) গঠনে কার্যকরভাবে ভূমিকা পালণ করে। 

যেসব অভিযোগে দন্ড :  মাওলানা আযাদের বিরুদ্ধে মোট আটটি অভিযোগ আনা হয়। এরমধ্যে ট্রাইব্যুনাল সাতটি অভিযোগে দোষীসাব্যস্ত করেন।  চারটি মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেন।
যে সাতটি অভিযোগে তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয় সেগুলো হল, মানবতাবিরোধী অপরাধ, গণহত্যা, হত্যা, ধর্ষণ, অপহরণ, আটক রাখা ও নির্যাতন।

প্রথম অভিযোগ: ’৭১ সালের জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে মাওলানা আযাদ ও তাঁর সহযোগীরা ফরিদপুর শহরের খাবাশপুর থেকে রঞ্জিৎ নাথ ওরফে বাবুনাথকে ধরে নির্যাতন করেন।
দ্বিতীয় অভিযোগ: ’৭১ সালের ২৬ জুলাই আলফাডাঙ্গা থেকে আবু ইউসুফ পাখিকে ধরে এনে ফরিদপুর স্টেডিয়ামে আটক রাখা হয়। মাওলানা আযাদ পাকিস্তানি মেজর আকরামের সঙ্গে আলোচনা করে পাখিকে আটক রাখেন এবং অমানবিক নির্যাতন করেন। ট্রাইব্যুনাল মাওলানা আযাদকে এই অভিযোগ  থেকে অব্যাহতি প্রদান করেন।
তৃতীয় অভিযোগ: ’৭১ সালের ১৪ মে মাওলানা আযাদ ফরিদপুরের বোয়ালমারী থানার কলারন গ্রামের জমিদার সুধাংশু মোহন রায় ও তাঁর বড় ছেলে মণিময় রায়কে বাড়ির পাশের রাস্তায় নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে মাওলানা আযাদ পিছন থেকে রাইফেল দিয়ে গুলি করেন। এতে সুধাংশু নিহত ও মণিময় গুরুতর আহত হন।
চতুর্থ অভিযোগ: ’৭১ সালের ১৬ মে মাওলানা আযাদ রাজাকারদের নিয়ে সালথা থানার (সাবেক নগরকান্দা) পুরুরা নমপাড়া গ্রামে মাধবচন্দ্র বিশ্বাসের বাড়িতে লুটপাট করেন। মাধবকে বাড়ি থেকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে মাওলানা আযাদ গুলি করে হত্যা করে।

পঞ্চম অভিযোগ: ’৭১ সালের ৮ জুন আযাদ ও তাঁর চার-পাঁচজন সহযোগী বোয়ালমারীর নতিবদিয়াা গ্রামের এক হিন্দু বাড়িতে দুই নারীকে (দেব রানী ও সুভ রানী) গণধর্ষণ করেন।

ষষ্ঠ অভিযোগ: ’৭১ সালের ৩ জুন আযাদ ও তাঁর সহযোগীরা সালথা থানার ফুলবাড়িয়া গ্রামের হিন্দুপাড়ায় লুটপাট শেষে চিত্তরঞ্জন দাসকে গুলি করে হত্যা করেন।

সপ্তম অভিযোগ: ’৭১ সালের ১৭ মে আযাদ ৩০-৩৫ জন রাজাকারকে নিয়ে বোয়ালমারীর হাসামদিয়া গ্রাম ও মইনদিয়া বাজারে গুলিকরে শরৎচন্দ্র পোদ্দার, সুরেশ পোদ্দার, শ্যামাপদ পোদ্দার, জতীন্দ্র মোহন সাহা, নীল রতন সমাদ্দার, সুবল কয়াল ও মল্লিক চক্রবর্তীকে হত্যা করেন।

অষ্টম অভিযোগ: ’৭১ সালের ১৮ মে আযাদ সাত-আটজন রাজাকারকে নিয়ে সালথা থানার উজিরপুর বাজারপাড়া গ্রামের এক সংখ্যালঘু তরুণীকে (অঞ্জলী দাসকে) অপহরণ করে খাড়দিয়া গ্রামের চান কাজীর বাড়িতে আটকে রেখে নির্যাতন করেন।

৩,৪,৬ এবং ৭ নং অভিযোগে তাকে মৃত্যুদণ্ড এবং অন্য  দুটিতে  তাকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড প্রদান করা হয়।
এক মাসে বিচার শেষ : গত ২৬ নভেম্বর থেকে মাওলানা আযাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয় এবং গত ২৬ ডিসেম্বর মাত্র এক মাসের ব্যবধানে সাক্ষ্য গ্রহণের পর যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ করে ট্রাইব্যুনাল রায়ের জন্য রাখেন। রাষ্ট্রপক্ষের ২২জন সাক্ষী মাওলানা আযাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেন। এরপর ২৫ দিনের ব্যবধানে ট্রাইব্যুনাল রায় ঘোষণা করবেন। গত ২৬ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ মামলার শেষ ধাপে রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ হওয়ার পর ট্রাইব্যুনাল রায়ে নির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণা না করে সিএভি (কোর্ট অ্যাডজর্ন ফর ভারডিক বা রায়ের জন্য মূলতবি) করেন।

পলাতক অবস্থায় মাওলানা আযাদের বিচার: ৩ এপ্রিল ২০১২  মাওলানা আযাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন ট্রাইব্যুনাল-২। এরপর থেকে তিনি পলাতক রয়েছেন। ওইদিন উত্তরখানে মাওলানা আযাদের বাসভবন গিয়ে পুলিশ তাঁকে পায়নি।  ২৫ সেপ্টেম্বর দুটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে আযাদকে সাত দিনের মধ্যে ট্রাইব্যুনালে হাজির হতে বলা হয়। কিন্তু তিনি হাজির না হওয়ায় ট্রাইব্যুনাল তাঁকে পলাতক ঘোষণা করেন এবং তাঁর অনুপস্থিতিতে বিচার শুরু করেন। মাওলা আযাদ পালাতোক থাকায় ৭ অক্টোবর তার পক্ষে মোঃ আবদুস শুকুর খানকে আইনজীবী নিয়োগ দেন ট্রাইব্যুনাল।

গত ৪ নভেম্বর মাওলানা আযাদের বিরুদ্ধে আটটি সুনির্দিষ্ট ঘটনায় অভিযোগে চার্জ গঠন করা হয়।
৭ অক্টোবর ট্রাইব্যুনাল আবুল কালাম আজাদের অনুপস্থিতিতে বিচার শুরুর আদেশ দেন। 

ট্রাইব্যুনালের প্রথম রায়: ২০১০ সালের ২৫ মার্চ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ গঠন করা হয়। এরপর ট্রাইব্যুনালের বিচার দ্রুত সম্পন্ন করতে ২০১২ সালের ২২ মার্চ ট্রাইব্যুনাল-২ গঠন করা হয়। ট্রাইব্যুনাল-১ গঠনের দুই বছর পর ট্রাইব্যুনাল-২ গঠন করা হলেও ট্রাইব্যুনাল-২ থেকে প্রথম রায় ঘোষণা করা হল।


কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন

জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ গত ৫ ফেবব্রুয়ারি  তার বিরুদ্ধে রায় ঘোষণা করেন।
আবদুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ আনিত ছয়টি অভিযোগের মধ্যে পাঁচটিতে সাজা দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। দুটি অভিযোগে যাবজ্জীবন এবং অপর তিনটি অভিযোগে ১৫ বছর করে কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। তবে তিনটি অভিযোগে ১৫ বছর কারাদণ্ড দেয়া হলেও আদেশে মোট সাজা যাবজ্জীবন রাখা হয়েছে। এছাড়া একটি আভিযোগ থেকে আবদুল কাদের মোল্লাকে খালাস দেয়া হয়েছে।

হরতাল চলাকালে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যে ট্রাইব্যুনাল-২-এ আবদুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে রায় ঘোষণা করা হয়।  এসময় আব্দুল কাদের মোল্লার পক্ষে কোন সিনিয়র আইনজীবী ট্রাইব্যুনালে উপস্থিতি ছিলেননা। ১৯৭১ সালে সংগঠিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের লক্ষ্যে গঠিত ট্রাইব্যুনালের এটি দ্বিতীয় রায়।

ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান এবং সদস্য বিচারপতি মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারক মোঃ শাহিনুর ইসলাম এ রায় ঘোষণা করেন। ১৩২ পৃষ্ঠার রায় থেকে  ৩৫ পৃষ্ঠার সামারি অংশ পড়ে শোনানো হয়।
রায় ঘোষণা শেষ হওয়ার সাথে সাথে আবদুল কাদের মোল্লা দাঁড়ি বলেন, এই বিচারকরা জল্লাদের মোত রায় দিয়েছে। সরকারের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে এ রায় দেয়া হয়েছে। আমি বিশ্ব মানবতার বিবেকের বাছে বিচার প্রার্থনা করছি। মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময় আমি গ্রামের বাড়িতে ছিলাম, আমি ঢাকায় ছিলাম না।  আজ এই আদালতে আমি বিচার পেলাম না, আল্লাহর কাছে আমি শেষ বিচারের দিন বিচার পাব। 
  
ছয় অভিযোগ:
১.    পল্লব হত্যা: মিরপুর বাঙলা কলেজের ছাত্র পল্লবকে ’৭১ সালের ৫ এপ্রিল গুলি করে হত্যার অভিযোগ হয়।
২.    কবি মেহেরুননিসা হত্যা: ’৭১ সালের ২৭ মার্চ কবি মেহেরুননিসা, তাঁর মা ও দুই ভাইকে মিরপুর ৬ নম্বর সেকশনের বাসায় হত্যার অভিযোগ
৩.    সাংবাদিক খন্দকার আবু তালেব হত্যা: সাংবাদিক, আইনজীবী এবং সাহিত্যিক খন্দকার আবু তালেবকে মিরপুর ১০ নং জল্লাদখানায় নিয়ে হত্যা
৪.    ঘাটার চর এবং ভাওয়াল খান বারি হত্যাকান্ড :  ’৭১ সালের ২৫ নভেম্বর সকাল সাড়ে সাতটা থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত শতাধিক নিরস্ত্র গ্রামবাসীকে হত্যা করা হয়। এ অভিযোগ থেকে কাদের মোল্লাকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে।  
৫.    আলুবদি গনহত্যা : ’৭১ সালের ২৪ এপ্রিল পাকিস্তানি সেনাদের একটি হেলিকপ্টার মিরপুরের আলবপদি গ্রামের পূর্ব দিকে নামে। সেখানে এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়ে ৩৪৪ জনের বেশি মানুষ হত্যা করা হয়।

৬.    হযরত আলী হত্যা: ’৭১ সালের ২৬ মার্চ সন্ধ্যা ৬টায় মিরপুরের ১২ নম্বর সেক্টরের ৫ নম্বর কালাপানি লেনের হযরত আলীকে বাসা থেকে ধরে নিয়ে হত্যা করা হয়। একই সঙ্গে তাঁর স্ত্রী আমিনা এবং তিন মেয়ে  খাদিজা ও তাসলিমা, আমিনা, দুই বছরের ছেলে বাবুকে হত্যা।  দুই মেয়েকে ধর্ষণ।  করা হয়।

১,২ এবং ৩ নং অভিযোগে ১৫ বছর করে এবং ৫ ও ৬ নং অভিযোগে যাবজ্জীবন এবং ৪ নং অভিযোগ থেকে খালাস দেয়া হয় ।


মামলার বিবরণ: গত ১৭ জানুয়ারি কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে বিচার শেষ হয়। ওইদিন আদেশ দেয়া হয় যেকোন দিন রায় ঘোষনা করা হবে।

২০১২ সালে  ২৮ মে কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে ছয়টি অভিযোগের ঘটনায় চার্জ গঠন করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। ৩ জুলাই কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয়। রাষ্ট্রপক্ষের তালিকাভুক্ত  মোট ৫৬ জন সাক্ষীর মধ্যে এ মামলার দুই তদন্ত কর্মকর্তাসহ ১২ জন ট্রাইব্যুনালে এসে সাক্ষ্য দিয়েছেন।

অপর দিকে আসামী পক্ষে সাক্ষ্য দিয়েছেন ৬ জন সাক্ষী।

কাদের মোল্লার পক্ষে ঢাকা বিশ্বাবদ্যালয়ের শহীদুল্লা হলের ৪০ বছরের ইমাম হাফেজ এ আইএম লোকমান ও ৮২ বছরের বৃদ্ধ সুশীল চন্দ্র মন্ডল সাক্ষ্য দিয়ে বলেন, ’৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে সময় কাদের মোল্লা গ্রামের বাড়িতে ছিলেন।

গত ৭ মার্চ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের শুনানি শুরু হয়। এরপর প্রসিকিউশনের আবেদনে গত ১৬ এপ্রিল মামলা ট্রাইব্যুনাল-২-এ স্থানান্তর করা হয়।

২০১০ সালের ১৩ জুলাই সুপ্রিমকোর্টের প্রধান গেট থেকে কাদের মোল্লাকে একটি মামলায় পুলিশ গ্রেফতার করে। ট্রাইব্যুনালে তদন্তকারী সংস্থার এক আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ওই বছরের ২ আগষ্ট কাদের মোল্লাকে মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলায় আটক রাখার আদেশ দেয়া হয়।

মামলার আইনজীবী: কাদের মোল্লার পক্ষে আইনজীবী টিমের প্রধান ছিলেন  ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক, । সাক্ষীদের জেরা করেন অ্যাডভোকেট আবদুস সোবহান তরফদার। এ মামলায় অপর গুরুত্বপূর্ণ আইনজীবী ছিলেন অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম, অ্যাডভোকেট সাজ্জাদ আলী চৌধুরী প্রমুখ।

আবদুল কাদের মোল্লার পরিচিতি: পিতার নাম মোঃ সানাউল্লাহ মোল্লা। জন্ম তারিখ ২ ডিসেম্বর ১৯৪৮। জন্ম স্থান জরিপের ডাংগি, ইউনিয়ন- চর বিষ্ণুপুর, থানা ও উপজেলা- সদরপুর, জেলা- ফরিদপুর। ১৯৬৬ সালে ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজ থেকে আইএসসি পাশ করেন। একই কলেজ থেকে ১৯৬৮ সালে বিএসসি পাশ করেন। তিনি ১৯৬৯ সালের ডিসেম্বর মাসের শেষের দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগে এমএসসি কাসে ভর্তি হন এবং ড. মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ হলের আবাসিক ছাত্র ছিলেন।

১৯৭৪ সালে কাদের মোল্লা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইইআর (ইন্সটিটিট অব এডুকেশন এন্ড রিসার্চ) এ ডিপ্লোমা ইন এডুকেশন (সোস্যাল সাইন্স) এ ভর্তি হই। ১৯৭৫ সালে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম স্থান অধিকার করে ডিপ্লোমা ইন এডুকেশন পাশ করি। তিনি বিডিআর সেন্ট্রাল পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। উদয়ন বিদ্যালয়ে ১৯৭৪-১৯৭৫ সালে শিক্ষকতা করেন।
কাদের মোল্লা জাতীয় প্রেস কাবের সদস্য। তিনি ১৯৮২-৮৪ পর্যন্ত ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের দুই বার নির্বাচিত সহ-সভাপতি ছিলেন। ১৯৮৩ সালে ঢাকা মহানগর জামায়াতের সাধারণ সম্পাদক নিয়োজিত হন। ১৯৮৭ সাল আমি ঢাকা মহানগর জামায়াতে আমির নির্বাচিত হন। বর্তমানে তিনি দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল।