মেহেদী হাসান
ভারতের ছত্তিশগড়, ঝাড়খন্ড, বিহার, উড়িষ্যা এবং পশ্চিমবঙ্গে মাওবাদীদের সশস্ত্র বিদ্রোহ চলছে। তারা যে শুধু ভারত সরকারের উৎখাত চায় তা নয় বরং পুরো ভারত রাষ্ট্রের উচ্ছেদ চায়। ভারত ভাংতে চায়। তাদের লড়াই এতদূর এগিয়েছে যে প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং তাদেরকে ভারতের জন্য সবচেয়ে বড় অভ্যন্তরীন হুমকি বলে ঘোষনা দিয়েছেন। ভারতের অখন্ডতা রক্ষায় এবং তাদের দমনে সেনা, পুলিশ, বিএসএফ, কোবরা, স্করপিয়নসহ ভারতের সকল শসস্ত্র বাহিনীকে নিয়োজিত করা হয়েছে অপারেশন গ্রীনহার্টের অধীনে। কিন্তু কেন পাহাড়ী জনপদের বাসিন্দারা আজ ভারত রাষ্ট্রের উচ্ছেদ চায়। কেন তারা অস্ত্র হাতে তুলে নিল। কি তাদের ক্ষোভ। সেসব প্রশ্নের উত্তর জানার জন্য ভারতের প্রতিবাদী লেখিকা অরুন্ধতী রায় গভীর জঙ্গলে গিয়ে নক্সালী/মাওবাদীদের সাথে সাক্ষাৎ করেছেন, ক্যাম্পে থেকেছেন, তাদের কথা শুনেছেন-কিভাবে রাষ্ট্রযন্ত্র উন্নয়নের নামে, খনি কোম্পানী, বহুজাতিক কোম্পানীর স্বার্থে তাদের শোসন করছে, গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে পড়িয়ে ছারখার করছে, হত্যা, লুটপাট এবং নারীদের ধর্ষণ করছে বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ।
ছত্তিশগড়, ঝাড়খন্ড, বিহার, উড়িষ্যার পাহাড়ী জঙ্গলাকীর্ণ এলাকা খনিজ সম্পদে ভরপুর। খনি কোম্পানী এবং বহুজাতিক কোম্পানীগুলোর কাছে এসব এলাকা একেকটি স্বপ্নপুরী। এসব রাজ্যের আলাদা সীমান্ত থাকলেও মাওবাদীদের কাছে এ সীমান্ত রেখার কোন মূল্য নেই-যেমন বনের অন্যান্য পশুপাখি কোন সীমান্ত রেখা মানেনা। এসব রাজ্যের ৬০ হাজার বর্গ কিলোমিটার জুড়ে আজ ভারত সরকারের কোন প্রশসান করজ করেনা। সেখানে চলছে মাওবাদীদের জনতা সরকারের শাসন।
অরুন্ধতী রায়ের অভিযানমূলক এ লেখাটি দৈনিক নয়া দিগন্তের পক্ষ থেকে আমাকে অনুবাদ করতে বলা হয়েছিল এবং দৈনিক নয়া দিগন্তে তা ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছিল। সময় যতদূর মনে পড়ে ২০১০ সালের প্রথম ভাগ।
Walking with the comrades
আমার দরজার নিচ দিয়ে সিলগালা একটি খাম রেখে গেল তারা। খামের মধ্যে টাইপ করা ছোট্ট একটি নোট । ভারতের অভ্যন্তরীন নিরাপত্তার জন্য এখন সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে চিহ্ন্তি করা হয়েছে যাদের এটি তাদের নোট। এ নোট পাবার ফলে তাদের সাথে আমার সাক্ষাতের বিষয়টি নিশ্চিত হল। আমি কয়েক মাস ধরে তাদের উত্তরের অপেক্ষায় ছিলাম।
আমাকে ছত্তিশগড়ের দান্তেবড়ায় মা দান্তেশ্বরী মন্দিরে যেতে হয়েছিল। যাবার জন্য দুই দিনে চারটি সময় নির্ধারণ করা ছিল। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া, গাড়ির চাকা বারবার পাংচার হয়ে যাওয়া, অবরোধ, পরিবহন ধর্মঘট এবং খুবই খারাপ ভাগ্য এসব মাথায় নিয়ে সেখানে যেতে হয়েছিল। সিলগালা খামে আমাকে যে নোট বা চিরকুট পাঠানো হয়েছে তাতে লেখা ছিল: সাথে ক্যামেরা, কপালে পরার জন্য জন্য লাল টিকা এবং নারকেল থাকলে ভাল। মিতারের কাছে টুপি, হিন্দি আউটলূক ম্যাগাজিন এবং কলা থাকবে। পাসওয়ার্ড: নমস্কার গুরুজী।
নমস্কার গুরুজী। মিতার বা গ্রিটার নারী না পুরুষ তা ঠিক বুঝে উঠতে পারছিনা। আমি জানিনা আমার একটি গোফ লাগানো দরকার কিনা। দান্তেবড়াকে বিভিন্নভাবে বর্ণনা করা যায়। এ এক আজব শহর। এই সীমান্ত শহরটি ভারতের হৃৎপিন্ডে আঘাত হেনেছে। এটি যুদ্ধের কেন্দ্রভূমি। এ শহরের উপরিভাগ রয়েছে নিচের দিকে আর ভেতরভাগ বাইরের দিকে। এখানে পুলিশ থাকে সাদা পোশাকে আর বিদ্রোহীরা উনিফর্ম পরিহিত। জেল সুপার থাকে জেলে আর বন্দীরা থাকে বাইরে মুক্ত (দুই বছর আগে তিনশ বন্দী জেল থেকে পলায়ন করেছে)। যেসব মহিলাদের ধর্ষণ করা হয়েছে তারা থাকে পুলিশের হেফাজতে। আর ধর্ষকরা বাজারে বক্তৃতা দিয়ে বেড়ায়।
ইন্দ্রাভতীর এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত পর্যন্ত যেসব অঞ্চলে মাওবাদীদের নিয়ন্ত্রন রয়েছে তাকে পুলিশ ‘পাকিস্তান’ হিসেবে আখ্যায়িত করে। এখানে গ্রামগুলো মানুষশূন্য আর জঙ্গল মানুষভর্তি। যে শিশুদের স্কুলে যাবার কথা তারা বনে জঙ্গলে দৌড়ায়। বনের সুন্দর গ্রামগুলোর স্কুল ভবনগুলো হয বোমা মেরে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করা হয়েছে অথবা সেখানে পুলিশে ভরপুর। জঙ্গলে যে ভয়াবহ যুদ্ধের বিস্তার ঘটেছে তাতে ভারত সরকার একদিকে গর্বিত অন্যদিকে লজ্জিত। অপারেশন গ্রীন হার্টের কথা একদিকে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকার করা হয়েছে আবার অন্যদিকে অস্বীকারও করা হচ্ছে। মাওবাদীদের মোকাবেলায় পর্যাপ্ত পরিমান ফান্ড বরাদ্দ দেয়া হয়েছে এবং বিপুল সংখ্যক সেনা মোতায়েনের কাজ চলছে। যদিও এ যুদ্ধক্ষেত্র কেন্দ্রীয় ভারতের জঙ্গলে কিন্তু আমাদের সবাইকে এর জন্য মারাত্মক ফল ভোগ করতে হবে।
বনের বিদ্রোহীরা খুবই বেপরোয়া এবং প্রায় সব পথ ঘিরে আছে। এর একদিকে রয়েছে আধা সামরিক বাহিনী যাদের সথে আছে আধুনিক অস্ত্র , অর্থ, গোলাবারুদ, গণমাধ্যম এবং ভারতের উদীয়মান পরাশক্তি হয়ে ওঠার দম্ভ। অন্যদিকে এর বিপরীতে রয়েছে সাধারণ গ্রামবাসী। তাদের হাতে আছে প্রচলিত অস্ত্র। তাদেরকে উদ্ভুদ্ধ করছে মাওবাদী গেরিলারা যাদের রয়েছে সশস্ত্র বিদ্রোহের অনন্য সাধারণ ইতিহাস। মাও বিদ্রোহী এবং আধাসামরিক বাহিনী দীর্ঘদিন ধরে একে অপরের শত্রু। অতীতে তারা বহুবার পররষ্পর যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে। ৫০ এর দশকে তেলাঙ্গানায়, ৬০ এর দশকের শেষে পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, অন্ধ্রপ্রদেশের শ্রীকাকুলাম এবং পরে আবার ৮০’র দশকে অন্ধ্রপ্রদেশ, বিহার এবং মহারাষ্ট্রে তারা পরষ্পর যুদ্ধ করেছে যা এখনো চলছে। তারা একে অপরের যুদ্ধ কৌশল সম্পর্কে পরিচিত এবং কাছ থেকে তা প্রত্যক্ষ করেছে। প্রতিবারই যুদ্ধের পর মনে হয়েছে মাওবাদীরা আক্ষরিকভাবে এবং বাহ্যত নির্মূল হয়েছে। কিন্তু আসলে তারা পরাজিত হয়নি। প্রতিবারই তারা আরো সংঘবদ্ধভাবে, আরো দুঢ়ভাবে এবং অধিকতর শক্তি নিয়ে ফিরে এসেছে। আজ আবার খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ ছত্তিশগড়, ঝাড়খন্ড, উড়িষ্যা এবং পশ্চিমবঙ্গে বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়েছে। এসব অঞ্চলে লক্ষ লক্ষ ভারতীয় উপজাতি বাস করছে। আর বহুজাতিক কোম্পানীর কাছে এসব অঞ্চল একেকটি স্বপ্নপুরী।
জঙ্গলের এ যুদ্ধ মাওবাদী এবং ভারত সরকারের মধ্যে যুদ্ধ। মাওবাদীরা নির্বাচনকে একটি প্রতারণা, সংসদকে শুয়োরের খোয়াড় হিসেবে অভিহিত করে। তারা প্রকাশ্যে ভারত সরকারকে উৎখাতের ঘোষনা দিয়েছে। এটি ভুলে যাওয়াই ভাল যে, মধ্য ভারতে মাওবাদীদের শত শত বছরে প্রতিরোধ সংগ্রামের ইতিহাস রয়েছে। (তাদের এ প্রতিরোধ সংগ্রাম এখন প্রবাদে পরিণত হয়েছে। তারা যদি এটি না করত তবে তাদের পক্ষে টিকে থাকা সম্ভব হতনা)। হো, ওরাও, কোল, সাওতাল, মুন্ডা এবং গোন্ডিরা বিভিন্ন সময়ে ব্রিটিশ, জমিদার শ্রেণী এবং মহাজনদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছে। এ বিদ্রোহ অত্যন্ত নির্মমভাবে দমন করা হয়েছে। হাজার হাজার মানুষ হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু তাদের কখনোই পরাভূত করা যায়নি। এমনকি স্বাধীনতার পর ভারতে প্রথম যে বিদ্রোহের ঘটনা ঘটে তারও মূলে ছিল উপজাতীয়রা। পশ্চিমবঙ্গের নক্সালবারী গ্রামে যে বিদ্রোহ হয় তাকে মাওবাদী বলা যায়। (আন্ত বিনিময়ের ফলে পশ্চিমবঙ্গে এখন নক্সালী শব্দের স্থলে মাওবাদী ব্যবহার করা হচ্ছে। ) এরপর থেকে উপজাতীয়দের সমস্ত উত্থানের সাথে নক্সালীরা ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়ে। নক্সালী এবং মাওবাদী এখানে একাকার।
.
বংশ পরম্বরায় ধরে চলমান এই বিদ্রোহের ফলে এখানে ক্রমান্বয়ে জনগণের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে এবং ভারত সরকার তাদেরকে পরিকল্পিতভাবে কোনঠাসা এবং বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে। ১৯৫০ সালে সংসদে ভারতের সংবিধান অনুমোদিত হয় যা ভারতের গণতন্ত্রের নৈতিক ভিত্তিক। সংবিধানে ঔপনিবেশবাদের নীতি অন্তভরুক্ত করা হয়েছে এবং উপজাতীয়দের আবাসভূমির দায়িত্ব রাষ্ট্রের হাতে অর্পন করা হয়েছে। ফলে এক রাতের মাথায় সমগ্র উপজাতীয় জনগোষ্ঠী তাদের নিজভূমিতে পরবাসী বা অবৈধ নাগরিক হয়ে গেল। বনের ওপর তাদেে যে অধিকার ছিল তা থেকে তাদের বঞ্চিত করা হল। এ নীতি তাদের সমগ্র জীবন ব্যবস্থাকে বিষিয়ে তুলল। শুধু ভোটাধিকারের বিনিময়ে তাদের জীবন জীবিকার উপায় এবং মার্যাদা কেড়ে নেয়া হল।
তাদেরকে আবাসভূমি থেকে উৎখাত করে দারিদ্র্যের নিম্নখাদে ঠেলে দেয়া হল। এরপর ভারত সরকার অত্যন্ত নিষ্ঠুর উপায়ে তাদের দারিদ্র্যতাকে তাদেরই বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে শুরু করল। বাঁধ নির্মান, সেচ প্রকল্প, এবং খনিজ সম্পদ উত্তোলনের সময় প্রতিবার বিপুল সংখ্যক উপজাতীয়কে অন্যত্র সরিয়ে নেয়া হল। উপজাতীয়দের ভারতের মূল ধারায় সংযুক্ত করা এবং তাদেরকে আধুনিকতার স্বাদ পাইয়ে দেবার কথা বলে এসব করা হল। বড় বড় ড্যামের ফলে ভারতে ৩ কোটিরও বেশি মানুষ নিজ দেশেই উদ্বাস্তু হয়েছে। এর অধিকাংশই হল উপাজতীয়। ভারতের উন্নয়নের ফসল হল এই উদ্বাস্তু। তাই সরকার যখন উপজাতীয় উন্নয়ন এবং কল্যানের কথা বলে সেটি এখন একটি ভীতিজনক বিষয়।
.
সর্বশেষ সবচেয়ে উদ্বেগজনক বক্তব্য এসেছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পি চিদাম্বরামের কাছে থেকে। তিনি বলেছেন, উপজাতীয় লোকজন ‘যাদুঘর সংস্কৃতি’র মধ্যে বাস করুক তা তিনি চাননা। তিনি যখন একজন করপোরেট আইনজীবী হিসেবে খনিজ সম্পদ উত্তোলনকারী বড় বড় প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ রার জন্য তাদের হয়ে লড়াই করেছেন তখন কিন্তু তার কাছে উপজাতীয়দের ভাগ্যোন্নয়নের বিষয়টি এত গরুত্ব পায়নি। সুতরাং উপজাতীয়দের নিয়ে তার এই নতুন উদ্বেগের কারণ কি তা অনুসন্ধানের একটি ভাল বিষয় হতে পারে।
গত পাঁচ বছর বা তারও বেশি সময় ধরে ছত্তিশগড়, ঝাড়খন্ড, উড়িষ্যা এবং পশ্চিমবঙ্গেও সরকার বিভিন্ন বহুজাতিক কোম্পানীর সাথে সমঝোতা স্মারা ¯া^র করেছে। স্টিল কারখানা, লৌহ কারখানা, বিদ্যুৎ কেন্দ্র, এলুমিনিয়িাম রিফাইনারি, বাঁধ নির্মান এবং খনিজ সম্পদ উত্তোলনের জন্য বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের এসব সমঝোতা স্মারক স্বর হয়েছে গোপনে। সমঝোতা স্মারকগুলো বাস্তবে পরিণত করে অর্থ উপার্জণ করতে হলে উপজাতীয়দের সেখান থেকে উৎখাত করা জরুরি। এর ফলে চলছে এ যুদ্ধ।
যখন একটি দেশ নিজেকে গণতান্ত্রিক দাবি করে এবং তারাই আবার নিজেদের সীমান্তের মধ্যে নিজেদের নাগরিকদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে যুদ্ধ ঘোষনা করে তখন সেটি দেখতে কেমন হয়? এ প্রতিরোধযুদ্ধ কি টিকে থাকতে সম? তা কি উচিত? মাওবাদী কারা? তারা কি কেবলমাত্র জঙ্গি বিদ্রোহী যারা তাদের পুরণো চিন্তাধারা উপজাতীয়দের মধ্যে চাপিয়ে দিচ্ছে তাদেরকে উস্কে তোলার জন্য একটি নৈরাশ্যকর অভ্যুত্থানের ল্েয? অতীত অভিজ্ঞতা থেকে তারা কি শিা লাভ করেছে? সশস্ত্র যুদ্ধ কি আসলেই অগণতান্ত্রিক? রাষ্ট্রীয় বাহিনী এবং মাওবাদীদের মধ্যে ক্রসফায়ারে কেবল মাত্র সাধারণ উপজাতীয়রাই মারা পড়বে এই স্যান্ডউইচি তত্ত্ব কতটা সঠিক? মাওবাদী এবং উপজাতীয়রা কি দুটি সম্পূর্ণ পৃথক শ্রেণী? তাদের স্বার্থ কি অভিন্ন? তারা কি পরষ্পরের কাছ থেকে কিছু শিখেছে? তারা কি পরষ্পরকে পরিবির্তত করেছে? যাবার আগের দিন মা আমাকে বললেন, ‘আমি ভাবতেছিলাম এদেশে একটি বিপ্লব দরকার’
ইন্টারনেটে একটি প্রবন্ধে লেখা হয়েছে ইসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থা ভারতীয় পুলিশ বাহিনীর উচ্চ পদস্থ ৩০ জন কর্মকর্তাকে প্রশিন দিচ্ছে মাওবাদী নেতাদের পরিকল্পিতভাবে হত্যা বিষয়ে। উপর সারির মাও নেতাদের হত্যা করে তাকে মস্তকবিহীন করাই এর ল্য। এজন্য ইসরায়েল থেকে যন্ত্রপাতিও কেনা হয়েছে বলে গণমাধ্যমকর্মীদের কাছে খবর এসেছে। লেজার রেঞ্জ ফাইন্ডার, থার্মাল ইমেজিং ইকুইপমেন্ট এবং যুক্তরাষ্ট্র সেনাবাহিনীর অতি জনপ্রিয় মনুষ্যবিহীন গোয়েন্দা বিমান আনা হয়েছে মর্মে খবর রয়েছে। দরিদ্র জনসধারণের বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্য অতি যুৎসই অস্ত্র এগুলো।
.
রায়পুরা থেকে দান্তেবড় ১০ ঘন্টার পথ। মাও অধ্যূষিত বিভিন্ন এলাকা হয়ে যেতে হয়। মাওবাদী অধ্যূষিত কথাটি যেনতেন কোন অর্থে ব্যবহার করা হয়না। কোন এলাকায় ইদুর বা অন্য কোন পোকামাকড়ের উপদ্রব হলে আমরা যে অর্থে ব্যবহার করি তেমন অর্থ করা হয় মাওবাদী অধ্যূষিত এলাকার ক্ষেত্রে। রোগের উপশম করতে হবে। সেজন্য ইদুরগুলোকে মারতে হবে। মানে মাওবাদীদের অবশ্যই খতম করতে হবে। এভাবে অতি ধীর গতিতে সুন্দরভাবে গণহত্যা শব্দটি আমাদের মস্তিস্কের শব্দ ভান্ডারে প্রবেশ করেছে।
মহাসড়কের নিরাপত্তায় নিরাপত্তা বাহিনী রাস্তার উভয় পাশে বনরক্ষা নিশ্চিত করেছে। কিন্তু তারাপরও এটি ‘দাদা’ নিয়ন্ত্রিত রাজ্য। কমরেডরা হল এ দাদা। রাজপুরের বাইরে ভেন্দান্তা ক্যান্সার হাসপাতালের বিশাল একটি বিলবোর্ড চোখে পড়ে। এই ভেদান্তা কোম্পানীতে আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এক সময় চাকরি করতেন। ভেদান্তা উড়িষ্যায় বক্সাইট খনিজ উত্তোলন করছে। সেখানে তারা একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থায়ন করছে। এইভাবে ধীরে ধীরে সুন্দর আবরণে খনিজ সম্পদ উত্তোলনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের সম্পর্কে আমাদের মস্তিস্কে যে চিত্র তৈরি করছে তাহল-‘ভদ্র দৈত্য’ যে সত্যিকার অর্থে মানুষের যতœ নেয়। একে করপোরেট সোস্যাল রেসপনসিবিলিটি বলে (সিএসআর)। এ পদ্ধতি খনিজ উত্তোলনকারী কোম্পানীগুলোকে বিখ্যাত হতে সাহায্য করল এবং সাবেক মুখ্যমন্ত্রী এনটিআর তেলেগু রূপকথার মত ভাল মন্দ সব চরিত্রে একাই অভিনয় করলেন একই সিনেমায় তাৎক্ষনিকভাবে। এই সিএসআর পদ্ধতি বেপরোয়া অর্থনীতির মুখে ঠুলি পরায় আর খনি কোম্পানীগুলোকে করে শক্তিশালী । যেমন কর্ণাটকে একটি লৌহ খনিজ থেকে উত্তোলতি প্রতিটন আকরিকের জন্য সরকার ২৭ রূপী সম্মানী পায় আর খনিজ কোম্পানী পায় ৫ হাজার রূপী। বক্সাইট এবং এলুমিনিয়ামের ক্ষেত্রে এ হিসাব আরো ভয়ানক। বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের যে গান আমাদের শোনানো হচ্ছে তা আসলে এই দিনদুপুরের ডাকাতিরই গল্প। নির্বাচন, সরকার, বিচারপতি, সংবাদপত্র, টিভি চ্যানেল, এনজিও এবং সাহায্য সংস্থাকে কেনা বা টাকা দিয়ে মুখ বন্ধ রাখা এদের কাছে কোন বিষয় নয়। এখানে সেখানে দুয়েকটি ক্যান্সার হাসপাতাল দিয়ে কি হবে?
ছত্তিশগড় সরকার কর্তৃক স্বাক্ষরিত লম্বা সমঝোতা স্মারক তালিকায় ভেদান্তার নাম দেখতে আমার মনে নেই। আমার মনে হল সেখানে যদি একটি ক্যান্সার হাসপাতাল থাকে তবে নিশ্চয় কোথাও না কোথাও একটি বক্সাইট পাহাড় আছে। আমরা কানকার অতিক্রম করছি। এখানে ‘কাউন্টার টেরোরিজম এন্ড জঙ্গল ওয়ারফেয়ার কলেজ’ রয়েছে। । ব্রিগেডিয়ার বি কে পনওয়ার এ প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করছেন। তার দায়িত্ব হল এ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দুণীতিপরায়ন এবং ঢিলা পুলিশ বাহিনীকে জঙ্গলের কমান্ডো বাহিনীতে পরিণত করা। যুদ্ধ প্রশিক্ষনমূলক এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির উদ্দেশ্য সম্পর্কে প্রতিষ্ঠানের সামনের দেয়ালে পাথরে খোদাই করে লেখা রয়েছে-“গেরিলাদের সাথে গেরিলাদের মত যুদ্ধ কর” । তাদেরকে দৌড়ানো, হামাগুড়ি দিয়ে প্রবেশ এবং পাশকাটানো, চলন্ত অবস্থায় হেলিপক্টার থেকে লাফ দিয়ে পড়া এবং হেলিকপ্টারে চড়া, ঘোড়ায় চড়া, সাপ খাওয়া এবং জঙ্গলের জীবন যাত্রায় অভ্যস্ত হওয়া বিষয়ে প্রশিক্ষন দেয়া হচ্ছে এখানে। রাস্তার কুকুরকেও সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য প্রশিক্ষন দিয়ে ব্রিগেডিয়ার বেশ গর্বিত। প্রতি ছয় সপ্তায় এ প্রতিষ্ঠান থেকে ৮০০ পুলিশ গ্রাজ–য়েট লাভ করে। সমগ্র ভারতে এরকম আরো ২০ টি কলেজ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা রয়েছে। এ প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষনের ফলে পুলিশ বাহিনী ক্রমে সেনাবাহিনীতে পরিণত হচ্ছে। কাশ্মীরে পুলিশবাহিনীকে এভাবে সেনাবাহিনীতে পরিণত করা হয়েছে। উপর নিচ ভেতর বাহির সবকিছু ওলট পালট করা হয়েছে। উভয় স্থানে শত্রু হল সাধারণ মানুষ।
তখন গভীর রাত। জাগদালপুরবাসী গভীর ঘুমের কোলে। ব্যাতিক্রম শুধু রাহুলগান্ধীর কিছু সমাবেশ স্থল। তিনি মানুষকে যুব কংগ্রেসে যোগদানের জন্য উদ্বুদ্ধ করছেন। সম্প্রতি তিনি পরপর দুইবার বাস্তারে । কিন্তু এখানকার যুদ্ধ সম্পর্কে তিনি কিছুই বলেননি। রাজপুত্তুরের জন্য এ বিষয়ে নাক গলানো সম্ভবত খুব নোংরা বিষয় হবে। তার মিডিয়া ম্যানেজার নিশ্চয়ই এ বিষয়টি পায়ের তলায় রেখেছে। বাস্তবতা হল এই অঞ্চলে উপজাতীয়দের ব্যাপকভাবে ধর্ষণ, গ্রামের পর গ্রাম মানুষের বাড়িঘর জালিয়ে দেয়া, হত্যা, লুটপাট, লক্ষ লক্ষ মানুষকে বসতভিটা থেকে বিতাড়নের জন্য দায়ী হল সরকারী পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠা ভয়ঙ্কর বাহিনী ‘সালওয়া জুদুম’। এর নেতৃত্বে রয়েছে কংগ্রেস এমপি মহেন্দ্র কর্মা।
আমি বেশ ভাল সময়ে মা দান্তেশ্বরী মন্দিরে পৌছলাম । আমার সাথে ক্যামেরা, ছোট একটা নারকেল এবং কপালে লাল পাউডারের লাল টিকা ছিল। আমি ভাবছি কেউ হয়ত আমাকে পর্যবেন করছে এবং আমার এ অবস্থা দেখে হাসছে। এক মিনিটের মধ্যে এক যুবক আমার কাছে আসল। তার মাথয় একটি ক্যাপ এবং পেছনে স্কুলব্যাগ। তার নখে সস্তা লাল নেলপলিশ। তার কাছে হিন্দী আউটলুক ম্যাগাজিন বা কলা ছিলনা। সে আমাকে জিজ্ঞেস করল আপনি কি ভেতরে যাচ্ছেন? আমি বললা না। তারপর তাদের দেয়া পাসওয়ার্ড় ‘নমস্কার গুরুজী’ বললাম। আমি বুঝতে পারছিনা আর কি কি বলব। সে পকেট থেকে একটি ভেজা নোট বের করে আমাকে দিল। তাতে লেখা আছে, “আউটলুক পাওয়া যায়নি”।
এবং কলা?
আমি খেয়ে ফেলেছি। আমার খুধা পেয়েছিল।
সে আসলেই নিরাপত্তার জন্য একটা হুমকি ।
তার পেছনের ঝুলানো ব্যাগে লেখা রয়েছে ‘চারলি ব্রাউন- নট ইউর অর্ডিনারি ব্লকহেড’। সে জানাল তার নাম মংটু। আমি খুব শীঘ্রই জানতে পারলাম দান্দাকারানিয়া নামক যে বনে আমি প্রবেশ করতে যাচ্ছি সেটি লোকে ভরপুর এবং তাদের প্রত্যেকের অনেক নাম এবং বিভিন্ন ধরণের পরিচয় আছে। নিজের মধ্যে নিজে আটকে না থাকা, বেশ ভালই লাগছে কিছুনের জন্য অন্য নাম নিয়ে অন্য কেউ হয়ে যাওয়া।
আমরা বাসস্ট্যান্ডের দিকে হাটতে লাগলাম। মন্দির থেকে এটি মাত্র কয়েক মিনিট দূরে। বাসস্ট্যান্ড ইতোমধ্যে লোকজনে ভরে গেছে। সবকিছু বেশ দ্রুত ঘটল। মটরসাইকেলে সেখানে দু’জন লোক ছিল। কোন কথাবার্ত হলনা। শুধুমাত্র চিনতে পারার একটা ভাব বিনিময় হল। আমরা কোথায় যাচ্ছি সে সম্পর্কে আমার কোন ধারণা নেই। আমরা এসপির বাসা অতিক্রম করলাম। আমি তার বাসায় আগে একবার এসেছিলাম। ফলে তার বাসা চিনতে পারলাম। তিনি একজন ভদ্র লোক। আমাকে বলেছিলেন, “দেখ মা, আমি খোলাখুলিভাবে বলছি, এ সমস্যার সমাধান আমাদের পুলিশ বা সেনাবাহিনী দিয়ে করা সম্ভব নয়। উপজাতীয়দের নিয়ে সমস্যা হল তারা লোভ জিনিসটা বোঝেনা। যাতন পর্যন্ত তাদেরকে লোভী বানানো না যাচ্ছে ততন পর্যন্ত আমাদের কোন আশা নেই। আমি আমার বসকে বললাম ফোর্স সরিয়ে নিয়ে তার বদলে প্রত্যেক ঘরে ঘরে একটা টেলিভিশন দেন । দেখবেন সব আপনা আপনি ঠিক হয়ে যাবে।”
আমরা শহরের বাইরে চলে এলাম। কোন পথে আসলাম তার কোন চিহ্ন রাখা হলনা। তিন ঘন্টা লাগল এ দীর্ঘ পথ শেষ করতে । হঠাৎ করে আমাদের পথ একটি অপরিচিত জনশূন্য রাস্তায় শেষ হল। রাস্তার দুই পাশে বন। মংটু নামল। আমিও নামলাম। মটরসাইকেলটি ওখানে পড়ে থাকল। আমি আমার ব্যাগ তুলে নিলাম এবং জঙ্গলে ভারতের অভ্যন্তরীন নিরাপত্তার জন্য এই ুদে হুমকীকারীকে অনুসরন করলাম। দিনটি ছিল সুন্দর। বনপথে যেন সোনার কার্পেট বিছানো।
অল্প সময়ের মধ্যে আমরা একটি চওড়া নদীর সাদা বালুতীরে পৌছলাম। বিশাল বালু তীর। মাঝখানে পানির ধারা। গভীরতা পায়ের গোড়ালী পর্যন্ত। সহজে হেটে নদী পার হওয়া যায়। পার হলে ‘পাকিস্তান’ (পুলিশের ভাষায়)। নদী পার হতে হতে আমার সেই এসপির কথা মনে পড়ল। তিনি বলেছিলেন, “ঐ ওখানে আমরা ছেলেরা গুলি করেছিল ওদের হত্যার জন্য।’ আমি আমাদেরকে একজন পুলিশের বন্দুকের সীমার মধ্যে দেখতে পেলাম। কিন্তু আমি মংটুকে সম্পূর্ণ নিরুদ্বিগ্ন দেখছি। আমি তার কাছ থেকে সঙ্কেত নিলাম।
নদীর অপরপারে আমাদের জন্য চান্দু অপো করছিল। তার হালকা সবুজ জামায় লেখা রয়েছে ‘হরলিক্স’! সে ভারতের নিরাপত্তার জন্য আরেকটু বড় হুমকী। তার বয়স হতে পারে ২০। তার হাসি অসাধারণ। তার একটি সাইকেল আছে। একটি পটে গরম পানি এবং আমার জন্য অনেকগুলো গ্লকোস বিস্কুটের প্যাকেট এনেছে পার্টি অফিস থেকে। আমরা একটু থেমে আবার হাটা শুরু করলাম। রাস্তার অবস্থা সাইকেল চালাবার উপযুক্ত নয়। আমরা খাড়া পাহাড়ে উঠলাম, পাথুরে পথে নামলাম বেশ ঝুকি নিয়ে। চান্দু যখন সাইকেল চালাতে পারতনা তখন সে তা কাধে নিত। এটা তার কাছে কোন বিষয়ই নয় বলে মনে হল। আমি রহস্যজনক এই গ্রামের ছেলেদের চেহারা সম্পর্কে ক্রমে অবাক হতে লাগলাম। সে এলএমজি ছাড়া অন্য সব ধরণের অস্ত্র ব্যবহার করতে পারে। সে বেশ আনন্দের সাথে এটি জানাল। আমাদের পথ ভিন্ন হবার আগ পর্যন্ত তিনজন লোক যাদের মাথায় পাগড়িতে ফুল রয়েছে তারা আমাদের সাথে আধা ঘন্টা পর্যন্ত হাটল। সূর্যাস্তের সময় তাদের কাঁধের ব্যাগ দেখা যেতে শুরু করল। এগুলাতে মুরগী রয়েছে। বাজারে বিক্রির জন্য নিয়েছিল কিন্তু বিক্রি করতে পারেনি।
চান্দু মনে হয় অন্ধকারে দেখতে পায়। আমাকে টর্চ লাইট ব্যবহার করতে হল। ঝিঝিপোকাগুলো তীব্রস্বরে ডাকতে শুরু করল। আমি রাতের আকাশে তাকাতে চাইলাম। কিন্তু সাহস করলামনা। আমাকে খুবই মনোযোগ দিয়ে হাটতে হচ্ছিল।
কুকুরের শব্দ পেলাম। কিন্তু তারা কত দূরে তা বুঝতে পারলামনা। সমতল ভূমি শেষ হল। আমি একবার আকাশের দিকে তাকিয়ে অবাক হলাম। আমার মনে হল আমাদের পথ শেষ। চান্দু বলল শীঘ্রই শেষ হচ্ছে। এক ঘন্টার বেশি লাগল। বিশাল বিশাল গাছ দেখতে পেলাম। আমরা পৌছলাম।
গ্রামটি বেশ বড় মনে হল। ঘরগুলো দূরে দূরে। যে ঘরে আমরা ঢুকলাম তা বেশ সুন্দর। কিছু লোক আগুনের চারপাশে বসে আছে। ঘরের বাইরে অন্ধকারের মধ্যে আরো বেশি লোক রয়েছে। তারা কত তা আমি জানিনা। চারদিকে গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। লাল সালাম কমরেড বলে আমি সম্ভোধন করলাম। আমি বেশ কান্ত সে কথা জানালাম। ঘরের মহিলা আমাকে ভেতরে ডেকে নিয়ে লাল ভাত এবং সিম দিয়ে রান্না করা মরগীর তরকারি দিল। বেশ চমৎকার। তার ঘুমন্ত বাচ্চাটার পাশে আমি বসলাম।
খাবার পর আমি আমার ঘুমানোর ব্যগ খুললাম। কেউ একজন রেডিও চালু করল। বিবিসি হিন্দি সার্ভিস। পরিবেশ ধ্বংস এবং ডংগ্রিয়া কোন্ধ উপজাতীয়দের অধিকার লংঘনের কারণে ইংল্যান্ডের চার্চ ভেদান্তার নিয়ামগিরি প্রজেক্ট থেকে ফান্ড প্রত্যাহার করে নিয়েছে। এরপর আর কি খবর বলছে তা আমার মনে নেই। আমি ঘুমিয়ে পড়লাম।
আমরা ৫টায় উঠলাম। ছয়টায় রওয়ানা দিলাম। দুই ঘন্টা পর আমরা আরেকটি নদী পার হলাম। চমৎকার কিছু গ্রাম আমরা অতিক্রম করলাম। প্রত্যেক গ্রামে রয়েছে তেতুল গাছের পরিবার। ১১টা নাগাদ সূর্য অনেক উপরে উঠে গেল এবং হাটা ক্রমে কান্তিকর হয়ে উঠল। আমরা একটি গ্রামে থামলাম দুপুরের খাবারের জন্য। চান্দুকে মনে হল সে এ পরিবারের লোকজনকে চেনে। সুন্দরী একটি যুবতী চান্দুর সাথে ছিনালী করল। চান্দু কিছুটা লজ্জিত মনে হল। হয়ত আমি আছি সেজন্য। লাল ভাতের সাথে মুশুর ডাল দিয়ে কাচা পেপে দিয়ে লাঞ্চ হল। সাথে লাল গুড়া মরিচ। পুনরায় রওয়ানা দেয়ার জন্য আমরা সূর্যের তাপ কিছুটা কমার অপো করলাম। একটু ঘূমিয়ে নিলাম। সবকিছু বেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। নিচু মাটির উঠানে একটি কাল মুরগী হাটাহাটি করছে। বাশের গ্রিড দিয়ে খড়ের চালা অত্যন্ত মজবুত করা হয়েছে। পাশে একটি ঘাষের ঝারু, দুটি ড্রাম, ভাঙ্গা ছাতা, টিনের কার্ডবোর্ড রয়েছে। কিছু একটা আমার দৃষ্টি আকর্ষন করল। আমার চষমা দরকার। কার্ডবোর্ডে লেখা রয়েছে “ওফবধষ চড়বিৎ ৯০ ঐরময ঊহবৎমু ঊসঁষংরড়হ ঊীঢ়ষড়ংরাব (ঈষধংং-২) ঝউ ঈঅঞ তত.
দুইটার দিকে আমরা আবার হাটা শুরু করলাম। গ্রামে আমরা একজন দিদি কমরেরেডর সাথে দেখা করতে যাচ্ছি। আমরা যখন গ্রামে পৌছলালম তখন দিদি সেখানে ছিলনা। সে কোথায় আছে তাও কেউ জানেনা। চান্দুকে প্রথমবার একটু উদ্বিগ্ন দেখলাম। গ্রামের একটু বাইরে নির্জন একটা স্কুল ভবনের পাশে আমরা বসলাম। সব সরকার কেন গ্রামে এ ধরণের পাকা ভবন বানায় যার জানালার কপাট, দরজা স্টিলের? দরজাগুলো ভাজ করা যায়। গ্রামের ঘরগুলো যেমন মাটি এবং ছনের সেরকম নয় কেন স্কুলঘরগুলো? কারণ এগুলো আসলে একই সাথে একেকটি বাঙ্কার। চান্দু বলল স্কুলগুলো এরকম। স্কুলের ভেতরে বসে চারদিকে গুলি করা যায়। স্কুলে কোন শিক নেই। তারা সবাই পালিয়েছে। পালিয়েছে না তোমরা তাদের তাড়িয়েছ?
না , আমরা শুধু পুলিশ তাড়াই।
শিকরা যখন ঘরে বসে বসে বেতন পাচ্ছে তখন এই জঙ্গলের মধ্যে তারা কেনই বা আসবে । ভাল যুক্তি।
চান্দু জানাল এটা তাদের নতুন এলাকা। প্রায় ২০ জন তরুণ তরুণী আসল। তাদের কেউ টিনেজ এবং কেউ টিনেজ পার করে ২০ এ পা দিয়েছে। চান্দু বলল এটা গ্রামভিত্তিক গেরিলা বাহিনী । মাওবাদী গেরিলা বাহিনীর সর্বনিম্ন স্তর। এদের মত কাউকে আমি আগে দেখিনি। তারা সারি এবং লুঙ্গী পরা। কারো কারো জলপাই রংয়ের পোশাক জীর্ণ এবং বিবর্ণ। ছেলেরা অলঙ্কার পরেছে। মাথায় হ্যাট। প্রত্যেকের হাতে রাইফেল। কারো কারো হাতে চাকু, কুড়াল এবং ধনুক। একজনের হাতে তিনফুট লম্বা জিআই পাইপের একটি বিশেষ ধরণের গানপাউডার ভর্তি একটি মর্টার । সে ফায়ার করার জন্য প্রস্তুত। বিকট শব্দ হল। কিন্তু মাত্র একবার ব্যবহার করা যায় এটি। এটি পুলিশকে আতঙ্কিত করার জন্য ভাল কাজ দেয়। বলে সে হাসল। যুদ্ধ তাদের একনম্বর বিষয় বলে মনে হলনা। এর কারণ হতে পারে সরকারি মিলিশিয়া বাহিনী সালওয়া জুদুমের আওতা থেকে তারা বেশ দূরে আছে। গ্রামের কিছু বাড়িতে তারা বেড়া নির্মান করতে সাহায্য করল যাতে ছাগলগুলোকে তে থেকে নিবারণ করা যায়। তারা বেশ আনন্দ কৌতুকের মধ্যে আছে এবং তাদের মধ্যে অনেক কৌতূহল দেখলাম। মেয়েগুলোও বেশ আস্থাবান এবং ছেলেদের সাথে খাপ খাইয়ে নিয়েছে। এজাতীয় বিষয়ে আমার একটি অনুভূতি আছে এবং আমি অভিভুত।
তাদের কাজ হল ৪/৫টি করে গ্রাম পাহারা দেয়া. রা করা এবং তাদের যাবতীয় কাজে সাহায্য করা। তারা মাঠে কাজ করে, কুয়া পরিষ্কার করে, ঘর পুননির্মানে সহায়তা করে।
দিদির এখনো কোন দেখা নেই। অপো করা ছাড়া কিছু করার নেই। রাতের খাবারের পর কোন কথা না বলে সবাই লাইন ধরল। আমরা চলতে শুরু করলাম। সবকিছু আমাদের সাথে চলছে। চাল, শাকসব্জি, হাড়ি পাতিল। আমরা স্কুল কম্পাউন্ড ছেড়ে বনের মধ্যে লাইন ধরে হাটা শুরু করলাম। আধা ঘন্টারও কম সময়ে একটা উন্মুক্ত জায়গায় আসলাম রাত যাপনের জন্য। এখানে কোন কিছুর সাড়া শব্দ নেই। সবাই নিল রংয়ের প্লাস্টিকের বিছানা বিছিয়ে নিল। এটি সবসময় সাথে থাকে। এটি ছাড়া বিল্পব হয়না। চান্দু এবং মংটু একটাতে শোয়ার ব্যবস্থা করল এবং আমার জন্য একটা বিছানা করল। তারা আমার জন্য সবচেয়ে ভাল জায়গাটা বাছাই করল। চান্দু বলল সে দিদিকে খবর পাঠিয়েছে। যদি সে খবর পায় তবে খুব সকালে সে এখানে আসবে।
এরকম একটি সুন্দর রুমে আমি অনেক দিন ঘুমাইনি। হাজার তারকা হোটেলের এটি আমার ব্যক্তিগত রুম। আমার চারপাশে নতুন এই সুন্দর ছেলে মেয়েগুলো তাদের অস্ত্র শস্ত্র নিয়ে আছে। তারা সবাই মাওবাদী । তারা কি সবাই মরতে যাচ্ছে? জঙ্গল যুদ্ধের প্রশিন কলেজটি কি তাদের মারার জন করা হয়েছে? হেলিকপ্টার গানশিপ, থার্মাল ইমেজ এং লেজার রেঞ্জ ফাইন্ডার সব কি তাদের বধ করার জন্য?
তারা কেন অবশ্যই মরবে? কিসের জন্য? শুধুমাত্র খনির জন্য? উড়িষ্যার কিওনঝারে উন্মুক্ত পদ্ধতির লৌহখনি সফরের কথা আমার মনে আছে। সেখানে একসময় বন ছিল। এবং এরকম ছেলে মেয়েরা ছিল। এখন সে জায়গাটি একটি লাল দগদগে ঘায়ের মত। লাল ধুলোয় আপনার নাসারন্দ্র এবং ফুসফুস ভরে যাবে। পানি লাল, বাতাস লাল, তাদের ফুসফুস এবং চুলও লাল। সারারাত সারাদিন গ্রামের মধ্য দিয়ে হাজার হাজার ট্রাক একটির পেছনে আরেকটি লাইন ধরে লেগে লেগে আসছে আর আকরিক ভর্তি করে নিয়ে যাচ্ছে। আকরিক প্যারাদ্বীপ বন্দরে নিয়ে যাচ্ছে। সেখান থেকে যাবে চীনে। সেখানে এগুলো গাড়ি, ধোয়া এবং রাতারাতি এক রাতের মধ্যে নতুন শহরের জন্ম দেবে। অর্থনীতির এমন প্রবৃদ্ধি এনে দেবে যাতে অর্থনীতিবিদরা বিস্ময়ে রুদ্ধশ্বাস হয়ে যাবে। আর এগুলো দিয়ে তৈরি হবে যুদ্ধের জন্য অস্ত্র।
গার্ড ছাড়া সবাই ঘুমাচ্ছে। প্রতি দেড় ঘন্টা পরপর একজন করে গার্ড বদল হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত আমি আকাশের তারার দিকে নজর ফেরাতে পারলাম। আমি যখন মিনাচল নদীর তীরে বেড়ে উঠছিলাম তখন এ ঝিঝি পোকার শব্দের সাথে অভ্যস্ত ছিলাম। সন্ধ্যার সময় তাদের গান শুরু হত-তারাদের জেগে ওঠার গান। এখানে যে আমার এত ভাল লাগছে তা ভেবে আমি অবাক হচ্ছি। আজ রাতে আমার কি হওয়া উচিত? কমরেড রাহেল? দিদি সম্ভবত আগামীকাল আসবে।
তারা বিকালে আসল। আমি তাদেরকে দূর থেকে দেখতে পেলাম। তারা প্রায় ১৫ জন। সবাই সবুজ জলাপাই রংয়ের ইউনিফর্ম পরা। আমাদের দিকে দৌড়াচ্ছে। তারা যে পথে দৌড়ে আসছে দূর থেকেই আমি তাদের দেখে বুঝতে পারলাম তারা বড় বড় অভিযান পরিচালনা করে। দি পিপলস লিবারেশন গেরিলা আর্মি (পিএলজিএ)। এদের জন্যই সরকার থার্মাল ইমেজ, লেজার-গাইডেড রাইফেলস আনছে এবং এদের মোকাবেলায় জঙ্গল যুদ্ধ প্রশিন কলেজ খুলেছে।
তারা মারাত্মক ধরনের রাইফেল বহন করছে- ওঘঝঅঝ, ঝখজ । দু’জনের কাছে একে-৪৭। এ দলের নেতা কমরেড মাধব। নয় বছর বয়স থেকে সে এ দলের সাথে আছে। তাদের বাড়ি অন্ধ্র প্রদেশের ওয়ারাঙ্গলে। দেরি হওয়ায় সে খুবই দু:খ প্রকাশ করল। সে বারবার বলল যোগাযোগে একটা গ্যাপ হয়ে গেছে যা সাধারণত হয়না। আমার প্রথম রাতেই প্রধান ক্যাম্পে যাবার কথা ছিল। আমরা আপনাকে অনেন অপো করিয়ে রেখেছি। আপনাকে অনেক হাটতে হয়েছে। আমরা যখন সংবাদ পেলাম যে আপনি এখানে তখন আমরা সারা পথ দৌড়ালাম। আমি বললাম কোন সমস্যা নেই। আমি হাটতে এবং শুনতেই এসেছি। সে জানাল তাকে দ্রুত যেতে হবে কারণ ক্যাম্পে লোকজন অপো করছে এবং তারা উদ্বিগ্ন।
ক্যাম্প এখান থেকে কয়েক ঘন্টার পথ। আমরা যখন পৌছলাম তখন অন্ধকার হয়ে গেল। কয়েক স্তরের নিরাপত্তা রী ক্যাম্প পাহারা দিচ্ছে। দুই সারিতে কয়েকশ কমরেড হবে। প্রত্যেকের হাতে অস্ত্র। এবং প্রত্যেকের মুখে হাসি। তারা গাইতে শুরু করল। ‘লাল লাল সালাম। লাল লাল সালাম। যারা আসছে এখানে তাদের।’ বনফুল বা কোন নদী সম্পর্কে যেন এ লোকগান। গানের সাথে সাথে হ্যান্ডশেক এবং অভ্যর্থনা চলল। প্রত্যেকে প্রত্যেককের সাথে কুশল বিনিময় করল।
প্রায় ১৫ বর্গফুটের একটি প্লাস্টিকের পাটি বিছানো হল। ক্যাম্পের কোন চিহ্ন নেই। একটা রুমে প্লাস্টিকের চালা আছে। এটা আজ রাতের জন্য আমার রুম। হয় এটা আমার হাটার পুরস্কার অথবা সামনে আরো কিছ এরকম শ্রমসাধ্য কাজ আছে তার অগ্রিম পুরষ্কার। অথবা হতে পারে উভয়টি। প্রথমবার আমার মাথার উপর ছাদ পেলাম। রাতের খাবার পর আমি কমরেড নরমদার সাথে দেখা করলাম। তিনি ক্রান্তিকারি আদিবাসী মহিলা সংগঠন (কামস) এর দায়িত্বে আছেন। তার মাথার দাম ঘোষনা করা হয়েছে। আরো যাদের সাথে দেখা হল তারা হলেন কমরেড সারোজা-তিনি তার এসএলআরের সমান লম্বা। কমরেড মাসী ( গোন্ডিতে মাসী মানে কালো মেয়ে) তারও মাথার দাম ঘোষনা করা হয়েছে। কমরেড রুপী-প্রযুক্তির যাদুকর, কমরেড রাজু-আমি যে পথ দিয়ে হেটেছি সেই এলাকার দায়িত্ব তার এবং কমরেড ভেনু (তাকে মুরালী, সনু, সুশীল যে নামে খুসী ডাকা যায়) । ভেনুই সবচেয়ে সিনিয়র এদের মধ্যে। সে হয়ত কেন্দ্রীয় কমিটিতে আছে। অথবা পলিটব্যুরো হবে। আমাকে বলা হয়নি। আমিও জিজ্ঞেস করিনি। আমরা গোন্ডি, হালবি, তেলেগু, পাঞ্জাবী এবং মালয়লাম ভাষায় কথা বল্লাম। শুধু মাসী ইংরেজি বলেছে। (সুতরাং আমরা সবাই হিন্দিতে কথা বলি) কমরেড মাসী লম্বা, শান্ত এবং মনে হল আমাদের আলাপচারিতায় প্রবেশ করতে তাকে যন্ত্রনার একটি পর্যায় অতিক্রম করতে হয়েছে। কিন্তু সে আমাকে যেভাবে জড়িয়ে ধরেছে তাতে আমি বুঝতে পেরেছি সে একজন ভাল পাঠক এবং জঙ্গলে থাকার কারণে সে পড়াশুনা থেকে বঞ্চিত। সে পরে আমাকে তার সম্পর্কে বলবে। যখন সে আমাকে তার সম্পর্কে বলার উপযুক্ত মনে করবে।
খারাপ খবর আসল। একজন পত্রবাহক বিস্কুট নিয়ে আসল। হাতে লেখা নোট, ভাজ করা এবং পিনআপ করা। এ জাতীয় এক ব্যাগ নোট দেখলাশ। যেন চিপস। সব জায়গা থেকে আসা খবর। অংনার গ্রামে পুলিশ পাঁচ জনকে হত্যা করেছে। তাদের মধ্যে চারজন গেরিলা এবং একজন সাধারণ গ্রামবাসী। সান্তুু পোট্টাই (২৫), ফুলো ভাড্ডি (২২), রামোলি ভাড্ডি (২০) দালসাই কোরাম (২২)। এরা হতে পারত সেইসব শিশু আমি গত রাতে হাজার তারকা হোটেলে যাদের সাথে রাত কাটিয়েছি ।
এরপর আসল ভাল খবর। মোটা এক যুবকের সাথে ছোট একটি দল। তাকেও খুব কান্ত দেখাচ্ছিল। কিন্তু তারা নতুন ধরণের লোক। সকলে তাদের প্রশংসা করল এবং মোটা যুবকের স্বাস্থ্য নিয়ে নান মন্তব্য করল। তাকে লাজুক এবং খুসী মনে হল। সে একজন ডাক্তার। সে কমরেডদের সাথে বনে কাজ করতে এসেছে এবং তাদের সাথেই থাকে। দান্দাকারানিয়ায় বহু বছর আগে সর্বশেষ একজন ডাক্তার এসেছিল।
বাম চরমপন্থা রয়েছে এমন রাজ্যগুলোর মুখ্যমন্ত্রীদের সাথে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বৈঠকের খবর প্রচারিত হল রেডিওতে। ঝাড়খন্ড এবং বিহারের মূখ্যমন্ত্রীদ্বয় সভায় যোগদান করেণনি। খবর শুনে রেডিওর পাশে বসা সবাই হাসল।
.
আমাকে কমরেড কমলার সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়া হল। আমাকে বল হল কমলাকে না জাগিয়ে আমার বিছানা থেকে এমনকি ৫ ফিট দূরেও যাওয়া যাবেনা। কারণ অন্ধকারে সন্দেহের বসে কেউ কোন বিপদ ঘটিয়ে দিতে পারে। আমি তাকে জাগায়নি। সোজা হয়ে গাছের গুড়ির মত ঘুমিয়ে ছিলাম। সকালে কমলা আমাকে একটি পলিথিন ব্যাগ দিল যার এক পাশ কাটা। এটি এ্যবিস গোল্ড রিফাইন্ড সয়াবিন তেলের প্যাকেট। এখন আমার পানি খাওয়ার মগ। বিপ্লবীদের কারনে রাস্তার কোন কিছুই নষ্ট হয়না।
(্এমননিক এখন আমি সারা দিন সবসময় কমলার কথা ভাবি। তার বয়স ১৭। তার কোমরে ঘরে তৈরি পিস্তল। আর ছেলেগুলো? কি তাদের হাসি! কিন্তু পুলিশ যদি তকে পায় তবে তারা তাকে হত্য করবে। প্রথমে তাকে হয়ত ধর্ষন করবে। এ ধর্ষণ । তাকে ধর্ষণ এবং হত্যা বিষয়ে কেউ কোন প্রশ্ন করবেনা কারণ সে হল ভারতের নিরাপত্তার জন্য অভ্যন্তরীন হুমকী। )
সকালের খাবারের পর কমরেড ভেনু বিছানায় পা ছড়িয়ে আমার জন্য অপো করছিল। আমি ইতিহাসের একটি পাঠ নিতে যাচ্ছি। অথবা আরো স্পষ্ট করে বললে দান্দাকারানিয়ার জঙ্গলের গত ৩০ বছরের ইতিহাস যা আজকের এ যুদ্ধের রুপ ধারণ করেছে। আমি এখন যে ইতিহাস শুনব তা অবশ্যই তারা তাদের মত করে বা দলীয়ভাবে বলবে যা এক পাকি হবে। কোন ইতিহাস আসলে এরুপ নয়? মিথ্যা বলে উড়িয়ে না দিয়ে গোপন ইতিহাসকে জনসম্মুখে আনতে হবে যদি তাকে মোকাবেলা করতে হয়, যুক্তি দিয়ে খন্ডন করতে হয়।
কমরেড ভেনুর চরিত্রে একটা শান্ত এবং প্রশান্তির ছাপ আছে। আজ সকালে সে নিরবিচ্ছিন্নভাবে কয়েক ঘন্টা কথা বলল। কমরেড ভেনু হল একজন ছোট স্টোর ম্যানেজারের মত। যার কাছে বিশাল একটি চাবির গুচ্ছ আছে। একেকটি চাবি দিয়ে সে একেকটি লকার খুলতে পারে যা বিভিন্ন কাহিনী এবং আরো অনেক ঘটনায় পরিপূর্ণ।
আজ থেকে ৩০ বছর আগে ১৯৮০ সালের জুন মাসে কমরেড ভেনু অন্য সাতজনের সাতে অন্ধ্র প্রদেশ থেকে গোদাবারি অত্রিতম করে দান্দাকারনিয়ার (ডিকে) জঙ্গলে প্রবেশ করে। সে মূল ৪১ জনের একজন। তারা পিপলস ওয়ার গ্র“পের (চডএ) । এটি কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া (মার্ক্সিস্ট-লেনিনিস্ট) অথবা সিপিআই (এমএল) এর একটি উপদল-যারা মূল বা প্রকৃত নক্সালবাদী। কোন্দাপল্লী সেতারামিয়ায় ঐ বছর এপ্রিল মাসে একটি আলাদা এবং স্বতন্ত্র দল হিসেবে পিপলস ওয়ার গ্র“পের নাম আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষনা করা হয়। পিপলস ওয়ার গ্র“প একটি স্থায়ী সেনাবাহিনী এবং তাদের জন্য একটি ঘাটি স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিল। ডিকেতে এ ঘাটি স্থাপন করা হল। তারা সেখানে একটি স্কোয়াড পাঠিয়ে গেরিলা জোন গঠনের কাজ শুরু করল। কমিউনিস্ট পার্টিতে ঘাটিভিত্তিক স্থায়ী সেনাবাহিনী থাকবে না পিপিলস আর্মি থাকবে এটি একটি পুরনো বিতর্ক। পিপলস গ্র“পের স্থায়ী সেনাবাহিনী গঠনের বিষয়টি তারা অভিজ্ঞতার আলোকে করেছে। অন্ধ্র প্রদেশে ভূমিপতিদের সাথে তাদের সংঘাতের ফলে পুলিশ তাদের ওপর চরম নির্যাতন চালিয়েছে । নিজস্ব বাহিনী গঠন ছাড়া সেখানে তাদের পে টিকে থাকা সম্ভব নয়।
২০০৪ সালের মধ্যে পিপলস ওয়ার গ্র“প কমিউিনিস্ট পার্টির অন্যান্য গ্র“প যেমন পার্টি ইউনিট (পিইউ) এবং মাওইস্ট কমিউনিস্ট সেন্টার (এমসিসি)’র সাথে মিলে সিপিআই (এমএল) উপদলে যোগ দেয়। বিহার এবং ঝাড়খন্ডের বাইরে অধিকাংশ এলাকায় এখন তাদের কার্যক্রম চলছে। এরাই এখন মাওবাদী কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডয়া নামে পরিচিতি।
ব্রিটিশরা তাদের সাদা চামড়াসুলভ আচরণের অংশ হিসেবে দান্দাকারানিয়াকে গন্ডোয়ানা বলত। মানে হল এটি গন্ডদের ভূমি। আজ মধ্য প্রদেশ, ছত্তিশগড়, উড়িষ্যা, অন্ধ্রপ্রদেশ এবং মহারাষ্ট্রের সীমান্ত রেখা এ অঞ্চলের গভীর জঙ্গলকে বহুভাগে বিভক্ত করে টুকরো টুকরো করে দিয়ে চলে গেছে। ডিভাইএড এন্ড রুল এর পুরনো কৌশল হিসেবে হিসেবে প্রতিবাদী এসব জনপদকে পৃথক পৃথক প্রশাসনের অধীন করা হল। কিন্তু মাওবাদী এবং মাওবাদী গন্ডদের কাছে এই সীমান্ত রেখার তেমন গুরুত্ব নেই। তাদের মাথায় ভিন্ন মানচিত্র আছে এবং বনের অন্যান্য প্রাণীর মত তাদের চলার ভিন্ন পথ আছে। রাস্তা তাদের কাছে হাটাচলার বিষয় নয়। রাস্তার পাশে লুকিয়ে থেকে গোপন হামলার বিষয় তাদের কাছে। যদিও গন্ডরা এখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ তবু অন্যান্য উপজাতীয়দের ছোট ছোট বসতি এলাকা আছে। গন্ড উপজাতিরা কয়া এবং ডোরলা এ দুইভাগে বিভক্ত। অউপজাতি, বসতিস্থাপনকারী এবং ব্যবসায়ীরা বনের প্রান্তে, রাস্তা এবং বাজারের পাশে বসবাস করে।
দান্দাকারানিয়ায় পিপলস গ্র“পই যে প্রথম আসছে তা নয়। গান্ধীবাদী নামে পরিচিত বাবা আমতে বারোরায় ১৯৭৫ সালে এখানে তার আশ্রম এবং হাসপাতাল খোলেন। অবুঝমদের নির্জন গ্রামে রামকৃষ্ণ মিশন স্কুল খোলা শুরু করে। উত্তর বাস্তারে বাবা বিহারী দাস উপজাতীয়দের হিন্দু ধর্মে দিা প্রদানের জন্য খুবই জোরাল অভিযান কার্যক্রম চালায় । তার এ অভিযানের ফলে উপজাতীয়তের নিজস্ব সংস্কৃতি বিলুপ্ত হতে থাকে, নিজেদের মধ্যে ঘৃনা বিদ্ভেষ বাড়তে থাকে এবং হিন্দুত্বের আশীবার্দ-বর্ণপ্রথার বিকাশ ঘটে। প্রথমে ধর্মান্তরিত হলেন গ্রামের প্রধান এবং ভূমিপতিরা। এদের একজন হলেন মহেন্দ্র কর্মা। তিনি সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় গেরিলা বাহিনী সালওয়া জুনদুম গঠন করলেন। তিনি ধর্মান্তরিত হবার পরে রুটি উপাধি পেলেন- একটি হল দ্বিজ মানে পনর্জন্মগ্রহনকারী এবং অপরটি ব্রাক্ষ্মন। হিন্দুবাদের এই ভেজালকে বাজারের বিস্কুট, সাবান, তেলের ভ্যাজালের মতই বিবেচনা করল উপজাতীয়রা । হিন্দুবাদের এই অভিযানের ফলে গ্রামবাসীর নাম বদলে গেল সরকারি জমির রেকর্ডে। এখন তাদের দুটি নাম-একটি সরকারি নাম এবং অপরটি গ্রামে তারা যে নামে আগে পরিচিত ছিল সেটি। ভোটার তালিকায় উপজাতীয়দের নাম হিন্দু হয়ে গেল। মাসা কর্মা হয়ে গেলেন মহেন্দ্র কর্মা। যারা হিন্দু হলনা তাদের অচ্ছুত অস্পৃশ্য ঘোষনা করল। স্বাভাবিকভাবে পরে এরা মাওবাদীদের সাথে ভিড়ল।
পিপলস ওয়ার গ্র“প প্রথমে দনি বাস্তার এবং গাদচিরোলীতে কার্যক্রম শুরু করে। কমরেড ভেনু প্রথম মাসে তাদের কাজের অভিজ্ঞতার কথা বিস্তারিতভাবে বলল । গ্রামবাসীরা প্রথমে তাদের বিষয়ে সন্দিহান ছিল এবং তাদের ঘরে ঢুকতে দেয়নি। কেউ তাদের খাদ্য এমনকি পানিও খেতে দেয়নি। পুলিশ প্রচার করত তারা হল চোর। মহিলারা তাদের অলঙ্কারাদি চুলার ছাইয়ের মধ্যে লুকিয়ে রাখত। সেখানে ব্যপকভাবে পুলিশী নির্যতন শুরু হল আমাদের ওপর। ১৯৮০ সালের নভেম্বরে গাদচিরোলীতে পুলিশ একটি সামবেশে গুলি চালিয়ে আমাদের পুরো একটি বাহিনীর সবাইকে সবাইকে হত্যা করল। এটা ছিল ডিকেতে প্রথম অপ্রত্যাশিত হত্যাকান্ড। এটা আমাদের অনেক পেছনে নিয়ে গেল। কমরেডরা গোদবাড়ি এবং আদিলাবাদে ফিরে গেল কিন্তু ১৯৮১ সালে আবার ফিরে আসল তারা । উপজাতীয়রা বিড়ির জন্য যে তামাক পাতা উৎপাদন করে তার দাম বৃদ্ধির জন্য আমরা গ্রামবাসীকে উদ¢ুদ্ধ করতে শুরু করলাম। ঐ সময় ব্যবসায়ীরা ৫০ পাতার একটি বান্ডিলের জন্য তিন পয়সা দিত। তারা কখনো এজন্য কোন ধরণের আন্দোলন করেনি । দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদ আন্দোলনের প্রতি তাদের সংঘবদ্ধ করা খুবই একটি কঠিন কাজ ছিল। কিন্তু তারা শেষ পর্যন্ত সাড়া দিয়েছে এবং দাম দ্বিগুন হয়েছে। তারা ছয় পয়সা পাচ্ছে। আমাদের যাদের মধ্যে অনৈক্য ছিল তাদের মধ্যে সমঝোতার ব্যবস্থ হল এবং আমাদের পার্টি আবার ঐক্যবদ্ধ হল এ আন্দোলনের মাধ্যমে। এরপর আরো কিছু আন্দোলনের ফলে এক বান্ডিল তামাক পাতায় এখন এক রুপি পাচ্ছে গ্রামবাসী। গ্রামবাসী এখন সামান্য বেশি মূল্য পাচ্ছে কিন্তু ব্যসায়ীরা এখনো এই তামাক পাতার ব্যবসা করে কোটি কোটি রুপি আয় করছে। প্রত্যেক মৌসুমে সরকার তামাক পাতা সংগ্রহের জন্য টেন্ডার ছাড়ে এবং দেড় হাজার থেকে ৫ হাজার ব্যাগ তামাক পাতা সংগ্রহের ল্যমাতা ধরে দেয়। প্রতি ব্যাগে এক হাজার বান্ডিল থাকে। অবশ্য ব্যবসায়ীরা ল্যমাত্রার চেয়ে অনেক বেশি তামাকপাতা সংগ্রহ করে। ব্যবসায়ীরা এখন বান্ডিলের বদলে কেজি দরে পাতা কেনে এবং নানা ধরণের প্রতরণার আশ্রয় নিচ্ছে উপজাতীয়দের ঠকানোর জন্য। যেখানে একজন কৃষক কোনমতে পরবর্তী মৌসুম পর্যন্ত খেয়ে বেঁচে থাকার জন্য অর্থ পায় সেখানে একজন ছোট তামাক পাতা ব্যবসায়ী এক মৌসুমে ১৬ লাখ রুপী থেকে কোটি রুপী পর্যন্ত আয় করে।
অপোকৃত নতুন সংগঠন পিএলজিএ’র (দি পিপলস লিাবেরশন গেরিলা আর্মি) কমরেড নিলেশের আগমন এবং হাসি আমাদের কথপোকথনে ব্যাঘাত ঘটাল। সে দ্রুতগতিতে আমাদের দিকে আসতে ছিল। সে কাছে আসার পর তার হাতে একটি সবুজ পাতার লাল পিপড়ার বাসা দেখলাম। বড় বড় লাল পিপড়া তার সারা গায়ে কামড়াচ্ছে। কমররেড ভেনু আমাকে বলল আপনি কি কখনো পিপড়ার আচার খেয়েছেন? কেরালায় আমি আমার ছোটবেলায় লাল পিপড়া দেখেছি। তাদের কামড়ও খেয়েছি কিন্তা তাদের আচার খাইনি।
সালওয়া জুদুম যেসব এলাকায় কার্যক্রম পরিচালনা করে কমরেড নিলেশ সেই বিজাপুর এলাকার লোক। নিলেশের ছোট ভাই জুদুমের লুটাপাট এবং জালাও পোড়াওয়ে অংশ নিয়েছিল এবং তাকে স্পেশাল পুলিশ অফিসার (এসপিও) বানানো হয়েছে। সে তার মায়ের সাথে বাসাগুড়া ক্যাম্পে থাকে। তার বাবা তাদের সাথে থাকনো, গ্রামের বাইরে থাকে। এভাবেই পারিবারিক রক্তারক্তির সূচনা হয়। নিলেশের সাথে পওেরযখন আমি কথা বলেছি তখন তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম তার ভাই কেন সালওয়া জুদুমের সাথে যোগ দিয়েছিল। “সে খুব তরুণ ছিল। মানুষের ঘরবাড়ি জ্বালাও পোড়াও এবং লুটপাটে অংশ নেয়ার মত হিংস্র আর বন্য কাজে সে আনন্দ পেল। অনেকটা ক্রেজি হয়ে গেল এবং ভয়ানক কাজকারবার করল। তাকে গ্রামছাড়া করা হয়েছে। সে কখনো আর গ্রামে আসতে পারবেনা। আসলে তাকে ছেড়ে দেয়া হবেনা। সে এটা জানে।
আমরা আবার ইতিহাসের আলোচনায় ফিরে গেলাম। বাল্লারপুর পেপার মিলের বিরুদ্ধে আন্দোলন ছিল পরবর্তী সবচেয়ে বড় আন্দোলন। সরকার থাপারকে (৪৫) বিশাল ভতূৃকি দিয়ে দেড় লাখ টন বাঁশ সরবরারে কাজ দিল। ২০ খন্ড বাশের একটি বান্ডিলের জন্য একজন উপজাতীয় পায় ১০ পয়সা। দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রাম, ধর্মঘট এবং পেপার মিল কর্তৃপরে সাথে আলাপ আলোচানর পর ১০ পয়সার জায়গায় ৩০ পয়সা নির্ধারিত হল। উপজাতীয়দের জন্য এটা একটা বিরাট অর্জন ছিল। অন্যান্য রাজনৈতিক দল উপজাতীয়দের এসব সমস্যা সমাধানের অনেক আশ্বাস দিয়েছিল কিন্তু বাস্তবায়ন করেনি। পিপলস ওয়ার গ্র“প তা করেছে। এরপর লোকজন দলে দলে পিপলস গ্র“পে যোগ দিতে লাগল।
তামাক পাতা এবং বাঁশের এ রাজনীতি ছিল মৌসুম ভিত্তিক। কিন্তু উপজাতীয়দের স্থায়ী এবং মূল সমস্যা হল ভূমিপতি এবং বনবিভাগ। প্রত্যেক মৌসুমে বন বিভাগের কর্মকর্তারা এমনকি তাদের সবেচেয় ছোট বাবুও গ্রামে একটি দু:স্বপ্ন হিসেবে আবির্ভূত হত। গ্রামবাসীকে জমিতে চাষাবাদ, জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ, ফল সংগ্রহ এবং পশু চারণে বাঁধা দিত। তারা হাতি নিয়ে আসত উপজাতীয়দের তে এবং বীজতলা ধ্বংস করার জন্য। মানুষকে ধরে পেটানো হত, আটক করত এবং অপমান লাঞ্ছনা করত। বন বিভাগ বলত এসব লোকজন অবৈধ এবং তারা বনে বেআইনী কাজ করে। বন বিভাগ আইনের শাসন বাস্তবায়ন করছে। বন কর্মকর্তাদের এসব অঞ্চলে শাস্তিস্বরূপ বদলী করা হয়। আর এখানে এসে তারা পুরস্কার হিসেবে পায় উপজাতীয় নারীদের ভোগের সুযোগ।
জনগণকে উদ্বুদ্ধ করে এ অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার সিদ্ধান্ত নেয় আমাদের পার্টি। পার্ট পাহাড়ী জমি চাষে উপজাতীয়দের উদ্বুদ্ধ করতে লাগল। বন বিভাগ নতুন গ্রাম পুড়িয়ে দিয়ে এর প্রতিশোধ নিল। ১৯৮৬ সালে তারা বিজাপুরে জাতীয় পার্ক ঘোষনা করল। এর মানে হল ৬০টি গ্রাম উচ্ছেদ করা। ইতোমধ্যে অর্ধেক গ্রাম উচ্ছেদ হয়ে গেছে। যখন পার্কের অবকাঠামো নির্মান শুরু হল তখন পিপলস গ্র“প সেখানে হস্তপে করল এবং কাজ বন্ধ রাখতে বাধ্য করা হল। অন্য কোন গ্রাম উচ্ছেদ করতে দেয়া হলনা। কোন কোন বন কর্মকর্তাকে ধরে গাছের সাথে বেঁধে পেটাত গ্রামবাসী। দীর্ঘদিন ধরে তারা গ্রামবাসীর ওপর যে অত্যাচার করেছে এটা তার সামান্য প্রতিশোধ। এরপর বনবিভাগ সেখান থেকে পলায়ন করে। ১৯৮৬ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত পার্টি ৩ লাখ একর বনভূমি বন্টন করেছে। কমরেড ভেনু জানালেন আজ আর দান্দাকারানিয়ায় কোন ভূমিহীন কৃষক নেই।
আজকের নতুন প্রজন্মের কাছে বনবিভাগ একটি অতীত স্মৃতির বিষয়। মায়েরা তাদের শিশুদের সে গল্প শোনায়। বড়দের কাছে বন বিভাগের অত্যাচার থেকে নি®কৃতি হল প্রকৃত স্বাধীনতা। তারা এর বর্ণ এবং গন্ধ অনুভব করতে পারে। ভারতের স্বাধীনতা যা দিতে পারেনি এটি তার চেয়েও অনেক বেশি অর্থবোধক তাদের কাছে। সাধারণ মানুষ আমাদের পার্টতে আসতে লাগল যে পার্টি তাদের জন্য সংগ্রাম করেছে।
ছয় সদস্যের একটি গেরিলা বাহিনী একাজের সূচনা করেছে। তার প্রভাব আজ বনের ৬০ হাজার বর্গকিলোমিটারজুড়ে হাজার হাজার গ্রাম এবং ল ল মানুষের ওপর।
কিন্তু বন বিভাগের পলায়নের পর আসল পুলিশ। এটি ধারাবাহিক রক্তপাতের অধ্যায় সূচনা করল। পুলিশের ভূয়া এনকাউন্টার এবং আমাদের গোপন হামলা চলতে লাগল। জমি বন্টনের সাথে সেচ, চাষাবাদ, উৎপাদন বৃদ্ধির দায়িত্বের বিষয়টি আসল। এর সাথে জনসংখ্যা বৃদ্ধির সমস্যা দেখা দিল যার ফলে বন উজাড় হচ্ছিল। ফলে জনসেবামূলক কাজ ও মিলিটারী কাজ সম্পূর্ণ আলাদা করা হল।
জনতা সরকার নামে একটি বৃহৎ প্রশাসন আজ দান্দাকারানিয়া দেখাশুনা করছে । চীনা বিপ্লব এবং ভিয়েতনাম যুদ্ধ থেকে তারা এ সংঘবদ্ধ মূলনীতি গ্রহণ করেছে। সাধারণত ৫০০ থেকে ৫০০০ লোকের বাস এরকম প্রতি এলাকায় একটি করে জনতা সরকারের প্রশাসনিক ইউনিট রয়েছে। জনগণ কর্তৃক এ্ ইউনিটের নেতা নির্বাচিত হয়। প্রতি ইউনিটের ৯টি বিভাগ আছে। কৃষি, ব্যবসা-বানিজ্য, অর্থনীতি, বিচার, প্রতিরা,স্বাস্থ্য, জনসংযোগ, শিা ও সংস্কৃতি এবং বন। কয়েকটি এলাকার জনতা সরকার নিয়ে আবার একটি এরিয়া কমিটি আছে। তিনটি এরিয়া কমিটি নিয়ে একটি বিভাগ। দান্দাকারানিয়ায় ১০টি বিভাগ রয়েছে।
কমরেড ভেনু বলল আমরা বন রা করেছি। আপনি নিশ্চয়ই সরকারি প্রতিবেদনে পড়েছেন যেখানে বলা হয়েছে নক্সাল এলাকায় বনের পরিমান বেড়েছে।
নির্মম হলেও সত্য পাটিরও এ অভিযানের ফলে প্রথমে সেই গ্রামের প্রধান কর্তা ব্যক্তি, ভূমিপতি দ্বিজরাই উপকৃত হল। তারা তাদের অনুগত লোক দিয়ে ইচ্ছেমত জমি এবং বন দখল করতে লাগল। কিন্তু পরে লোকজন পার্টির কাছে অভিযোগ নিয়ে আসল। পার্টি সম বন্টনের নীতি ঘোষনা করল। প্রভাবশালী ভূমিপতিরা বিপদ টের পেল। আমাদের পার্টির প্রভাব বৃদ্ধির ফলে তাদের সেই প্রভাব খতম হল। জনগণ গ্রামের মাতবর ভূমিপতিরদের কাছে তাদের সমস্যার জন্য না গিয়ে পার্টির কাছে আসতে লাগল। পুরনো নিয়ম চ্যালেঞ্জ করা শুরু হল। আগে মৌসুমে প্রথম বৃষ্টির দিন গ্রামের যিনি প্রধান তার জমিতে লাঙ্গল দেয়া হত। এটা বন্ধা করে কৃষক এখন যার যার জমিতে চাষ শুরু করে। এখন আর মৌসুমের প্রথম ফসল বা মহুয়া তোলার জন্য গ্রাম প্রধানকে জানায়না।
মহেন্দ্র কর্মার বিষয়ে আসা যাক। সে এ গ্রামের সবচেয়ে বড় ভূমিপতি এবং একসময় কমিউনিস্ট পার্টি অব উন্ডিয়া (সিপিআই) এর সদস্য ছিল। ১৯৯০ সালে সে গ্রামের প্রভাবশালী এবং ভূমিপতিরদের নিয়ে জনসচেতনতা সৃষ্টির নামে জন জাগরণ আহবান কর্মসূচী হাতে নেয়। এর মাধ্যমে সামবেশ এবং প্রচারণা চালায়। তাদের প্রচারণা মধ্যে ছিল ৩০০ লোক নিয়ে একটি বাহিনী তৈরি করা যারা গ্রামে মেয়েদের ধর্ষন করেছে, মানুষ হত্যা করেছে এবং বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়ার কাজ করেছে। তখনকার মধ্যপ্রদেশ সরকার তখন পুলিশ দিয়ে এসবে সাহায্য করেনি। মহারাষ্ট্রের ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট একই কাজ করল। পিপলস ওয়ার গ্র“প এসবের প্রতিরোধে এগিয়ে আসল এবং কয়েকজন সন্ত্রাসী ভূমিপতিকে হত্যা করা হল। কয়েক মাসের মধ্যে জন জাগরণ উধাও হল। মহেন্দ্র কর্মা কংগ্রেসে যোগ দিয়ে ১৯৯৮ সালে আবার জনজাগরণ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করল। এবার তা আরো দ্রুতগতিতে মিলিয়ে গেল।
এরপর ২০০৫ সালের গ্রীস্মকালে ভাগ্য তার সহায়ক হল। এপ্রিলে বিজেপি সরকার ছত্তিশগড়ে দুটি স্টিল কারখানা স্থাপনের জন্য সমঝোতা স্মারক সই করল যার টার্ম সম্পূর্ণ গোপন রাখা হল। বাইলাডিলার এসার স্টিল এর সাথে সাত হাজার কোটি রুপি এবং লোহানদিগুদায় টাটা স্টিলের সাথে ১০ হাজার কোটি রুপির সমঝোতা স্মরাক স্বার হল। গত বছর একই মাসে প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং মাওবাদীদের সম্পর্কে বিখ্যাত একটি বিবৃতি দিলেন-ভারতের সবচেয়ে বড় অভ্যন্তরীন হুমকি হল মাওবাদীরা। অন্ধ্রপ্রদেশে কংগ্রেস সরকার মাওবাদীদের ধ্বংসের পরিকল্পনা করেছিল। তারা সেখানে ১৬ হাজার ক্যাডার হারায় এবং সম্পূর্ণরুপে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। প্রধানমন্ত্রীর বিবৃতির ফলে খনি কোম্পানীর শেয়ার মূল্য বেড়ে যায়। ২০০৫ সালের জুনে মহন্দ্রে কর্মা কুট্রো গ্রামে এলাকার প্রভাশালীদের নিয়ে একটি গোপন বৈঠক করল এবং সালওয়া জুদুম (শুদ্ধি অভিযান) বাহিনীর কথা গোষনা করল।
জনজাগরণের মত সালওয়া জুদুম গ্রামবাসীকে রাস্তার পাশে ক্যাম্পে সরিয়ে আনার অভিযানে নামল । এখানে থাকলে তারা পুলিশের নিয়ন্ত্রনে থাকবে এবং বনের মধ্যে জমিও ফাঁকা হবে। একে বলে কৌশলগত বসতি স্থাপন। ১৯০৫ সালে ব্রিটিশরা যখন মালায়ায় কমিউন্টিদের বিুরদ্ধে যুদ্ধরত ছিল তখন জেনারেল স্যার হ্যারল্ড ব্রিগস এ নীতির উপদেশ দেন। ভারতের আর্মির মধ্যে জন ব্রিগের এ পরিকল্পনা খুব জনপ্রিয়তা পেল। নাগাল্যান্ড, মিজোরাম, এবং তেলেঙ্গানায় এ নীতি অনুসরণ করল। ছত্তিশগড়ে বিজেপির মূখ্যমন্ত্রী রমন সিং ঘোষনা করল যারা ক্যাম্পে যাবেনা তারা মাওবাদী বলে ধরে নেয়া হবে। সুতরাং বাস্তারে যে সাধারণ গ্রামবাসী বসবাস করতে লাগল ক্যাম্পে না যাবার কারণে তারা সন্ত্রাসীর সমতুল্য হয়ে গেল।
স্টিলের মগে এক কাপ কালো চায়ের সাথে কেউ একজন আমাকে একজোড়া ইয়ারফোন এবং এমপি থ্রি প্লেয়ারের সুইচ দিল। বিজাপুরের সেসময়কার এসপি মনোহরের একটি গোপন কথপোকথনের গোপন রেকর্ডিং এটি। তিনি তার অধস্তন অফিসারদের ওয়াইরলেসে জানাচ্ছেন গ্রামবাসীকে ক্যাম্পে আনতে পারলে রাজ্য এবং কেন্দ্রীয় সরকার থেকে কি কি পুরস্কার দেয়া হবে। এরপর সে বলল যারা ক্যাম্পে আসতে অস্বীকার করবে তাদের পুড়িয়ে মারতে হবে। কোন সাংবাদিক যদি নক্সালীদের খবর সংগ্রহ করতে যায় তবে দেখামাত্র গুলি করতে হবে। এ খবর যখন প্রকাশিত হয় তখন তা আমি পড়েছিলাম এবং পুরস্কার হিসেবে ঐ এসপিকে রাষ্ট্রীয় মানবাধিকার কমিশনে বদলী করা হয়েছিল।
২০০৫ সালে ১৮ জুন সালওয়া জুদুম প্রথম আম্বেলি গ্রাম পোড়ায়। ঐ বছর জুন থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত দনি দান্তেবড়ার শত শত গ্রামবাসীর ঘরবাড়ি জালিয়ে দেয়া হল। সাথে চলল লুটপাট, ধর্ষন্ এবং হত্যা। এ ধ্বংসযজ্ঞের কেন্দ্রে ছিল বিজাপুর, ভৈরমগড়, বাইলাডিলা যেখানে এসার স্টিল মিল কারখানা হবার কথা ছিল । এটি ছিল মাওবাদীদেরর শক্ত ঘাটি। এখানে জনতা সরকার ব্যাপক উন্নয়ন কাজ করেছে। বিশুদ্ধ পানির অবকাঠামো তেরি করা হয়েছিল। সালওয়া জুদুমের আক্রমনের ল্যবস্তু ছিল মাওবাদীরা। নিমর্মভাবে শত শত লোককে হত্যা করা হল। প্রায় ৬০ হাজার মানুষকে ক্যাম্পে নেয়া হল। কেউ গেল স্বেচ্ছায়। অধিকাংশকে জোরপূর্বক সেখানে নিয়ে যাওয়া হল। মাসে দেড় হাজার রুপিতে প্রায় তিন হাজার এসপিও নিয়োগ দেয়া হল এ কাজের জন্য।
এই ভয়াবহ ক্যাম্পের জন্য নিলেশের ভাইয়ের মত আরো অসংখ্য যুবক নিজেদেরকে যাবজ্জীবন বন্দী করেছে কাটাতারের বেড়ার মধ্যে। ল ল লোক যারা ক্যাম্পে না এসে বনে আশ্রয় নিয়েছে তারা সরকারি রাডারের বাইরে। অনেকে অন্ধ্রপ্রদেশ এবং উড়িষ্যায় চলে গেল। সেখানে তারা মরিচ তোলর মৌসুমে দিনমজুর হিসেবে কাজ করে। কিন্তু ল ল লোক বনে আশ্রয় নিল এবং সেখানে তারা এখন আছে আশ্রয়হীন অবস্থায়। দিনের বেলায় মাঝে মাঝে তারা তাদের তে এবং বাড়িঘর দেখে যায়।
.
সাওলওয়া জুদুমের এই ধ্বংসলীলার মধ্যে সেখানে পুলিশ স্টেশন এবং ক্যাম্পেরও উদ্ভব হল। মাওবাদীদের কাছ থেকে দখল নেয়া এলাকায় যাতে তারা নিয়ন্ত্রন বজায় রাখতে পাওে সেজন্য ব্যাপক সংখ্যক নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করা হল । এত বড় নিরাপত্তাবাহিনীকে মাওবাদীরা হামলা করতে সাহস পাবেনা এই ধারণায় এত বিপুল সংখ্যক নিরাপত্তাবাহিনী জড়ো করা হল। এ অবস্থা দীর্ঘদিন বহাল রাখেেত পারলে ২৫ বছর ধরে মাওবাদীরা যাদের সাথে কাজ করেছে এবং আস্থা অর্জন করেছে তাদের সমর্থন হারাবে বলে তরা চিন্তা করল। কিন্তু নিরাপত্তা বেষ্টনীর কেন্দ্রস্থলে তারা আঘাত হেনে আবার ফিরে আসল।
ইরাবোরে সালওয়া জুদুম ক্যাম্পে আক্রমন করাল মাওবাদীরা । ২০ জন নিহত এবং ১৫০ জন আহত হয়। আপনি হয়ত এ খরব পড়েছেন তখন। সে খবরে প্রচার করা হয়েছিল নক্সালীদের আক্রমন থেকে রা পেতে গ্রামবাসী আশ্রয় নিয়েছে এমন একটি সরকারি রিলিফ ক্যাম্পে মাওবাদীরা আক্রমন করেছে। ২০০৬ সালের ১৩ ডিসেম্বর বাসাগুড়া রিলিফ ক্যাম্পে আক্রমন করে ৩ জন এসপিও এবং একজন পুলিশ কনস্টেবল হত্যা করা হল। এরপর তাদের জন্য সবচেয়ে ভয়াবহ দিন আসল ২০০৭ সালের ১৫ মার্চ। ১২০ জন পিএলজিএ গেরিলা বাহিনী রানী বোদিলী কানইয়া আশ্রমে আক্রমন করল। এটি একটি গালর্স হোস্টেল। এটিকে ছত্তিশগড় পুলিশ ব্যারাকে পরিণত করল। ৮০ জন পুলিশ এবং এসপিও ছিল সেখানে। আশ্রমের মেয়েরা তখনো সেখানে ছিল এবং মেয়েদেরকে পুলিশ মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার করল। পিএলজিএ গেরিলারা কম্পাউন্ডে প্রবেশ করল। যেখানে মেয়েরা বাস করত সেটি ঘেরাও করা হল। এবং পরে পুলিশ যেখানে থাকে সেখানে আক্রমন করা হল। ৫৫ জন পুলিশ এবং এসপিও নিহত হল। কোন মেয়ে আহত হয়নি। (দান্তেবড়ার সেই ভদ্র এসপি আমাকে ঐ হামলার দৃশ্য দেখিয়েছিলেন পাওয়ার পয়েন্টে। কিভাবে ঐ স্কুল ভবন উড়িয়ে দেয়া হল এবং নিহতদের ছিন্নভিন্ন লাশ পড়েছিল। সে দৃশ্য অতি ভয়াবহ ছিল। নে দেখে কোন উপায় ছিলনা। আমার প্রতিক্রিয়ায় এসপি সন্তুষ্ট মনে হয়েছিল।)
রানি বোদিতে সে আক্রমনে দেশব্যাপী মারাত্মক প্রতিক্রিয়া হয়েছিল। মানবাধিকার সংস্থাগুলো মাওবাদীদের এ আক্রমনেরই শুধু নিন্দা করেনি বরং শিা প্রতিষ্ঠানে এ জাতীয় আক্রমনেরও তারা নিন্দা করে। কিন্তু দান্দাকারনিয়ায় এটি একটি বীরত্মগাথা হিসেবে খ্যাতি লাভ করেছে। এ নিয়ে সেখানে গান কবিতা এবং নাটক লেখা হয়েছে।
মাওবাদীদের এই প্রতি আক্রমনে সরকারি নিরাপত্তা জাল ভেঙ্গে গেল এবং জনগন স্বস্তির নি:শ্বাস ফেলল। পুলিশ এবং সালওয়া জুদুম তাদের ক্যাম্পে ফিরে এল। সেখান থেকে তারা রাতের শেষ ভাগে ৩০০ থেকে ১০০০ সদস্য একত্রিত হয়ে গ্রাম ঘেরাও করে এবং তল্লাসী অভিযান চালায় মাঝে মাঝে। এসপিও এবং তাদের পরিবার ছাড়া অন্যরা ধীরে ধীরে ক্যাম্প ছেড়ে গ্রামে ফিরে আসতে লাগল। মাওবাদীরা তাদের এ প্রত্যাবর্তনকে স্বাগত জানাল। এমনকি এসপিওদের প্রতিও তারা ঘোষনা করল যে, তারা যদি প্রকাশ্যে তাদের অপকর্মের বিষয়ে মা চায় এবং ভাল হয়ে যায় তবে তারাও ফিরে আসতে পারবে। যুবকরা পিএলজিএ’র সাথে যোগ দিতে লাগল। পিএলজিএ (পিপলস লিবারেশ গেরিলা আর্মি) আনুষ্ঠানিকভাবে গঠন করা হয় ২০০০ সালের ডিসেম্বর মাসে। গত ৩০ বছর ধরে তাদের সশস্ত্র স্কোয়াড থেকে সেকশন, সেকশন থেকে প্লাটুন এবং প্লাটুন থেকে কোম্পানীতে পরিণত হয়েছে। কিন্তু সালওয়া জুদুমের ধ্বংসের পর পিএলজিএ খুব দ্রুত তাদের শক্তি অর্জনে সম হয়।
সালওয়া জুদুম শুধু ব্যার্থই হয়নি তারা আত্মঘাতিতে পরিণত হয়েছে।
এখন আমরা জানি এটা স্থানীয়ভাবে কোন অল্প পরিসরের অভিযান ছিলনা। গণমাধ্যমের দ্বিমুখী বক্তব্য সত্ত্বেও এটি স্পষ্ট যে, সালওয়া জুদুম ছিল আসলে ছত্তিশগড় রাজ্য সরকার এবং কংগ্রেস সরকারের একটি যৌথ অভিযান। এরপর নতুন একটি পরিকল্পনার জন্য সরকারি প্রচন্ড চাপের মুখে ছিল। তারা অপারেশন গ্রিন হান্ট তৈরি করল। সালওয়া জুদুমের এসপিওদের এখন কয়া কমান্ডো বলা হয়। অপারেশন গ্রিণহান্টে ছত্তিশগেড়র সেনাবাহিনী, কেন্দ্রীয় রিজার্ভ পুলিশ, বিএসএফ, ইন্দো-তিব্বত বর্ডার পুলিশ, কেন্দ্রীয় শিল্প নিরাপত্তা বাহিনী, গ্রেহাউন্ডস, স্করপিয়নস, কোবরা যত আছে সব নামানো হল। এর সাথে ‘হৃদয় ও মন জয়’ নীতি ঘোষনা করা হল ( ডঐঅগ—ডরহহরহম ঐবধৎঃং ধহফ গরহফং.) । যুদ্ধ চলতে লাগল। আফগানিস্তানের শুষ্ক মরু পর্বতে মুক্তবাজার পুজিবাদ সোভিয়েত সমাজবাদকে পরাজিত করেছে। এখানে এই দান্তেবড়ার জঙ্গলে ভারতের আত্মার জন্য একটি যুদ্ধ জ্বলে উঠছে। ভারতের গণতন্ত্রের ক্রমবর্ধমান সঙ্কট, বড় বড় করপোরেট সংস্থা এবং রাজনৈতিক দলের মধ্যে সংঘাত এবং নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা নিয়ে অনেক কথা হয়েছে। কেউ যদি এ বিষয়ে একটু পরখ করতে চান তবে দান্তেবড়ায় ঘুরে আসুন।
স্টেট এগ্রেরিয়ান রিলেশনস এবং ভূমি সংস্কার এর খসড়া প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে সালওয়া জুনদুমকে টাটা এবং এসার স্টিল কোম্পানীই প্রথম অর্থ সহাযতা প্রদান করে। গণমাধ্যমে যখন সরকারি এ প্রতিবেদন ফাঁস হয় হথন হৈচৈ পড়ে যায়। পনে চূড়ান্ত প্রতিবেদন থেকে এ বিষয়টি বাদ দেয়া হয়। সত্যিই কি ভুলবশত তাদের নাম এসে গিয়েছিল? না করপোরেট টাকা দিয়ে ম্যানেজ করা হয়েছে?
২০০৯ সালের ১২ অক্টোবর লোহান্দিগুদায় টাটা স্টিল প্লান্টের বাধ্যতামূলক গণশুনানী হবার কথা ছিল যেখানে সাধারণ মানুষ আসতে পারত। কিন্তু জগদলপুরে কালেক্টর অফিসে এ শুনানী অনুষ্ঠিত হল। এটি ছিল অনেক মাইল দূরে এবং এবং শুনানীর সময় ঐ ভবন নিরাপত্তা বাহিনী ঘেরাও করে রাখে। সরকারি জীপে ৫০ জন ভাড়াটিয়া উপজাতীয়কে পাহারা দিয়ে নিয়ে আসা হল শুনানীর দর্শক হিসেবে। শুনানীর পর জেলা কালেক্টর লোহান্দিগুদার জনগণকে শুনানীর সহায়তার জন্য ধন্যবাদ জানালেন। স্থানীয় সংবাদপত্র আসল সত্য চেপে রেখে এই মিথ্যা খবরই ছাপল যদিও তারা জানত যে এটা একটি সাজানো নাটক। কারণ হল বিজ্ঞান দিয়ে তাদের মুখ বন্ধ করা হয়েছে। গ্রামবাসীর আপত্তি সত্ত্বেও প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহন শুরু হল।
ভারত রাষ্ট্রের যারা উচ্ছেদ দাবি করে তাদের মধ্যে মাওবাদীরা শুধু একা নয়। এর আগে হিন্দু মৌলবাদী এবং একনায়কতন্ত্রে বিশ্বাসীরাও এ দাবি করেছে। গাড়িতে দান্তেবড়া থেকে লোহান্দিগুদায় যেতে ৫ ঘন্টা লাগে। আগে এখানে মাওবাদীাদের কোন পরিচিতি ছিলনা। কিন্তু এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। কমরেড জরি সেখানে কাজ করে। তার বয়স মাত্র ২০ বছর। জরি জানাল গ্রামের ঘরের দেয়ালে “ন´ালী আও, হামেন বাঁচাও” (নক্সালীরা আস আমাদের বাঁচাও) এ জাতীয় কিছু স্লোগান লেখার পর আমরা সেখানে প্রবেশের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। কয়েক মাস আগে পঞ্চায়েত প্রেসিডেন্ট ভিম মেশ্রাম বাজারে গুলিতে নিহত হয়েছে। সে ছিল টাটার লোক। সে জোর করে মানুষের জমি দখল করত এবং তাদের কিছু তিপূরণ দিত। জরি বলল, ভাল হয়েছে যে সে মরেছে। আমরাও একজন কমরেডকে হারিয়েছি। তারা তাকে গুলি করে মেরেছে। টাটাকে আমরা এখানে আসতে দেবনা। জনগণ তাদের পছন্দ করেনা। জরি পিএলজিএ’র সাথে জড়িত নয়। সে দলের সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘চেতনা নাতিয়া মঞ্চে’ কাজ করে। সে গায়িকা। সে গান লেখে। তার বাড়ি অবুঝমদে। জরি কমরেড মাধবকে বিয়ে করেছে। মাধবও একজন গায়ক। মাধব যখন চেতনা মঞ্চের হয়ে তাদের গ্রামে অনুষ্ঠান করতে যায় তখন জরি তার প্রেমে পড়ে।
আমার মনে হয় এখানে এ বিষয়ে আমার কিছু বলা উচিত। এই সন্ত্রাস সম্পর্কে, অগ্রহনযোগ্য বিচার সর্ম্পকে। কিন্তু তাদের জন্য আমি কি পরামর্শ দিতে পারি। আদালতের কাছে যাওয়ার পরামর্শ? দিল্লীতে জনতার মন্তর এর কাছে ধরণা দেয়া, সমাবেশ করা বা অনশন ধর্মঘট? এসব উদ্ভট ছাড়া কিছু নয়। নয়া অর্থনীতি তত্ত্বের প্রবক্তারা খুব সহজে বলে থাকেন ‘এর কোন বিকল্প নেই” । তাদের কাছে বনবাসীদের জন্য একটি বিকল্প প্রতিরোধনীতি বিষয়ে জিজ্ঞেস করা উচিত। এখন আসা যাক আসল পশ্নে। এরা কোন দলকে ভোট দেয়? এদেশের কোন গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে তাদের সামনে হাজির করা যায়? নরমদায় বাঁধ নির্মানের বিরুদ্ধে যখন বছরের পর বছর আন্দোলন করা হয়েছে তখন আন্দোলনকারীরা কোন ঘরের দরজায় নক করা বাকী রেখেছে?
অন্ধকার। ক্যাম্পে অনেক কাজ কর্ম চলছ, কিন্তু আমি কিছুই দেখতে পাচ্ছিনা। কিছু আলোর আনাগোনা বোঝা যাচ্ছে। ওগুলো কি তারা না জোনাকি না মাওবাদীরা আক্রমনে যাচ্ছে কিছুই বোঝা যাচ্ছেনা। মংটু কোত্থেকে যেন হঠাৎ আবির্ভূত হল। মংটু যুবকদের জন্য চালূ করা ভ্রাম্যমান কমিউনিস্ট স্কুলের প্রথম ব্যাচের ছাত্র। এ স্কুলে লিখতে পড়তে এবং সমাজতন্ত্রের কিছু মূলনীতি শিা দেয়া হয়। তরুণ কমিউনিস্টরা বন্দুক বহন করতে পারেনা এবং ইউনিফর্ম পড়েনা।
মংটু আমার পানির বোতল ভরে বলল আমার ব্যাগ গুছিয়ে নেয়া উচিত। বাঁশি বাজানো হয়েছে। পাঁচ মিনিটের মধ্যে তাবু গুটিয়ে ফেলা হল। আরেকবার বাশি বাঁজল এবং কমরেডরা লাইনে দাড়িয়ে গেল। পঁচাটি সারিতে দাড়াল তারা। কমরেড রাজু অপারেশনের পরিচালক। হাজিরা ডাকা হল। আমিও লাইনে দাড়ালাম। চান্দু খুবই কান্ত এবং তার হাতে একটি স্টেনগান। নিম্ন সরে কমরেড রাজু তাদের ব্রিফিং দিচ্ছে। গোন্ডি ভাষায় বলছে সে। আমি কিছুই বুঝলামনা। আরভি শব্দটি মনে রাখলাম। রাজু পরে আমাকে বলল এর মানে রেনডেজভাজ, একত্র হওয়া। এটি এখন গোন্ডি শব্দ। আমরা যখন হামলার শীকার হই তখন এটি ব্যবহার করি এবং সবাই জানে কোথায় একত্র হতে হবে।
রওয়ান দেবার আগে কমরেড ভেনু আমার কাছে আসল। সে বলল ‘আমি আপনাকে পৌছার ব্যবস্থা করব কমরেড” আমাকে ফেরত নিয়ে যাওয়া হবে। তাকে তিনজন পুরুষ এবং তিনজন মহিলা গার্ড দিচ্ছে। সবাই সশস্ত্র। আমাকে হ্যান্ডশেক এবং লাল সালাম জানিয়ে সে বনের মধ্যে চলে গেল। আমরা বিপরীত দিকে হাটতে লাগলাম।
কমরেড রাজু শুদ্ধ হিন্দি বলতে পারে। রাজপুরে সে ১৮ বছর ওকালতি করেছে। সে এবং তার স্ত্রী মালতি উভয়ে পাটির রাজপুর শহর নেটওয়ার্কের সদস্য ছিল । ২০০৭ সালে শহর নেটওয়ার্কের একজন পাটির গুরুত্বপূর্ণ সদস্য গ্রেফতার হল। তাকে নির্যাতন করা হল এবং পার্টও খবর বের করার কাজে তাকে ব্যবহার করা হল। তাকে দিয়ে পুলিশ অন্য সদস্যদের ঠিকানা বের করল। কমরেড মালতির ঠিকানও পেল অন্য আরো অনেকের সাথে। মালতিকে গ্রেফতার করা হল অন্য বেশ কয়েকজনসহ। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হল সে সালওয়া জুদুমের নির্যাতনের ভিডিও সিডি সংসদ সদস্যদের কাছে পাঠিয়েছে। তার কেস কখনো শুনানী হয়নি কারণ পুলিশ জানে এট খুবই দুর্বল কেস। কিন্তু ছত্তিশগড় স্পেশাল পাবলিক সিকিউরিটি এ্যাক্টের বলে তাকে কযেক বছর জামিন ছাড়া আটকে রাখা হল। ছত্তিশগড় পুলিশ এখন কযেক ব্যাটালিয়ন পুলিশ নিয়োগ করছে সংসদ সদস্যদের রার জন্য এবং তারা এখন নিজেদের কোন চিঠিপত্রও পাচ্ছেনা। রাজু তখন দান্দাকারানিয়ায় অবস্থান করছিল একটি বৈঠকে যোগ দেয়ার জন্য। ফলেসে ধরা পড়েনি। সেই থেকে রাজু এখানে আছে। তাদের দুটি স্কুল পড়–য়া সন্তান ছিল । তাদের পুলিশ ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। অবশেষে তাদের বাড়ি পুলিশ দখল করেছ এবং তারা তাদের এক চাচার কাছে গেছে। কয়েক সপ্তাহ আগে প্রথমবারের মত সে তাদের বিষয়ে খোঁজ পেয়েছে।
আমরা এখন লাইন ধরে হাটছি। আমি এবং একশ নির্মম রক্তপিপাসু বিদ্রোহী। আমি পেছনে আমাদের ক্যাম্পের দিকে তাকালাম। সেখানে যে একটু আগে ক্যাম্প ছিল তার তেমন কোন চিহ্ন নেই। শুধু কিছু ছাই পড়ে আছে। আমি এই সেনাদের বুঝে উঠতে পারছিনা। তারা যেকোন গান্ধীবাদীর চেয়েও যেন গান্ধীবাদী। তাদের কাছে হালকা কার্বন ফুটপ্রিন্ট আছে। পুলিশের গাড়ি পোড়ানোর আগে তারা তার প্রত্যেকটি পার্টস খোলে। বিভিন্ন পার্টস তারা বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করার জন্য নিয়ে যায়। গাড়ি পোড়ানো বিষয়ে তাদের নতুন নির্দেশনা হল তা না পুড়েিয় গোপন করে রাখা যাতে পরে কাজে লাগাতে পারে।
আমরা ১৯১০ সালের ভুমকল বিদ্রোহের বার্ষিক অনুষ্ঠানে যাচ্ছি। এ বিদ্রোহে কয়ারা বিট্রিশদের বিরুদ্ধে জেগে উঠেছিল। ভূমকল মানে ভূমিকম্প। এ অনুষ্ঠান উপলে মানুষের হাটা শুরু হয়েছে। তারা দূর দূরান্ত থেকে আসবে। বন মানুষে ভরে যাবে। পুরো ডিকে বিভাগজুড়ে এ উৎসব। অনুষ্ঠানের আয়োজক কমরেড লেং আমাদেও সাথে হাটছে। গোন্ডি ভাষায় লেং মানে কন্ঠ। লম্বা মধ্যবয়সী কমরেড লেং এর বাড়ি অন্ধ্রপ্রদেশে। লেং কবি এবং শিল্পী গাদারের সহকর্মী। সে জন নাতিয়া মঞ্চ প্রতিষ্ঠা করেণ ১৯৭২ সালে। এটি পিপলস ওয়ার গ্র“পের একটি শাখা এবং অন্ধ প্রদেশে এর স্রোতা ব্যাপক। কমরেড লেং ১৯৭৭ সালে পার্টিতে যোগ দেয় এবং নিজ গুণেই সে বিখ্যাত গায়ক হয়েছ। অন্ধ্রপ্রদেশে যখন ব্যাপক নির্যাতন, গ্রেফতার এবং এনকাউনটার চলছে তখনো সে সেখানে বাস করত। প্রতিদিনই আমাদের কোন না কোন কমরেড মারা যেত। তাকেও একদিন মহিলা পুলিশ সুপার হাসপাতাল থেকে তুলে নিয়েছিল। ঐ পুলিশ ডাক্তার সেজে হাসপাতালে প্রবেশ করে। তাকে বারাঙ্গলের জঙ্গলে নিয়ে যাওয়া হয় এনকাউন্টারের জন্য। কিন্তু গাদার খবর পাওয়ায় সে তার বিষয়ে হুশিয়ারি উচ্চারণ করেছিল। ১৯৯৮ সালে পিপলস ওয়ার একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন গড়ার সিদ্ধান্ত নেয় এখন এর ১০ হাজার সদস্য আছে। হিন্দি, গোন্ডি ছত্তিশগড়ি এবং হালবি ভাষায় আমাদের ৫শ সঙ্গীত আছে। ১৪০ টি গানের একটি বই ছপা হয়েছে। প্রতিদিন গান লেখা হচ্ছে।
আমি নিশ্চত নই যে আমরা ভূমকল উৎসবে যাচ্ছি। আমার মনে হচ্ছে প্রচলিত প্রচলিত উপজাতীয় নাচ গান হবে যাতে থাকবে মাওবাদের প্রচারণা, বক্তব্য এবং অনুগত কিছু দর্শক। আমরা সন্ধ্যায় পৌছলাম। একটি অস্থায়ী মনুমেন্ট, লাল কাপড়ে মোড়া বাশের মাথায় পার্ট পতাকা, পাতাকায় জনতা সরকারের তীর ধুনকের ছবি। বিশাল একটি মঞ্চ। লেকজন আসতে শুরু কেেছ। আগতারা রান্নাবান্নার কাজে ব্যস্ত।
আমাদের নতুন ক্যাম্পের পাশে আবার লাইন ধরে হাজিরা ডাকা হল। নিরাপত্তারক্ষীদের অবস্থান, তীরন্দাজদের অবস্থান এবং পালাবার স্থান সম্পর্কে নির্দেশনা দেয়া হল।
সকালে ব্যাপক লোকসমাগামের আচ পেলাম। অনেক দিন পর অনেকের সাথে দেখা সাাতের আনন্দ উত্তেজনা বিরাজ করছে। মাইক টেস্ট করা হচ্ছে। ব্যানার পোস্টারে চারদিক ভরে উঠতে লাগল।
আমি কমরেড নরমদা, কমরেড মাসী, এবং কমরেড রুপীর সাথে চা পান করছিলাম। কমরেড নরমদা জানাল সে ক্রান্তিকারি আদিবাসী মহিলা সংস্থার দায়িত্ব নেয়ার আগে গাদচিরোলিতে কাজ করত। রুপী এবং মাসী অন্ধ্রপদেশে শহরকর্মী ছিল। পার্টির মধ্যে নারীদের দীর্ঘ সংগ্রামের কথা জানাল তারা। এটি শুধু তারা তাদের দাবি আদায়ের লক্ষ্যে করছেনা । বরং -যে সমাজের স্বপন্ তারা দর্ঘিদিন ধরে দেখে আসছে এবং যে সমাজ তারা প্রতিষ্ঠা করতে চায় সে লক্ষ্যে তারা তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার কাজ করেছে দলের মধ্যে। তারা সত্তরের দশকের কথা এবং নক্সালবাদী আন্দোলনের সেসময় জড়িত নারীদেও কথা গল্প করল। নক্সালবাদী পুরুষদের সম্পর্কে মহিলাদের তখন মোহমুক্তি ঘটে। এসব পুরুষ তখন নিজেদের বিপ্লবী মনে করত। কিন্তু তারা ছিল সমাজের আর পাচটা পরিবারে পুরুষ যেমন প্রধান ভূমিকায় থাকে তেমনি।
বিকাল নাগাদ পিএলজিএ’র আরেকটি দল আসল। এর প্রধান লম্বা ছেলেমত একটি লোক। এ কমরেডের দুটি নাম-সুখদেব এবং গুদসা উসেন্দি। এ নাম দুটির একটিও তার নয়। সুখদেব একজন খুবই জনপ্রিয় নিহত কমরেডে নাম। এই দলে একমাত্র নিহতরাই তাদের প্রকৃত নাম ব্যবহার করতে পারে। আর অনেক কমরেডই বিভিন্ন সময়ে গুদসা উসেন্দি হয়। কয়েক মাস আগে কমরেড রাজুর এ নাম ছিল। দান্দাকারনিয়ায় পার্টি মুখপাত্রের নাম গুদসা উসেন্দি। আমার ট্রিপের শেষ পর্যন্ত সুখদেব আমার সাথে ছিল। ১৯৮৮ সালে সে দান্দাকারানিয়ায় আসে। এসময় পিপলস গ্র“প তাদের এক তৃতীয়াংশ বাহিনী তেলেঙ্গানা থেকে দান্দাকারানিয়া পাঠানোর সিদ্ধান্ত ন্য়ে। সুখদেব ছিল সাদা পোশাকে। আমি জানতে চাইলাম কেন। সুখদেভ বলল একটু আগে সে কঙ্কার কেশকাল ঘাট থেকে এসেছে। ওখানে তিন মিলিয়ন টনের বক্সাইটের ওপর বেদান্তা নামে একটি কোম্পানীর নজর পড়েছে।
সুখদেব জানাল সে সেখানে গিয়েছিল তাদের মনোভাব বোঝার জন্য। তারা লড়াইয়ের জন্য প্রস্তত কিনা তা জানার জন্য। তারা এখনই একটি বাহিনী এবং বন্দুক চায়।
জঙ্গলের চিঠি আসল। কমরেড ভেনু আমার জন্য বিস্কুট পাঠিয়েছে। কয়েক ভাজ করা কাগজে কয়েকটি গানের লাইন লেখা। সে আমাকে এটি পাঠাবার কথা বলেছিল আগে। গানের লাইনগুলো পড়ে কমরেড নরমদা হাসল। সে এ গল্প জানে। এটা আশির দশকের কথা। তখন মানুষ কেবল পাটির প্রতি আস্থা আনতে শুরু করেছে। তারা তাদের সমস্যা নিয়ে আসত পার্টির কাছে। তাদের অভ্যন্তরীন দ্বন্দ্ব। মহিলারা প্রথম এসব সমস্যা নিয়ে আসত। একদিন সন্ধ্যায় আগুনের পাশে বসা এক বৃদ্ধ মহিলা দাড়াল এবং গান গাইল। সে একজন মাদিয়া। তাদের সমাজে প্রথা হল বিয়ের পরে ব্লাইজ না পরা এবং উর্ধ্বাংগ/বুক সম্পূর্ণ খোলা রাখা। এ বিষয়ে সে গানটি গাইল।
তারা বলে আমরা ব্লাউজ পড়তে পারবনা
দ্যাখোনিলে দাদা
তারা আমাদের ব্লাউজহীন করেছে দাদা
এইভাবে আমরা পাপী হচ্ছি দাদা
দুনিয়াটা বদলে গেছে তাইনা দাদা
কিন্তু আমরা যখন বাজারে যাই দাদা
আমাদের যেতে হয় অর্ধ্ব উলঙ্গ হয়ে দাদা
আমরা এ জীবন চাইনা দাদা
আমাদের বংশধরদের একথা বলিও দাদা
মহিলাদের এই বিষয়টাতে পার্টি সর্ব প্রথম প্রচারণা চালালো। এটা খুবই সতকর্তার সাথে করতে হয়েছিল। ১৯৮৬ সালে আদিবাসী মহিলা সংস্থা প্রতিষ্ঠা করা হল। এটাই পরে ক্রান্তিকারি আদিবাসী মহিলা সংস্থা হয়েছে। এর সদস্য সংখ্যা এখন ৯০ হাজার। এটা ভারতের সবচেয়ে বড় মহিলা সংস্থা হতে পারত। তারা সবাই মাওবাদী। (তাদেরকে কি মুছে ফেলা হবে? এবং চেতনা নাতিয়া মঞ্চের ১০ হাজার মাওবাদীর কি হবে? তাদেরও ধ্বংস করা হবে?)। ক্রান্তিকারী সংস্থা উপজাতীয় সমাজে নারীদের প্রতি নানা বৈষম্য, নিগ্রহ এবং নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে লাগল। জোর করে এবং অপহরন করে মেয়েদের তুলে নিয়ে বিয়ের প্রথার বিরুদ্ধে আন্দোলন করল ক্রান্তিকারি আদিবাসী সংস্থা । মেয়েদের রজস্রাবের সময় তাদেও বনের মধ্যে হাটে নিয়ে রাখা হত। এর বিরুদ্ধে তারা আন্দোলন করল। বহুগামিতা এবং মেয়েদের ওপর পারিবারিক নির্যাতনের বিরুদ্ধে তারা আন্দোলন করল। তবে সবগুলোতে পুরোপুরি সফলতা আসেনি। যেমন দান্দাকারানিয়ায় মেয়েদের এখনো বীজ বপন করতে দেয়া হয়না। পার্টি বৈঠকে পুরুষরা স্বীকার করেছে যে এটি বৈষম্য এবং এর অবসান হওয়া উচিত। কিন্তু বাস্তবে তারা এটি করেনা। সুতরাং পার্টি সদ্ধিান্ত নিল জনতা সরকার যে জমি নিয়ন্ত্রন করে সেখানে মেয়েরা বীজ বপন করবে। সেখানে এখন তারা শাকসব্জি চাষ করে।
বাস্তারে পুলিশের নির্যাতন বাড়ার সাথে সাথে ক্রান্তিকারি মহিলা সংস্থাও প্রবল প্রতিরোধের ভূমিকায় অবর্তীণ হল। কখনো কখনো শত শত এবং কখনো হাজার হাজার মহিলাদেও নিয়ে রাস্তায় পুলিশের মুখোমুখি দাড়ায়। ক্রান্তিকারির এই অবস্থানের ফলে নারীদের প্রতি বৈষম্য এবং প্রথাগত দৃষ্টিভঙ্গিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসে। তারা যে বিরুপ পরিবেশের মোকাবেলা করে আসছিল তা অনেকটা সহজ হয়ে যায়। যুবতী মহিলারা পিএলজিএ’র সাথে যোগ দেয় সামাজিক নির্যাতনের হাত থেকে বাঁচার জন্য। ক্রান্তিকারির পিয়ন সুশীলা জানাল তাদের প্রতি সালওয়া জুমুদের ক্রোধ এবং হিংস্রতার কথা। আমাদের প্রতি সালওয়া জুদুমের একটি স্লোগান হল “হামদো বিবি লায়েঙ্গে লায়েঙ্গে”- আমি দুইটা বউ আনব। ক্রান্তিকারি সংস্থার মেয়েদের অনেককে ধর্ষন করা হয়েছে এবং পাশবিক উপায়ে যৌনাঙ্গহানি করা হয়েছে। এ বর্বরতা যারা দেখেছে তারা এ থেকে বাঁচার জন্য পিএলজিএ’র সাথে যোগ দিয়েছে এবং এ সংস্থার ৪৫ ভাগ ক্যাডার এখন মহিলা। কমরেড নরমদা এরকম কিছু মহিলাকে ডেকে আমার সাথে পরিচয় করিয়ে দিল।
কমরেড রিঙ্কির চুল খুবই ছোট-বব কাট। এটা তার সাহসের পরিচয় বহন করে। কারণ এখানে বব কাট মানে সে মাওবাদী। ফলে পুলিশের পে তাকে সহজে ধরে ধর্ষন এবং হত্যা করা সম্ভব। কমরডে রিঙ্কিদের করমা গ্রাম ২০০৫ সালে নাগা বিদ্রোহ এবং সালওয়া জুদুম সদস্যরা আক্রমন করে। সেময় রিঙ্কি গ্রাম্য মিলিশিয়া সদস্য ছিল। তার বন্ধু লুক্কি এবং সুক্কি ক্রান্তিকারির সদস্য ছিল। তাদের গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়ার পর নাগা বিদ্রোহীরা অন্য আরেকটি মেয়েসহ লুক্কি এবং সুক্কিকে ধরে গণ ধর্ষন করল। তারা তাকে ঘাষের ওপর র্ধষন করল। কিন্তু ধর্ষনের পর আর সেখানে কোন ঘাষ ছিলনা। সেটা অনেক বছর আগের কথা। নাগা বিদ্রোহ শেষ হয়েছে। কিন্তু এখন আছে পুলিশ। তারা গ্রামে আসে যখন তাদের নারী দরকার হয়।
অজিথারও বব কাট চুল। সালওয়া জুদুম তাদের করসিল গ্রামে এসেছিল এবং তিনজনকে নালার মধ্যে ডুবিয়ে মেরেছে। অজিথাও একটি গেরিলা দলের সাথে জড়িত ছিল এবং দূর থেকে টোডাক গ্রামে সালওয়া জুদুমের আক্রমন দেখেছে। অজিথা জানাল সে ছয় জন মহিলাকে ধর্ষন করতে দেখেছে তখন। এসময় সে একজনকে গুলি করে মেরেছে।
কমরেড লক্ষ্মী খুবই সুন্দরী এবং তার চুল বেশ লম্বা। সে বলল তাদের জজর গ্রামে সালওয়া জুদুম ৩০টি বাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছে। আমাদের তখন কোন অস্ত্র ছিলনা। তাদের ধ্বংসলীলা তাকিয়ে তাকিয়ে দেখা ছাড়া আমাদের আর কিছ করার ছিলনা। এর পরপরই সে পিএলজিএ তে যোগ দিল। ২০০৮ সালে উড়িষ্যার নয়াগড়ের পথে যে ১৫০ জন গেরিলা জঙ্গলে সাড়ে তিনদিন হেটেছিল কমরেড লক্ষ্মী তাদের একজন। পুলিশের অস্ত্র গুদামে সে অভিযানে তারা ১২০০ রাইফেল এবং ২ লাখ রাউন্ড গুলি লুট করেছিল।
সালওয়া জুদুমের ধ্বংসলীলা শুরু হওয়ার আগেই কমরডে সুমিত্রা পিএলজিএ’র সাথে যোগ দেয়। কারণ সে বাড়ি থেকে পালাতে চেয়েছিল। মহিলাদের সেখানে সব উপায়ে নিয়ন্ত্রন করা হয়। সুমিত্রা জানাল তাদের গ্রামে মেয়েদের গাছে চড়তে দেয়া হয়না। কেউ গাছে চড়লে ৫০০ রুপি অথবা একটি মুরগী ফাইন দিতে হয়। যদি কোন পুরুষ কোন মহিলাকে মারে এবং ঐ মহিলা রুরুষকে পাল্টা আক্রমন করে তবে তাকে একটি ছাগল জরিমানা দিতে হয়। তাদের সমাজে মেয়েদের ডিমও খেতে দেয়া হয়না। পশু শীকারের পর সব ভাল গোস্ত পুরুষরা নিয়ে যায়।
সুমিত্রা তার দুই বান্ধবী পাবর্তী এবং কমলার গল্প করল। তারা ক্রান্তিকারি সংস্থায় কাজ করত। পাবর্তীর বাড়ি দনি বাস্তারের পলিকায়া গ্রামে। অন্যান্য সবার মত সেও দেখল সালওয়া জুদুম তাদের বাড়ি পুড়িয়ে দিচ্ছে। পাবর্তী তখন পিএলজিএ যোগ দিল এবং কেশখার ঘাটে কাজ করত। পাবর্তী এবং কমলা সেখানে ২০০৯ সালের ৮ মার্চ নারী দিবস পালনের উদ্যোগ নিল। দিবস পালনের সমস্ত আয়োজন তারা তখন সবে মাত্র শেষ করল। তারা দুজন একসাথে গ্রামের বাইরে ভাদগো এলাকায় ছোট একটি রুমে থাকত। পুলিশ রাতে তাদের ঘর ঘেরাও করে গুলি শুরু করল। কমলা পাল্টা গুলি করল। কিন্তু কমলা বাচতে পারলনা। পাবর্তী পালিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু পরের দিন তাকে মৃত পাওয়া গেল। গত বছর নারী দিবসের ঘটনা এটি।
এখানে এবছর নারী দিবসে জাতীয় পত্রিকার একটি রিপোর্ট তুলে ধরা হল।
খবরের শিরোনাম “বাস্তার বিদ্রোহীরা নারী অধিকারের জন্য আন্দোলন করছে।”
সাহার খান, মেইল টুডে, রায়পুর মার্চ ৭, ২০১০॥
আন্তর্জাতিক নারী দিবস পাললেনর ঘোষনা দিয়েছে মাওবাদীরা। নারী অধিকার বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টির ল্েয সমগ্র বাস্তার জুড়ে সপ্তাহব্যাপী অনুষ্ঠান আয়োজনের ডাক দেয়া হয়েছে। বিজাপুরে পোস্টার লাগানো হয়েছে। নারী অধিকার বিষয়ে মাওবাদীদের স্বঘোষিত দাবীতে রাজ্য পুলিশ বিস্মিত। বাস্তার পুলিশের আইজি টি জে লংকুমার বলেছেন, যে নক্সালীদের কাজ হল সন্ত্রাস এবং রক্তপাত তাদের কাছ থেকে আগে কখনো এ জাতীয় দাবী শোনা যায়নি।
এরপর আইজি’র বরাতে প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে, আমার মনে হয় আমাদের সফল ‘জন জাগরণ অব্বান’ কর্মসূচীর মোকাবেলায় তারা এটি করছে। বামপন্থী মাওবাদী সন্ত্রাসীদের নির্মূলের জন্য পুলিশ যে অপারেশন গ্রীন হান্ট পরিচালনা করছে তার পে জনমত তৈরির ল্েয আমরা জনজাগরণ আহ্বান নামে চলমান প্রচারণা শুরু করি।
ঘৃনার এই মিশ্রন এবং অজ্ঞতা অস্বাভাবিক নয়। পাটির মুখপাত্র গুদসা উসেন্দি এ বিষয়ে অনেকের চেয়ে ভাল জানেন। তার ছোট কম্পিউটার এবং এমপি থ্রি রেকর্ডারে তাদের বিরুদ্ধে সংবাদপত্র এবং রেডিও টিভিতে প্রতিনিয়ত এ জাতীয় যত অপপ্রচার, মিথ্যাচার এবং ঘৃনা বিদ্বেষ প্রচারিত হচ্ছে তা সংরক্ষন করা আছে। তাদের বিরুদ্ধে প্রচারিত মিথ্যাচারের বিরুদ্ধে দলের পক্ষ থেকে যেসব প্রতিবাদ পাঠানো হয়েছে তাও সংরক্ষন করা আছে। এছাড়া দলের সাহিত্য, মৃতদের তালিকা, টিভি কিপস এবং অডিও ভিডিও বিষয়ে পূর্ণ তার কম্পিউটার এবং এমপি থ্রি রেকর্ডার। গুদসা উসেন্দি জানাল, সবচেয়ে খারাপ হল আমাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা খবর সম্পর্কে আমরা অনেক বিবৃতি/ব্যাখ্যা পাঠাই যা কখনো প্রকাশিত হয়না। অ প্রকাশিত এসব প্রতিবাদ, ব্যাখ্যা বিবৃতি নিয়ে একটি বই প্রকাশ করা সম্ভব।
“আপনাদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে উদ্ভট অভিযোগ কোনটি যার বিরুদ্ধে আপনাদের প্রতিবাদ জানাতে হয়েছিল?
সে একটু চিন্তা করে বলল, ২০০৭ সালে আমাদের বিরুদ্ধে প্রকাশিত একটি খবরের প্রতিবাদ পাঠাতে হয়েছিল। প্রতিবাদে আমাদের বলতে হয়েছিল- “না ভাই আমরা হাতুড়ি দিয়ে গরুগুলোকে হত্যা করিনি”। ২০০৭ সালে রমন সিং নির্বাচনী ওয়াদা অনুযায়ী প্রত্যেক আদীবাসী পরিবারের জন্য একটি করে দেয়ার কর্মসূচী হাতে নেয়। একদিন টিভি এবং সংবাদপত্রে খবর প্রচার করা হল নক্সালীরা একটি গোশালায় হামলা চালায় এবং হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে গরু হত্যা করে। কারণ নক্সালীরা হিন্দু এবং বিজেপি বিরোধী। বিষয়টি আপনি চিন্তা করে দেখুন। আমরা এর প্রতিবাদে বিবৃতি প্রদান করলাম। কিন্তু কেউ তা ছাপলনা। পরে প্রমানিত হয়েছে যে যাকে এ গরুগুলো বিরতরণের জন্য দেয়া হয়েছিল সে ছিল বজ্জাত ধরণের লোক। গরুগুলোকে সে আরেকজনের কাছে বিক্রি করে দিয়ে প্রচার করে যে আমরা তার উপর হামলা চালিয়ে গরুগুলো হত্যা করেছি।
আর সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ ছিল কোনটি আপনাদের বিরুদ্ধে?
এর শেষ নেই। তারা তো আমাদের বিরুদ্ধে প্রচারণায় নেমেছে। সালওয়া জুদুম আম্বেলী গ্রামে হামলার মাধ্যমে তাদের কার্যক্রম শুর করল । গ্রামটি জ্বালিয়ে দেয়ার পর এসপিও, নাগা যোদ্ধা এবং পুলিশ কোত্রাপালের দিকে অগ্রসর হল। আপনি কোত্রাপাল সম্পর্কে শুনেছেন নিশ্চয়ই। এটা একটা বিখ্যাত গ্রাম। ২২ বার এ গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে। কারণ তারা আত্মসমর্পণ করেনি। সালওয়া জুদুম যখন কোত্রাপালের দিকে অগ্রসর হল তখন আমাদের গেরিলারা তাদের জন্য অপো করছিল। গোপন হামলা করে তারা দুজন এসপিওকে হত্যা করল। সাতজনকে বন্দী করা হল। অন্যরা পালিয়ে গেল। পরের দিন সংবাদপত্রে খবর বের হল নক্সালীরা দরিদ্র আদিবাসীদের ওপর ধ্বংসজজ্ঞ চালিয়েছে। কেউ কেউ লিখল আমরা শত শত মানুষ হত্যা করেছি। এমনকি ফ্রন্টলাইনের মত ম্যাগাজিনে লিখল আমরা ১৮ জন অসহায় আদিবাসীকে হত্যা করেছি। আমরা সত্য ঘটনার বিবরণ দিয়ে ব্যাখা পাঠালাম কিন্তু কেউ তা প্রকাশ করেনি। পরে বালা গোপাল নামে এক লোক তার বইয়ে তার ভুল স্বীকার করেছে। কিন্তু তা জানে কয়জন?
যে সাতজনকে ধরা হয়েছিল তাদের পরিণতি কি হল?
“এরিয়া কমিটি তাদের জন আদালতে বিচারের উদ্যোগ নিল। চার হাজার লোক সেখানে উপস্থিত হয়। তারা পুরো ঘটনা শুনল। দুজন এসপিওকে মৃত্যুদন্ড দেয়া হল। বাকী পাঁচ জনকে সতর্ক করে ছেড়ে দেয়া হল। জনগনের রায় অনুযায়ী এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। এমনকি সরকারি সোর্স যারা এখন জনসধারণের জন্য বিরাট সমস্যা জনগণ সেদিন তাদের মুখে তাদের অপকর্মের স্বীকারোক্তি শুনেছে। এসব শোনার পর তারা বলেছে এদেরকে ছেড়ে দিয়ে ঝুকি নেয়া ঠিক নয়। আবর কেউ বলেছে আমরা তাদের মোকাবেলায় প্রস্তুত । যেসব সোর্সদের হত্যা করা হয় সংবাদপত্রে কেবল তাদের খবর আসে। কিন্তু যাদের মা করা হয় সে বিষয়ে কোন খরব ছাপা হয়না। সুতরাং সবাই মনে করে আমাদের এই বিচার অত্যন্ত নিমর্ম এবং এর মাধ্যমে সবাইকে হত্যা করা হয়। প্রতিশোধের জন্য আমরা এ বিচারের আয়োজন করিনা বরং জীবন রার জন্য এ বিচার। কিন্তু আমাদের যে ভুল হয়না তা নয়। অনেক সময় পুলিশ মনে করে কারো কারো ওপর হামলা চালানো হয় (মাওবাদী এলাকায় পুলিশ সাদা পোশাকে চলাফেরা করে) এবং পরে দেখা যায় সে আসলে পুলিশ ছিলনা। কিন্তু এটাই সব নয় । এরকম দুযেকটি ঘটনা ঘটে। কিন্তু গণমাধ্যমে সবসময় এটিই দেখায় যে আমারা সাধারণ মানুষ হত্যা করি।”
ভয়ঙ্কর মানুষদের জন আদালত। আমরা একে কি করে গ্রহণ করতে পারি? অথবা এই ধরণের বন্য বিচার ব্যবস্থাকে আমরা কি করে অনুমোদন দিতে পারি? অন্যদিকে এনকাউন্টারের কি হবে? সরকার যে ভুয়া এবং প্রহসনের বিচারের আয়োজন করে পুলিশ, সেনাবাহিনীর সদস্যদের বীরত্ব পদক, নগদ অর্থ এবং পদোন্নতি প্রদান করে তার কি হবে? যে পুলিশ বা সেনা সদস্য যত বেশি মাওবাদী এবং সাধারণ মানুষ হত্যা করে তত বেশি তার পুরষ্কার। তাদের ব্রেভহার্ট, এনকাউন্টার স্পেশালিস্ট উপাধি দেয়া হয়। এসব বিষয়ে যারা আপত্তি তোলার মত সাহস দেখায় আমরা তাদের জাতীয় স্বার্থ বিরোধী হিসেবে আখ্যায়িত করি। আর তারই বা কি হবে যেখানে সুপ্রীম কোর্ট নির্লজ্জভাবে স্বীকার করেছে যে, ২০০১ সালে ডিসেম্বর মাসে সংসদ ভবনে হামলার দায়ে আফজালকে মৃত্যুদন্ড দেয়ার পে যথেষ্ট প্রমান তাদের ছিলনা। কিন্তু তারপরও সমাজ খুসী হবে শুধু মাত্র এই কারণে তাকে মৃত্যুদন্ড প্রদান করা হয়েছে।
কোত্রাপালের জন আদালতের এই বিচার সম্পর্কে আমি বলতে পারি সেখানে অন্তত সাধারণ মানুষ স্বশরীরে উপস্থিত ছিল সিদ্ধান্ত নেয়ার সময়। সেখানে বিচারের নামে অন্তত কোন নাটকের অভিনয় করা হয়নি রুদ্ধদ্বার রুমের মধ্যে।
খুব জোরে ড্রাম বাজতে লাগল। এখন ভূমকলের সময়। আমরা অনুষ্ঠান স্থলে গেলাম। আমি আমর চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিনা। লোকে লোকারণ্য। জংলী লোকগুলো আরো জঙলী এবং সুন্দর মানুষগুলো আরো সুন্দরভাবে পোশাক পরে আসল। পরুষদের বেশি মনোযোগী মনে হল। তারা মাথায় পালক এবং মুখে উলকী একেছে। অনেকে চোখে মেকআপ দিয়েছে এবং মুখমন্ডল সাদা করেছে পাউডার দিয়ে। অনেক গেরিলা সদস্য আছে এর মধ্যে। নারী গেরিলারাও এসেছে রংবেরঙ্গের শাড়ী পরে। তাদের কাঁধে রাইফেল ঝুলছে যেন এটি কোন বিষয়ই নয়। আছে বৃদ্ধা এবং শিশুরাও। কমরেড লেং বক্তব্য রাখলেন। জনতা সরকারের অনেক কর্মকর্তাও বক্তব্য রাখলেন। কমরেড নিতিও বক্তব্য রাখলেন। তিনি এতই গুরত্বপূর্ণ কমরেড যে ২০০৭ সালে তাকে ধরার জন্য ৭০০ পুলিশ একটি গ্রাম ঘেরাও করে। সে অনেক গোপন হামলার নেতৃত্ব দিয়েছে । সে কারণেই যে সরকারি লোকজন তাকে হন্যে হয়ে খুঁজছে তা নয়। বরং তিনি তার গ্রামে অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং তরুণ তরুনীদের কাছে তিনি একজন আদর্শ। সে যখন কথা বলছিল তখন তার কাঁেধ একে-৪৭ ঝুলছিল। প্রত্যেক কমরেডের প্রত্যেক বন্দুকের পেছনে একটি করে কাহিনী আছে। কবে কোন অস্ত্র গুদামে কিভাবে হানা দিয়ে তারা এসব বন্দুক লুট করেছে তার কাহিনী।
ভূমকল বিদ্রোহ বিষয়ে চেতনা মঞ্চ একটি নাটক মঞ্চস্থ করল। সাদা ঔপনিবেশিক শয়তান চরিত্রের অভিনেতারা মাথায় হ্যাট, সোনালী খড়কুটা পড়েছে । তারা আদীবাসীদের ওপর নির্যাতন চালাচ্ছে। দনি গঙ্গালৌর থেকে আগত আরেকটি দল “স্টোরি অব ব্লাড হান্ট” (নিতির জুদুম পিতো) নামে আরেকটি নাটক মঞ্চস্থ করল। জরি আমাকে অনুবাদ করে এর কাহিনী শোনাল। এটি দুজন বৃদ্ধ লোকের গল্প। তারা তাদের মেয়েদের বাড়িতে গিয়েছিল তাদের দেখতে। তারা যখন বনে প্রবেশ করল তখন পথ হারিয়ে ফেলল কারণ সবকিছু জালিয়ে পুড়িয়ে দেয়ার কারণে সব অপিরিচিত হয়ে গেল তাদের কাছে। সালওযা জুদুম এমনকি ড্রাম এবং গান বাজনার সরঞ্জামও পুড়িয়ে দিয়েছে। বৃষ্টির কারণে কোন ছাইয়ের চিহ্নও নেই সেখানে। তারা তাদের মেয়েদের খুঁজে পেলনা। দুই বৃদ্ধ তাদের মেয়েদের স্মরনে বিলাপ করে গান গাইতে লাগল। সে গাণ শুনে ধ্বংসস্তুপের মাঝ থেকে তাদের মেয়েরা গানের মাধ্যমে তাদের বিলাপের উত্তর দিল। মেয়েরা গানের মাধ্যমে বলল তাদের গ্রামের সব শব্দ কোলাহল মিলিয়ে গেছে। এখন আর কেউ উঠানে স্তুপ করে ধান রাখা হয়না। কুয়ার পাড়ে বসে পানি তোলার সময় এখন আর কেউ হাসেনা। পাখী এবং ছাগলের কোন ডাক আর নেই। চিরসুখের সেই দিনগুলো আর নেই।
মেয়েটির বাবা মেয়েটিকে গানের সুরে বলল, কেঁদোনা আমার মেয়ে। সবাইকে মরতে হবে। আমাদের চারপাশের এই গাছগুলো একদিন মাটিতে লুটিয়ে পড়বে। ফুল ফুটবে আর ধূসর হয়ে ঝরে পড়বে। একদিন এ পৃথিবীও বুড়ো হয়ে যাবে। কিন্তু আমরা কিজন্য মরছি? একদিন বর্বর লুটেরার দল জানতে পারবে। একদিন অবশ্যই সত্য প্রকাশ পাবে। কিন্তু আমাদের জনগণ তোমাদের কোনদিন ভুলবেনা, হাজার বছরেও না।
এরপর আরো কয়েকজন বক্তব্য রাখল। ডামের তালে নাচ শুরু হল। প্রত্যেক জনতা সরকারের এলাকাভিত্তিক সংস্কৃতিক দল আছে। প্রত্যেক সংস্কৃতিক দল আলাদা করে নাচল। তারা একের পর এক আসল ড্রাম নিয়ে এবং তাদের নাচের মাধ্যমে তাদের ওপর যে বর্বরতা চালানো হয় তা তুলে ধরল। প্রত্যেক দলে একটি চরিত্র কমন আর তা হল খনি উত্তোলনকারী ভিলেন। তার মাথায় হ্যাট এবং চোখে কাল গ্লাস, ঠোটে সিগারেট। এক সময় মঞ্চের নাচের তালে তালে উপস্থিত জনতা, নারী পুরুষ আলাদা হয়ে নাচতে শুরু করল। সাত আটজনে বিভক্ত হয়ে একজনের কাঁধে আরেকজন হাতি দিয়ে নাচতে এবং দুলতে শুরু করল। এভাবে তারা আনন্দকে উপভোগ করে, মাইলের পর মাইল হেটে আসে একত্রে মিলিত হবার জন্য।
আমি জানি এসব কিছুই হচ্ছে পুলিশের ঠিক নাগের ডগায়। অপারেশন গ্রীন হান্টের মধ্যেই।
যারা নাচে অংশ নিচ্ছিল পিএলজিএ সদস্যরা প্রথমে তাদের দেখল তাদেরই পাশে দাড়িয়ে কাঁেধ বন্দুক নিয়ে। তারপর তারা একে একে এগিয়ে গিয়ে নাচতে শুরু করল। হাস নদীতে সাতার কাটার সময় যেমন একটি হাস তীরে বসে থাকতে পারেনা তেমনি তারা সবাই একের পর এক গিয়ে নাচে অংশ নিল। জলপাই সবুজ পোশাকধারী গেরিলারা লাইন ধরে নাচতে শুরু করল। ধীরে ধীরে তারা অন্যান্য নানা রংয়ের সাথে মিলিয়ে যেতে লাগল। এবং তারপর বোনেরা, ভাইয়েরা, মা বাবা, শিশু এবং বন্ধুবান্ধব যাদের সাথে অনেকদিন ধরে দেখা সাাত নেই সাবই নাচের তালে তালে হারিয়ে যেতে লাগল। লাইন ভাঙ্গে আবার গড়ে। জলপাই সবুজ পোশাক পরা সেনারা শাড়ী, ফুল, পাগড়ি আর ড্রামের তালে মিলিয়ে যেতে লাগল। এটা সত্যিই এখন জনগণের আর্মি (পিপলস আমি)। অন্তত এই মুহূর্তের । মাও চেয়ারম্যান গেরিলাদের সম্পর্কে যে কথা বলেছিলেন “জনগণ হল পানি। সে পানির মধ্যে তোমাদের (গেরিলা) মাছ হয়ে সাতরাতে হবে।) সবুজ জলপাই পোশাকের লোকজন যেভাবে সাধারণ মানুষের মধ্যে মিলিয়ে গেল আরিক অর্থে এই মুহূর্তে মাওয়ের কথা সত্যে পরিণত হল।
মাও চেয়ারম্যান এখানেও আছেন। একটু একাকী, কিন্তু আছেন। লাল পর্দায় তার একটি ছবি টানানো দেখা যাচ্ছে। কার্ল মার্কস এবং চারু মজুমদারও আছেন। নক্সালবাদী আন্দোলন তত্ত্বের মূল প্রণেতা এবং প্রতিষ্ঠাতা চারু মজুমদার। তার উত্তেজক বক্তব্য সংঘাত, রক্তপাত, আত্মবলীদানে সহায়ক। এমনকি তিনি মাঝে মাঝে এমন উত্তেজনক বক্তব্য রাখেন যা গনহত্যার মত পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। আজ এই ভূমকল বিদ্রোহের দিন এখানে দাড়িয়ে আমি চারু মজুমদারের চিন্তাধারা সম্পর্কে না ভেবে পারছিনা। বিপ্লবী এই আন্দোলন কাঠামোর জন্য এটি অত্যন্ত জরুরি। যখন সে বলে “একমাত্র নির্মূল অভিযানের মধ্য দিয়েই এমন একটি নতুন দলের আবির্ভাব হবে যারা মুত্যুকে পরোয়া করবেনা এবং আপন স্বার্থকেন্দ্রিক চিন্তা থেকে তারা মুক্ত থাকবে।” এইযে রাতের অন্ধকারে আদি মানুষগুলো নাচছে তাদেরই কাঁেধ একদিন এসে আশ্রয় নেবে তার সেই চিন্তাধারা একথা কি তিনি ভাবতে পেরেছিলেন?
চারু মজুমদার যখন খুব জোরের সাথে বললেন, “চীনের চেয়ারম্যান আমাদের চেয়ারম্যান এবং চীনের পথই আমাদের পথ” তখন তিনি এ আন্দোলনকে আরো ব্যাপক পরিসরে ছড়িয়ে দেয়ার প্রস্ততি নিয়েছিলেন। কিন্তু জেনারেল ইয়াহিয়া যখন পূর্ব পাকিস্তানে গণহত্যা পরিচালনা করল তখন ন´ালীরা নিরব রইল। কারণ চীন তখন পাকিস্তানের পক্ষে ছিল। এমনিভাবে কম্বোডিয়ায় পলপট বাহিনী যখন খেমারুজদের ওপর গণহত্যা পরিচালনা করল, রাশিয়া এবং চীন বিপ্লবের সময় যে বাড়াবড়ি হয়েছিল এবং তিব্বতের ওপর যখন দমননীতি চলছিল তখনো নক্সালীরা নিরব ভূমিকা পালন করে। নক্সালবাদী আন্দোলনের মধ্যেও অনেক বাড়াবড়ি হয়েছে এবং তারা যা করেছে তা ঠেকানো সম্ভব ছিলনা। কিন্তু কংগ্রেস এবং বিজেপি কাশ্মীর, গুজরাট, পাঞ্জাব, মুম্বাই এবং দিল্লীতে যেসব পৈশাচিক কাজকর্ম করেছে তার তুলনায় নক্সালীদের এ বাড়াবাড়ি কিছুই নয়। এবং দুয়ের মাঝে এই বৈপরিত্য সত্ত্বেও চারু মজুমদার যা লিখেছেন এবং বলেছেন তার মধ্যে একটি স্বপ্ন ছিল। তিনি যে পার্টি প্রতিষ্ঠা করেছেন (যদিও তা এখন অনেক ভাগে বিভক্ত) তারা তার এ বৈপ্লবিক স্বপ্নকে এখন বাস্তব আকারে ভারতে তুলে ধরেছে। এই স্বপ্ন ছাড়া সমাজের কথা ভাবুন। শুধুমাত্র একারণে আমরা তাকে অতি নির্দয়ভাবে বিবেচনা করতে পারিনা। বিশেষ করে “অহিংস নীতি”র শ্রেষ্ঠত্বে বিষয়ে আমরা যখন গান্ধীর ধার্মিক ভন্ডামীর মধ্যে নিজেদের আবদ্ধ করে রাখি। এছাড়া সম্পত্তির মালিকানা সম্পর্কে গান্ধীর যে দর্শন: “ধনী ব্যক্তি তার সম্পত্তির মালিক সে নিজে হবেনা। সে তার সম্পত্তি থেকে ততটুকু ব্যবহার করবে যতটুকু তার ব্যক্তিগত জীবনে দরকার। বাকী সম্পত্তি সে সমাজের কল্যানের জন্য তত্ত্বাবধান করবে।”
কী অ™ভ’ত এটি । যদিও ভারতের এই নব্য জার শাসকরা নির্দয়ভাবে নক্সালীদের দমন করল - এখন আমাদের সেই কথা বলতে থাকা উচিত যে কথা চারু মজুমদার অনেক আগে বলে গেছেন “চীনের পথই আমাদের পথ।”
এরপর অনেক ওলট পালট হয়েছে। চীনের পথ বদলে গেছে। চীন এখন একটি সাম্রাজ্যবাদী শক্তি। অন্য দেশ, অন্য দেশের মানুষের সম্পদ শীকারে নেমেছে তারাও। কিন্তু পার্টি এখনো ঠিক আছে। শুধু মাত্র দল তার মন বদলিয়েছে।
দণ্ডকারণ্যে এখন দল যেমন জনগণকে উদ্বুদ্ধ করছে, মানুষের সুখ দুখের সাথী এবং দলও যখন মানুষের কাছে আশ্রয়প্রাথী তখন এটি সত্যিকারের একটি জনগণের দল। এর গেরিলা বাহিনী সত্যিকারের জনগণের বাহিনী। কিন্তু বিপ্লবের পর এই মধুর প্রেম কেমন বিষময় বিবাহিত জীবনের মত হয়ে যায়। জনগনের আর্মি তখন তাদের ওপর চেপে বসে। দণ্ডকারণ্যে আজ মাওবাদীরা বক্সাইট খনিজ সম্পদ তাদের পাহাড়ে ধরে রাখতে চায়। কিন্তু বিপ্লব হলে আগামী দিনে কি তাদের মন বদল হবে?
সারারাত নাচ চলবে। আমি ক্যাম্পে ফিরে যাচ্ছি। মাসি সেখানে এখনো সজাগ আছে। আমরা ভোররাত পর্যন্ত গল্প করলাম। আমি তাকে নেরুদার ‘ক্যাপ্টেন’স ভার্সাস বইটি দিলাম। সে আমার কাছে বারবার জানতে চাইল আমাদের সম্পর্কে বাইরের জনগণ কি ধারণা পোষন করে। ছাত্রদের বক্তব্য কি। সে নারী আন্দোলন, নারী আন্দোলনের এখনকার সবচেয়ে বড় ইস্যু কি, আমার লেখালেখি সম্পর্কে জানতে চাইল। এসব বিষয়ে আমি আমার গোলমেলে অবস্থান সম্পর্কে তাকে খুলে বললাম। এরপর সে তার নিজের সম্পর্কে বলতে লাগল- কিভাবে সে পার্টিতে যোগ দিল। তার স্বামীকে গত মে মাসে ভূয়া এনকাউন্টারের নামে হত্যা করা হয়েছে। নাসিক থেকে আটক করে তাকে ওয়ারাঙ্গলে নিয়ে যাওয়া হল হত্যার জন্য। তারা অবশ্যই তাতে নির্মমভাবে অত্যাচার করেছে হত্যার আগে। মাসী তার স্বামীর সাথে দেখা করার জন্য জঙ্গলে আসছিল এবং আসার পথেই শুনল তার গ্রেফতারের খবর। সেই থেকে সে এ জঙ্গলে আছে। এরপর দীর্ঘ সময় নিরবতার পর মাসী বলল কয়েক বছর আগে সে আরেকজনকে বিয়ে করেছিল। তাকেও এনকাউন্টারে হত্যা করা হয়েছে।
আমি বিছানায় সজাগ শুয়ে রইলাম। মাসির দীর্ঘ পুঞ্জিভূত বেদনার কথা ভাবছি। অনুষ্ঠান স্থল থেকে আসা ড্রাম এবং দীর্ঘ আনন্দের কোলাহল শুনছি। এবং চারু মজুমদারের দীর্ঘ যুদ্ধের কথা ভাবছি। দীর্ঘ যুদ্ধই হল মাও দলের শিক্ষা। এর ফলে মাওবাদীরা যখন শান্তি আলোচনার প্রস্তাব দেয় তখন সাধারণ মানুষ মনে করে এটি আসলে একটি ভাওতা। এর মাধ্যমে তারা আসলে পুনরায় সংগঠিত হওয়ার প্রস্তুতি নেয়। দীর্ঘ যুদ্ধের জন্য নতুন করে কৌশল করে। দীর্ঘ যুদ্ধ আসলে কি? এটি কি নিজেই একটি ভয়াবহ জিনিস না এ যুদ্ধের বৈশিষ্ট্যই এটি? দণ্ডকারণ্যের এ মানুষগুলো যদি গত ৩০ বছর ধরে যুদ্ধ না করত তবে কি তারা তাদের বর্তমান অস্তিত্ব ধরে রাখতে পারত?
শুধুমাত্র মাওবাদীরাই কি এ দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধের ধারণায় বিশ্বাসী? ভারত যে মুহুর্তে স্বাধীনতা লাব করেছেছে তখন থেকেই সে ঔপনিবেশিক/সাম্রাজ্যবাদী রূপ ধারণ করেছে। সে তার সীমানা বাড়িয়েছে, যুদ্ধ চালিয়েছে। কাশ্মীর, হায়দ্রাবাদ, গোয়া, নাগাল্যান্ড, মনিপুর, তেলাঙ্গানা, আসাম, পাঞ্জাব, নক্সালবাদী পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, অন্ধ্র প্রদেশ এবং উপজাতীয় অধ্যূষিত সমগ্র মধ্য ভারত জুড়ে যেখানেই রাজনৈতিক সমস্যা দেখা দিয়েছে ভারত সেখানে সামরিক শক্তি ব্যবহারে কখনো দ্বিধা করেনি। লক্ষ লক্ষ মানুষ হত্যা করা হয়েছে। হাজার হাজার মানুষকে নির্যাতন করা হয়েছে। আর আইনশৃঙলা বাহিনীর যেসব সদস্য এগুলো করেছে তাদেরকে হত্যা এবং নির্যাতনের দায় থেকে অব্যাহিত দেয়া হয়েছে। আর এসব করা হয়েছে গণতন্ত্রের মহানুভবতার মুখোসের আড়ালে। কাদের বিরুদ্ধে এ যুদ্ধ চালানো হয়েছে? মুসলমান, খ্রিস্টান, শিখ, সমাজতন্ত্রী, দলিত, উপজাতী এবং ঐসব দরিদ্র মানুষের বিরুদ্ধে যারা পাহাড়সম লুটপাটের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলার সাহস পায়না এবং তাদের প্রতি ছুড়ে মারা দুয়েকটি ত্রানের প্যাকেটেই খুসী থাকে। এটাতো খুবই স্পষ্ট যে ভারত একটি উচ্চ বর্ণের হিন্দুদের রাষ্ট্র এবং উচ্চ বর্ণের এই হিন্দুরা অন্যদের প্রতি স্বাভাবিকভাবেই ঘৃনা পোষন করে থাকে। ঔপনিবেশকি ধারামতই নাগা এবং মিজোদের যুদ্ধের জন্য পাঠানো হয়েছে ছত্তিশগড়ে, শিখদের কাশ্মীরে, কাশ্মীরীদের উড়িষ্যায় এবং তামিলদের আসামে। এভাবে অন্যান্য জেলায়ও পাঠানো হয়েছে। এটা যদি দীর্ঘ মেয়াদী যুদ্ধ না হয় তবে দীর্ঘ মেয়াদী যুদ্ধ আসলে কি?
উজ্জল স্লিগ্ধ রাত। সুখদেভ নিজে নিজে হাসছে। কম্পিউটারের মনিটরের আলো তার মুখের উপর পড়েছে। সে একজন কর্মপাগল লোক। আমি তার হাসির কারণ জানতে চাইলাম। সে জানাল, গত বছর ভূমকল উৎসবে একদল সাংবাদিক এসেছিল। তারা দুযেকদিন ছিল। একজন আমার একে (অক) বন্দুক নিয়ে ছবি তুলল । তারপর ফিরে গিয়ে আমাদের নামে লিখল ‘কিলিং মেশিন’। রাত শেষ হয়েছে কিন্তু নাচের উৎসব এখনো শেষ হয়নি। দিনের বিরতি চলছে। তবে এখনো লাইন ধরে শত শত লোক নেচে চলেছে। তারা থামতে চায়না। রাজু বলল গাট্টি বোস্তা না গোছানো পর্যন্ত থামবেনা।
আমি ডাক্তার কমরেডের কাছে গেলাম। নৃত্যমঞ্চের এক পাশে সে ছোট্ট একটি মেডিক্যাল ক্যাম্প খুলেছে। সে একা না হয়ে তার মত আরো ৩০ জন বা এক হাজার ডাক্তার থাকলে ভাল হত। আমি তাকে দণ্ডকারন্যের স্বাস্থ্য সেবা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। সে যে উত্তর দিল তাতে আমার রক্ত বরফ শীতল হয়ে যাবার অবস্থা। গেরিলা যোদ্ধাসহ অন্য যেসব সাধারণ নারী রোগী সে দেখেছে তাদের রক্তের হিমোগ্লোবিন ৫ থেকে ৬ এর মধ্যে। যেখানে ভারতের নারীদের এ মাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১১। দুই বছর ধরে যক্ষা নিয়ে ঘুরছে অনেকে। শিশু কিশেররা মারাত্মক পুষ্টিহীনতায় ভুগছে। মাতৃগর্ভে থাকতেই শিশুরা পুষ্টিহীনতায় ভোগে এবং এ পুষ্টিহীনতা নিয়েই সে জন্মায়। মাতৃদুগ্ধপান ছাড়ার পর তারা আর তেমন পুষ্টিকর কোন খাবার পায়না। এটি এখানে মহামারীর মত। ডাক্তার বলল, সে আগে অনেক গ্রামে কাজ করেছে কিন্তু এখানকার এরকম পরিস্থিতি আর কোথাও দেখেনি।
এছাড়া ম্যালেরিয়া, ক্ষয় রোগ, কান, দাত সমস্যাসহ আরো নানাবিধ জটিল রোগে ভুগছে মানুষ। পুষ্টিহীনতার কারণে এখানে নারীরা নানা জটিল মেয়েলী রোগে আক্রান্ত হচ্ছে এবং বছরের পর বছর তা বয়ে চলছে। কোন যুবতীরই ঠিকমত ঋতুস্রাব হয়না। এ বনে কোন কিনিক নেই। গাদচিরোলীতে একটি বা দুটি আছে। নাই কোন ডাক্তার, কোন ওষুধপত্ত। ডাক্তার এখন গেরিলা পোশাকে। কমরেড ডাক্তার। এ অবস্থায় যদি সে সরকারী লোকের হাতে ধরা পড়ে মৃত্যু অবধারিত।
কমরেড রাজু বলল এখানে বেশি সময় নিয়ে ক্যাম্প চালানো নিরাপদ নয়। আমাদের যাত্রা করতে হবে। বিদায়ের সময় চারিদিকে শুধু স্লোগান আর স্লোগান, ‘লাল লাল সালাম, লাল লাল সালাম, আবার একদিন দেখা হবে আমাদের, এই জঙ্গলে, এই দণ্ডকারণ্যে’ । তারা যখন বলে ‘আবার একদিন দেখা হবে আমাদের’ তখন তারা নিশ্চয়ই জানে ‘কোন দিন হয়ত আর তাদের দেখা হবেনা’। কমরেড নরমদা, কমররেড মাসী, কমরেড রূপী সবাই যার যার পথ বেছে নিল। তাদের সাথে আমারও হয়ত আর কোন দিন দেখা হবেনা।
আমরা আবার হাটা শুরু করলাম। দিনের তাপ ক্রমে বাড়তে লাগল। কমলা আমার জন্য টেন্ডু পাতায় একটি ফল সংগ্রহ করল। এটি তেতুলের মত টক। এবার আমরা একটি ঝর্নার কাছে ক্যম্প করলাম। নারী পুরুষ পালাক্রমে গোসল করল। সন্ধ্যায় রাজুর কাছে এক প্যাকেট ‘বিস্কুট’ আসল। বিস্কুটের এ প্যাকেট থেকে যেসব খবর বের হল সেগুলো হল:
ক্স ২০১০ সালের জানুয়ারির শেষ দিকে মনপর বিভাগে ৬০ জন ধরা পড়েছে এবং তাদের এখনো কোর্টে হাজীর করা হয়নি।
ক্স দক্ষিণ বাস্তারে বিপুল সংখ্যাক পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। তারা নির্বিচারে আক্রমন পরিচালনা করছে।
ক্স ২০০৯ সালের ৮ নভেম্বর বিজাপুর জেলার কাচলারাম গ্রামে দিরকো মাধকা (৬০) এবং কোভাসি সুকলু (৬৮) হত্যা করা হয়েছে।
ক্স ২৪ নভেম্বর পানগোড়ী গ্রামে মাধবী বামন (১৫)কে হত্যা করা হয়েছে।
ক্স ৩ ডিস্মেরব কোরেনজাদে মাধবী বাদরামকেও হত্যা করা হয়েছে।
ক্স ১১ ডিসেম্বর দারবা বিভাগে গুমিপাল গ্রামে ৭ জনকে হত্যা করা হয়েছে। তাদের নাম এখনো জানা যায়নি।
ক্স ১৫ ডিসেম্বর কোত্রাপাল গ্রামে ক্রান্তিকারী মহিলা সংস্থার ভিকো এবং মাধবী মাত্তি দুজনকেই হত্যা করা হয়েছে।
ক্স ৩০ ডিসেম্বর ভেচাপাল গ্রামে পিতা পুত্র পুনেম পন্ডু এবং পুনেম মটু দুজনকেই হত্যা করা হয়েছে।
ক্স জানুয়ারি মাসে( তারিখ অজানা) কাইকা গ্রামে জনতা সরকার প্রধানকে হত্যা করা হয়েছে।
ক্স ৯ জানুয়ারি সুপাঙ্গুদেন গ্রামে ৪ জনকে হত্যা
ক্স ১০ জানুয়ারি পুল্লেম পুল্লাদী গ্রামে, ৩ জনকে হত্যা, নাম জানা যায়নি এখনো।
ক্স ২৫ জানুয়ারি ইন্দ্রাবতী এলাকায় তাকিলো গ্রামে ৭ জনকে হত্যা।
ক্স ১০ ফেব্রুয়ারী কুমলীকে ধর্ষনের পর হত্যা করা হয়েছে অবুজমদের দুমনার গ্রামে। সে পাইভার গ্রামের মেয়ে।
ক্স ইন্দো-তিব্বত সীমান্তের ২ হাজার বাহিনী রাজনন্দগাও বনে ক্যাম্প স্থাপন করেছে।
ক্স কঙ্কারে পাঁচ হাজার অতিরিক্ত বিএসএফ মোতায়েন করা হয়েছে।
কয়েকটি পত্রিকা এবং পেপারকাটিংও আসল রাজুর কাছে। বিভিন্ন পত্রিকায় নক্সালীদের বিষয়ে অনেক খবর রয়েছে। একটি খবরের হেডলাইন “নির্মূল কর, হত্যা কর এবং আত্মসমর্পনে বাধ্য কর” । এর নিচে লেখা রয়েছে “আলোচনার জন্য গণতন্ত্রের দরজা সবসময় খোলা রয়েছে”। আরেকটি খবরের হেডলাইন হল “মাওবাদীরা অর্থের জন্য গাজা চাষ করছে।” আমরা যে এলাকায় ক্যাম্প স্থাপন করেছিলাম এবং যেসব এলাকা দিয়ে হেটে গিয়েছি সেসব এলাকা সম্পর্কে একটি পত্রিকার সম্পাদকীয়তে লেখা হয়েছে “সেসব এলাকা এখন সম্পূর্ণরুপে পুলিশের নিয়ন্ত্রনে।”
যুবকরা এসব পেপারকাটিং নিয়ে পড়া প্রাকটিস করতে লাগল । তারা ঘুরে ঘুরে রেডিওর ঘোষনার মত এসব খবরের হেডলাইন এবং খবর পড়তে লাগল।
নতুন আরেকটি দিন, নতুন জায়গা। আমরা উসির গ্রামের বাইরে বিরাট একটা মহুয়া গাছের নিচে ক্যাম্প করলাম। মহুয়া গাছে কেবল ফুল ফুটতে শুরু করেছে। বিবর্ণ সবুজ ফুল বনমাঝে ঝরে ঝরে পড়ছে । বাতাসে ফুলের গন্ধে মাথা ঝিম ঝিম করে। আমরা ভাতপাল স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের জন্য অপো করছি। অংনার এনকাউন্টারের পর স্কুলটি বন্ধ করে দিয়ে পুলিশ ক্যাম্পা বানানো হয়েছে। শিশুদের বাড়ি পাঠানো হয়েছে। এরকম ঘটনা নেলবাদ, মঞ্জিমেত্তা, এদকা, ভেদোমাকোট এবং ধানোরায় ঘটেছে।
ভাতপাল স্কুলের শিশুদের দেখা মিললনা। কমরেড নিতি (মোস্ট ওয়ান্টেড) এবং কমরেড বিনোদ আমাকে বেশ দূরে সেচ প্রকল্প দেখাতে নিয়ে গেল। এটি জনতা সরকার করেছে। কমরেড নিতি তাদের কৃষির সমস্যার কথা জানাল। মাত্র ২ ভাগ জমি সেচের আওতাধীন আছে। অবুজমদে ১০ বছর আগেও জমি চাষ শব্দ বলতে কিছু ছিলনা। গাদচিরোলীতে হাইব্রিড আর কীটনাশক তাদের জীবন প্রণালী ধ্বংস করে চলেছে। নিতি বলল, আমাদের কৃষি বিভাগের জরুরি সাহায্য দরকার। বীজ, অর্গানিক চাষ সম্পর্কে ধারণা আছে এমন লোক দরকার আমাদের। অল্প পরামর্শ পেলেই এখানকার লোকজন অনেক কিছু করতে পারত।
কমরেড রাজু জনতা সরকার এলাকায় চাষাবাদ দেখাশুনা করে। সে বেশ গর্বের সাথে আমাদেরকে তাদের চাষাবাদের এলাকা এবং ফল ফসল দেখাল। এরপর একই উৎসাহের সাথে সে আমাদের আরেকটি শুকনো পুকুর দেখাল যা চাষ প্রকেল্পর অংশ হিসেবে করা হয়েছিল। রাজু বলল এটাতে এমনকি বর্ষাকালেও পানি থাকেনা। কারণ এটা ভুল জায়গায় খনন করা হয়েছে। সে হেসে বলল, “এটি আমরা করিণি। লুটি সরকার করেছে এটি ।” যে সরকার লুট করে তাকে তারা লুটি সরকার বলে। এখানে দুটি সরকার আছে-একটি জনতা সরকার আরেকটি লুটি সরকার।
আমি কমরেড বেনুর কথা ভাবছিলাম। সে আমাকে বলল, আমরা তাদের এলাকার খনি তুলে নিয়ে যাচ্ছি শুধু এ কারণে তারা আমাদের ধ্বংস করতে চায়না। বরং আমরা বিশ্বে যে বিকল্প মডেল খাড়া করেছি সেজন্য তারা আমাদের ধ্বংস করতে চায়। তবে মাওবাদীদের ‘বন্দুকধারী গ্রাম স্বরাজ’ এখনো কোন বিকল্প মডেল হয়ে ওঠেনি। মানুষ এখানে অনেক ুধার্ত, রোগাক্রান্ত। কিন্তু বিকল্প সম্ভাবনা এখানে অবশ্যই তৈরি হয়েছে। সমগ্র বিশের জন্য নয়, আলাস্কার জন্য বা দিল্লীর জন্যও নয়, বা সমগ্র ছত্তিশগড়ের জন্যও নয় হয়ত। কিন্তু তাদের নিজেদের জন্য এটি একটি বিকল্প হিসেবে গড়ে উঠেছে। অন্তত দন্ডকারন্যের জন্য। এটা বিশ্বের সবচেয়ে গোপনীয় বিষয়। আমরা নিজেদের ধ্বংসের জন্যই নিজেরা বিকল্প ভিত্তি স্থাপন করেছি। আমাদের এই অদ্ভুত ধ্বংসলীলার বিরুদ্ধে এই পাহাড়ীরা নিজেরা নিজেদের টিকে থাকার রাস্তা বের করেছে। এর এখন সাহায্য দরকার, পরিকল্পনা দরকার, ডাক্তার, শিক, কৃষক দরকার।
তাদের যুদ্ধের দরকার নেই। কিন্তু যুদ্ধই যদি চাপিয়ে দেয়া হয় তবে তা পেছনেই নিয়ে যাবে।
পরের কয়েক দিন আমি ক্রান্তিকারি মহিলা সংস্থার সদস্য, জনতা সরকারের পিওন, দন্ডকারন্যের আদিবাসী কিষান মজদুর সংস্থার সদস্যদের সাথে কথা বললাম। এছাড়া যেসব সাধারণ পরিবারের সদস্যদের হত্যা করা হয়েছে তাদের অনেকের সাথেও দেখা করলাম।
আমি সুখিয়ারি, সুকদাই এবং সুক্কালি নামের তিন বোনের সাথে দেখা করলাম। তাদের বাড়ি নারায়নপুর জেলায়। তারা সবাই ৪০ এর ঘরে। গত ১২ বছর ধরে তারা ক্রান্তিকারি সংস্থার সাথে আছে। থানা পুলিশ মোকাবেলা করতে হলে গ্রামবাসী তা এই তিন বোনের মাধ্যমে করে। দুই থেকে তিনশ পুলিশ দল বেধে গ্রামে আসে। তারা সব কিছু চুরি করে নিয়ে যায়। অলঙ্কারাদি, হাস মুরগী, পশুপাখি, ডিম, শুকর, হাড়িপাতিল, থালা বাসন তীর ধনুক যত আছে সবই তারা নিয়ে যায়। কোন কিছু বাদ রাখেনা। সুক্কালী বলল, এমনকি একটি ছুরি পর্যন্ত রেখে যায়না। তাদের বাড়ি দুইবার জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে। একবার নাগা বিদ্রোহীরা এবং আরেকবার সিআরপিএফ। সুখিয়ারী একবার সাত মাস জেল খেটেছে জগদলপুরে। নক্সালবাদীদের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে একবার তারা গ্রামের সব পুরুষ ধরে নিয়ে গেল। সুখিয়ারী অন্য মেয়েদের নিয়ে থানা ঘেরাও করল। যাদের গ্রেফতার করা হয়েছে তাদের না ছাড়া পর্যন্ত তারা থানা থেকে যেতে অস্বীকার করল। সুকদাই বলল যখনই কেউ গ্রেফতার হবে তাকে সাথে সাথে ছিনিয়ে আনতে হবে পুলিশ রিপোর্ট করার আগে। একবার যদি কারো নাম পুলিশের খাতায় ওঠে তবে তার আর রে নেই।
সুখিয়ারিকে শিশু বয়সে অপহরণ করে বয়স্ক এক লোকের সাথে জোর করে বিয়ে দেয়া হয়। সেখান থেকে সে পালিয়ে যায় বোনের বাড়ি। সেখানেই বাস করতে থাকে। এখন সে বড় বড় সমাবেশের আয়োজন করে। বক্তব্য দেয়। পুরুষেরা এখন তার ওপর নির্ভরশীল নিজেদের রক্ষার জন্য। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, পার্টি তার কাছে কি অর্থ বহন করে, পার্টিকে সে কি হিসেবে নিয়েছে। সে উত্তর দিল পার্টি তার কাছে পরিবারের মত। আমরা যখন কোন আক্রমনের খবর পাই তখন মনে করি আমাদের পরিবারেরই কারো ওপর আক্রমন করা হয়েছে।
আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম সে মাওকে চেনে কিনা। সলজ্জ হাসিতে বলল, সে একজন নেতা ছিলেন। আমরা তার দর্শন মতে কাজ করি। আমি কমরেড সোমারি গ্যদি’র সাথে দেখা করলাম। তার বয়স ২০ । এ বয়সেই সে জগদলপুরে ২ বছর জেল খেটেছে। কমরেড নিতির খোঁজে যেদিন ৭৪০ জন পুলিশ ইনার গ্রাম ঘেরাও করে অভিযান চালায় সেদিন সোমারি সেখানে ছিল। কমরেড নিতি এ গ্রামে রয়েছে এ খবরের ভিত্তিতে ২০০৭ সালের ৮ জানুয়ারি পুলিশ এ অভিযান চালায়। পুলিশ ঘেরাও করার আগেই সোমারি সেখান থেকে সরে গিয়েছিল। কিন্তু সোমারি যে গেরিলা দলের সদস্য সে মিলিশিয়া বাহিনী তখনো সেখানে ছিল। খুব ভোরে পুলিশ গুলি ছোড়া শুরু করে। সুখলাল এবং কাচরো নামের দুটি বালককে তারা হত্যা করল। এরপর সালাম, রনি এবং সোমারী পুলিশের হাতে ধরা পড়ল। সালাম ও রনিকে হাত পেছনে বেঁেধ পুলিশ গুলি করে হত্যা করল। সোমারি মৃত্যু থেকে মাত্র এক ইঞ্চি দূরে ছিল। তাকে পলিশ ধরে অনেক পিটিয়েছে প্রথম। তারপর একটি ট্রাক্টরের পেছনে একটি বাক্সমত বেঁধে তার মধ্যে মৃতদেহদুটি রাখাল তারা। সোমারিকে মৃতদেহদুটির ওপর বসিয়ে নারায়নপুরে নিয়ে যায় পুলিশ।
আমি কমরডে দিলিপের মা চামরির সাথে দেখা করলাম। দিলিপকে ২০০৯ সালের ৬ জুলাই গুলি করে মারা হয়েছে। চামরি বলল, পুলিশ দিলিপকে মারার পর দড়ি দিয়ে বেঁধে টেনে নিয়ে গেল। যে পুলিশ যত বেশি হত্যা করতে পারবে সে তত বেশি নগদ অর্থ পাবে রাষ্ট্র থেকে। সেজন্য মৃতদেহ তাদের কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ। অন্য কোন পুলিশ যেন আবার তাকে হত্যার দাবি করতে না পারে সেজন্য তারা মেরে সাথে সাথে লাশ নিয়ে যায়। দিলিপের লাশ যখন পুলিশ নিয়ে যাচ্ছিল তখন চামরি পুলিশের পেছনে পেছনে সারা পথ দৌড়ে থানা পর্যন্ত গেল। তারা যখন দিলিপকে নিয়ে থানায় পৌছল তখন দিলিপের গায়ে এক টুকরো পোশাকও ছিলনা। চামরি বলল, দিলিপকে টেনে নেয়ার পথে পুলিশ তাকে রাস্তার পাশে রেখে একটি দোকানে বসে চা বিস্কুট খেল। তারা দোকানে চা নাস্তা খেয়ে কোন পয়সা দেয়নি। মায়ের সামনে যখন পুত্রের লাশ দড়ি দিয়ে বেঁধে জঙ্গলের মধ্য দিয়ে টেনে হিচড়ে নিয়ে যায় এবং টানার চোটে গায়ের জামা ছিড়ে যায় আর হত্যাকারীরা দোকানে বসে আবার চা বিস্কুট খায় তখন এই মায়ের অবস্থা কি হয়েছিল তা একবার ভেবে দেখুন। সৎকার করার জন্য এ মা তার ছেলের লাশটি ফেরত পায়নি। ঐদিন আরো যাদের হত্যা করে পুলিশ তাদের সকলকে একটি গর্তে পুতে রাখা হয় । পুলিশ হতভাগা এ মাকে তার ছেলের গায়ে শুধু এক মুষ্টি মাটি ফেলতে দিয়েছিল। চামরি বলল সে এর বদলা চায়। রক্তের বদলা রক্ত।
মাসকোলা জনতা সরকার ৬টি গ্রাম চালায়। আমি মাসকোলা জনতা সরকারের সদস্যদের সাথে দেখা করলাম। তারা আমাকে একটি পুলিশী অভিযানের ঘটনা শোনাল। তারা রাতে আসল। তিনশ, চারশ এবং এক হাজার পুলিশের তিনটি দল আসল। তারা পুরো গ্রাম ঘেরাও করে অপেক্ষা করতে লাগল। যে ব্যক্তি সবার আগে ঘুম থেকে উঠে ক্ষেতে কাজের জন্য রওয়ানা দিল তাকে পুলিশ গ্রেফতার করল। তাকে মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার করল গ্রামে প্রেবেশের জন্য। বুবি ফাঁদ কোথায় আছে তা দেখিয়ে দেয়ার জন্য লোকটিকে তারা সাথে নিয়েছে এমন একটা ভাব দেখাল পুলিশ। ( গোন্ডি ভাষায় বুবি ট্রাপস বা বুবি ফাঁদ এখন একটি শব্দে পরিণত হয়েছে। কেউ যখন এটি বলে বা শোনে তখন সবাই হাসে। সারা বনে বুবি ফাঁদ পাতা আছে। কিছু সত্য কিছু মিথ্যা। অনেক সময় এ বুবি ফাঁদ এড়াতে মাও গেরিলাদেরও অন্যের সাহায্য নিতে হয়)। পুলিশ যখন গ্রামে প্রবেশ করে তখন তারা প্রত্যেক ঘরে ঘরে লুটপাট করে। এরপর সেগুলো জ্বালিয়ে দেয়। তারা সাথে কুকুর নিয়ে আসে। যারা পালিয়ে যায় তাদের পেছনে কুকুর লেলিয়ে দেয়া হয়। মুরগী, শুকর যা কিছু থাকে পুলিশ মেরে মেরে বস্তায় ভরে নিয়ে যায়। পুলিশের সাথে এসপিওরাও আসে। এসপিওরা যানে কোথায় টাকা পয়সা এবং গয়নাগাটি লুকিয়ে রাখা হয়। তারা লোকদের ধরে ধরে নিয়ে যায়। যতক্ষনে টাকা বের করে না দেয়া হয় ততক্ষন তাদের ছাড়া হয়না। পুলিশ সবসময় সাথে কিছু নক্সালবাদীদের ড্রেস রাখে। সাধারণ মানুষকে হত্যা করে তারা তাদেরকে নক্সালবাদী সাজায় এ পোশাক পরিয়ে। যেহেতু নক্সালীদের মারতে পারলে নগদ অর্থ পুরস্কার পাওয়া যায় তাই তারা এভাবে সাধারণ মানুষও হত্যা করে নক্সালী বলে চালিয়ে দেয়। ফলে সাধারণ মানুষ বাড়িতে থাকতে পারে তাদের ভয়ে।
শান্ত এই বনের জীবনযাত্রায় এখন রয়েছে সামরিকায়নের পূর্ণ প্রভাব। জনাসাধারণ কর্ডন, সার্চ, ফায়ারিং, এ্যাডভান্স, রিট্রিট, ডাউন, এ্যাকশন শব্দগুলোর সাথে পরিচিত। গেরিলাদের পাহাড়া ছাড়া সাধারণ মানুষ ফসল কাটতে পারেনা। বাজারে গিজ গিজ করছে পুলিশের সোর্স। পুলিশের সোর্সদের মুখবির বলা হয়। পুলিশ মোটা অর্থের লোভ দেখিয়ে তাদেরকে গ্রাম থেকে বের করে এনেছে। আমাকে বলা হল এখানে নারায়নপুরে মুখবিরদের একটি কলোনী আছে। সেখানে চার হাজার মুখবির থাকে। এদের কারণে এখন আর কোন পুরুষ বাজারে যেতে পারেনা। মহিলারা যায়। কিন্তু তাদের ওপর তীখ্ন নজর রাখা হয়। তারা অতিরিক্ত কোন কিছু কেনাকাটা করলে পুলিশ বলে এগুলো তারা নক্সালীদের জন্য কিনেছে। জনসাধারণের কাছে ওষুধ বিক্রি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সামান্য পরিমান ওষুধ বিক্রির অনুমতি দেয়া হয়। রেশনে চাল, ডাল, তেল চিনি কেরোসিন কেনার ব্যবস্থা আছে সাধারণ মানুষের জন্য। কিন্তু এগুলো সব পুলিশ ক্যাম্প বা পুলিশ স্টেশনের কাছে। ফলে কেউ তা কিনতে যেতে পারেনা।
গণহত্যা প্রতিরোধ এবং শাস্তি বিষয়ক জাতিসংঘের ২ নং ধারায় বলা হয়েছে: কোন জাতি, গোষ্ঠী, সম্প্রদায় এবং ধর্মীয় অনুসারীদেরকে সম্পূর্ণ বা আংশিক ধ্বংস সাধানের জন্য নিচের যেকোন একটি অপরাধ সংঘটিত করলে তা গণহত্যা হিসেবে গণ্য হবে। অপরাধগুলো হল: কোন দলের সদস্যদের হত্যা করা। কোন দলের সদস্যদের শারিরীক বা মানসিকভাবে বিরাট ক্ষতি সাধন করা। কোন সম্প্রদায়কে সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে নির্দিষ্ট কোন সময়ের মধ্যে বিনাস সাধনের লক্ষ্যে পরিকল্পিতভাবে কোন কিছু পরিচালনা করা বা আরোপ করা। এরূপ বিনাস সাধনের লক্ষ্যে জন্মহার নিয়ন্ত্রন ব্যবস্থা তাদের ওপর চাপিয়ে দেয়া। অথবা এক সম্প্রদায়ের শিশুদের জোর করে অন্য সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রবেশ করানো ।
হাটার মজা এখন আমি অনুভব করা শুরু করছি। হাটতে হাটতে কান্ত হয়ে পড়েছি। কমলা আমাকে গরম পানি দিল। অন্ধকারে গাছের আড়ালে আমি গোসল সারলাম। আমি রাতের খাবার খেতে পারলামনা এবং হামাগুড়ি দিয়ে বিছানায় প্রবেশ করলাম। কমরেড রাজু ঘোষনা করল আমাদের এ স্থান ত্যাগ করতে হবে। এরকম প্রায়ই ঘটে। কিন্তু আজকের রাতের জন্য এটি বেশ কষ্টকর বিষয়ে পরিণত হল। আমরা একটি খোলা মাঠে ক্যাম্প স্থাপন করেছিলাম। চারদিকে গোলার আওয়াজ শুনতে পেলাম। আমরা ছিলাম ১০৪ জন। আবার রাতে লাইন ধরে হাটা শুরু হল। ১১টা পার হয়ে গেল। রাত যাপনের জন্য শেষে একটা জায়গায় পৌছানো গেল। ঘুমানোর আনুষ্ঠানিকতা সেরে একজন বিবিসি চালু করল। পশ্চিমবঙ্গের লালগড়ে ইস্টার্ন ফ্রন্টিয়ার রাইফেলস ক্যাম্পে হামলার খবর প্রচারিত হল। ৬০ জন মাওবাদী মটরসাইকেলযোগে হামলা চালিয়েছে। চার পুলিশ নিহত। মাওবাদীরা অস্ত্র ছিনিয়ে নিয়েছে। খবর শুনে ক্যাম্পে সবার মনে আনন্দিত হয়ে উঠল। মাও নেতা কিশানজির সাক্ষাৎকার প্রচার হল। এসব হামলা বন্ধ করে কবে আপনারা শান্তি আলোচনায় ফিরবেন এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বললেন, অপারেশন গ্রীনহান্ট বন্ধ করা হোক। যেকোন সময় আলোচনায় বসব। চিদাম্বরামকে বলুন, আমরা আলোচনায় বসতে রাজি। পরের প্রশ্ন: এখন রাত। আপনারা ল্যান্ডমাইন পুতে রেখেছেন। আইনশৃঙখলা বাহিনী পুনমোতায়েন করা হয়েছে। আপনরা কি তাদের ওপরও আক্রমন চালাবেন কিশানজী? অবশ্যই । তা নাহলে জনগণ আমাকে মেরে ফেলবেনা? একথা শুনে সবাই হাসল। সুখদেব বলল, ওরা সবসময় ল্যান্ডমাইন বলে। আসলে আমরা ল্যান্ডমাইন ব্যবহার করিনা। আমরা আই ই ডি ব্যবহার করি।
হাজার তারকা হোটেলের আরেকটি বিলাসবহুল সুটে আমি আছি। আমি অসুস্থ বোধ করছি। বৃষ্টি শুরু হল। কমলা আমার দিকে প্লাস্টিকের পাটি নিক্ষেপ করল। সবাই প্লাস্টিক পাটি শরীরে পেচিয়ে তার মধ্যে লম্বা হয়ে শুয়ে রইল। সকাল নাগাদ লালগড়ে ২১জন মৃত্যুর খবর পাওয়া গেলে। আরো ১০ জন নিখোঁজ। এখান থেকে আমাদের চলে যাওয়া ঠিক হবে কিনা তা নিয়ে চিন্তা করছে রাজু। আমরা বিকাল পর্যন্ত এখানেই রইলাম।
এক রাতে সবাই একটি আলোর কাছে জড়ো হল। কমররেড সুখদেবের ছোট কম্পিউটারটি সৌরবিদ্যুতে চালানো হয়েছে। তারা ‘মাদার ইন্ডিয়া’ দেখছে। কমলাকে তেমন খুসী মনে হলনা। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম সিনেমা দেখা পছন্দ করে কিনা। ‘না দিদি। শুধু গোপন হামলার ভিডিও।’ গোপন হামলার ভিডিও বিষয়ে আমি কমডে সুখদেবের কাছে জানতে চাইলাম। চোখের পলক ফেলার আগে সে আমার জন্য একটি এ জাতীয় ভিডিও চালু করল।
দৃশ্যগুলো এরকম: দণ্ডকারন্যে গোলাগুলি চলছে।, নদী, ঝর্ণা সব জায়গায় গোলাগুলি। গাছের ডালের একটি কোজ আপ (কাছ থেকে নেয়া) দৃশ্য। ডালে একটি পাখি ডাকছে। হঠাৎ করে একজন কমরেডের দেখা মিলল পর্দায়। সে একটি আই ই ডিতে তারের সংযোগ করল। এরপর শুকনো পাতার মধ্যে সেটি লুকিয়ে রাখল। মটরসাইকেলের একটি বহর আই ই ডি’র ওপর দিয়ে যাওয়া মাত্র সেটি বিষ্ফোরিত হল। মটরসাইকেল উড়ে গেল। ছিন্নভিন্ন দেহ । মটরসাইকেল জলছে। তাদের সাথে থাকা অস্ত্রগুলো ছিনিয়ে নেয়া হল। তিনজন পুলিশকে মুহুর্তে বেঁেধ ফেলা হল। হতবিহবল পুলিশের চেহারা পাথরের মত শক্ত হয়ে রয়েছে।
এসব ঘটনা কে ভিডিও করছে? কে এ জাতীয় অপারেশনের নির্দেশনা দিচ্ছে? আমি উত্তর পেলাম: কমরেড বেনু। সে-ই ধৃত পুলিশ অফিসারদেরও ছেড়ে দিয়েছে পরে। কমরেড সুখদেব বলল এটা কুদুর অপারেশনের ঘটনা।
রাজুর কাছে একটি ভিডিও আর্কাইভ আছে। তাতে সরকারি বাহিনী কর্তৃক গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়ার দৃশ্য, প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষাৎকার এবং মৃতদের আত্মীস্বজনদের সাক্ষাৎকার রেকর্ড করা আছে। জ্বালিয়ে দেয়া একটি বাড়ির দেয়ালে লেখা রয়েছে “নাগা! বর্ণ টু কিল!” ছোট্ট একটি বালকের দৃশ্য দেখা গেল । তার হাতের আঙ্গুল কাটা। বাস্তারে সরকার যে অপারেশন গ্রীন হান্ট শুরু করেছে তার উদ্বোধন করা হয়েছে এ বালকের আঙ্গুল কেটে। তাদের আর্কাইভে আমার একটি সাক্ষাৎকারও আছে! আমার লেখাপড়া, আমার বই এসবও । আশ্চর্য!
রাতে রেডিওতে নক্সালীদের আরেকটি আক্রমের খবর আসল। বিহারের জামুইতে এ হামলা হয়েছে। খবরে বলা হয়েছে ১২৫ জন মাওবাদীদের একটি দল কোরা উপজাতীয়দের একটি গ্রামে হামলা করে ১০ জনকে হত্যা করেছে। কারণ তারা পুলিশকে মাওবাদীদের বিষয়ে তথ্য দিয়েছে এবং তাদের তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশের হামলায় ৬ জন মাও গেরিলা নিহত হয়েছে। অবশ্য আমরা জানি গণমাধ্যমের এ খবর সত্যও হতে পারে মিথ্যাও হতে পারে। খবর সত্য হলে এটা ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ। কমরেড রাজু এবং সুখদেবের চেহারায় অস্বস্তির ছাপ দেখা গেল।
বিহার এবং ঝাড়খন্ড থেকেও অস্বস্তিকর খবর আসতে লাগল। পুলিশ সদস্য ফ্রাঙ্কিস ইন্দুভারের মস্তকহীন বিভৎস ছবির দৃশ্য এখনো সবার মনে আছে। এ ঘটনা স্মরন করিয়ে দিচ্ছে সশস্ত্র যুদ্ধরত একটি বাহিনীর শৃঙ্খলা কত সহজে ধ্বংস হয়ে যেতে পারে । জড়িত হতে পারে জঘন্য অপরাধের সাথে । এমনকি এ শৃঙ্খলা থেকে বের হয়ে তারা নোংরা জাতিগত, বর্ণবাদ এবং ধর্মভিত্তিক সাম্প্রদায়িক লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়তে পারে। এইভাবে অবিচার এবং বৈষম্যকে প্রাতিষ্ঠানকীকরণের মাধ্যমে ভারত রাষ্ট্র আজ একটি ভয়ানক অশান্তির দাবানলে রূপান্তরিত হয়েছে। সরকার যদি মনে করে থাকে পরিকল্পিতভাবে মাও নেতাদের হত্যা করে তাদের মস্তকহীন করতে পারলে সন্ত্রাস থেমে যাবে তবে তারা সম্পূর্ণ ভুল পথে আছে। এতে সন্ত্রাস আরো ছড়িয়ে পড়বে এবং ঘনীভূত হবে এবং এক পর্যায়ে সরকার আলোচনার জন্য আর কাউকে খুঁজে পাবেনা।
শেষের কয়েকটা দিন আমরা নয়নাভিরাম ইন্দ্রাবতীর তীরে ঘন সবুজ বনবাদাড় আর ফুলবনে ঘুরে বেড়ালাম। পাহাড়ের কোলঘেষে হাটার সময় আমরা নদীর অপর তীরে আমাদেরই মত একটি দলকে একই দিকে লাইন দিয়ে হাটতে দেখলাম। আমাকে বলা হল তারা ড্যাম নির্মানের বিরুদ্ধে একটি প্রতিবাদ সমাবেশে যোগ দিতে কুদুর গ্রামে যাচ্ছে। তাদের কাছে কোন অস্ত্রশস্ত্র নেই। তারা সাধারণ গ্রামবাসী। আমি একটি নৌকার মাধ্যমে নদী পার হয়ে তাদের সাথে যোগ দিলাম।
বোধঘাটে যে ড্যাম নির্মিত হবে তাতে পুরো এলাকা পানির নিচে তলিয়ে যাবে যতদিন এ ড্যাম থাকবে। আমরা যেসব এলাকায় এ কয়দিন চলাফেরা করছি সেসব এলাকও পানির নিচে চলে যাবে। সব বন জঙ্গল, সব ইতিহাস, মানুষের সব কাহিনী পানির নিচে হারিয়ে যাবে। কমপক্ষে একশ গ্রাম গ্রাস করবে এ পানি। এ কেমন পরিকল্পনা? মানুষকে ইদুরের মত চুবিয়ে মেরে লোহান্দিগুদার স্টিল কারখানা এবং কেশলাল ঘাটে বক্সাইট আর এলুমিনিয়াম রিফাইন করার জন্য ব্যবহার করা হবে এ নদী?
জনসভায় দূর দূরান্ত থেকে আসা লোকজন সেসব কথাই বলল যা আমরা বছরের পর বছর ধরে শুনে আসছি। তারা বলল, আমরা ডুবে মরব তুব এ স্থান ছাড়বনা। দিল্লীর একজন লোক তাদের সাথে আছে দেখে তারা খুসী হল। আমি বললাম দিল্লী একটি নির্দয় শহর। তারা আপনাদের সম্পর্কে কিছু জানেওনা এবং ভাবেওনা।
দণ্ডকারণ্যে আসার মাত্র এক সপ্তাহ আগে আমি গুজরাট যাই। সরদার সারোভার ড্যাম এখন এর পূর্ণ উচ্চতায় পৌছেছে। এ বাঁধ নির্মিত হলে যেসব ক্ষতির হবার কথা নর্মদা বাঁচাও আন্দোলন আগে থেকেই বলে আসছিল তার প্রত্যেকটিই বাস্তবে পরিণত হয়েছে। যাদের ঘরবাড়ি থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছে তাদের পুনর্বাসন করা হয়নি। খাল নির্মান করা হয়নি। নর্মদা নদীর পানি সরিয়ে নিয়ে সবরমতি নদীর শূণ্য তলদেশে ফেলা হচ্ছে। অনেক আগে সবরমতি নদীতে ড্যাম নির্মান করে তার এ দশা করা হয়েছে। নদীর অধিকাংশ পানি শহরবাসী এবং শিল্প কারখানার কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। বাঁধ দিয়ে পানি প্রত্যারের ফলে লবনাক্ত পানি অনেক উপরের দিকে উঠে এসেছে।
একসময় বিশ্বাস করা হত বড় বড় বাঁধ হল আধুনিক ভারতের মন্দির। একথা বলে মানুষকে বিভ্রান্ত করা হয়েছে। এর কারণ অবশ্য অজানা নয়। কিন্ত সেসব বড়বড় ড্যাম হয়ে যাবার পর এখন বলতে হবে বড় বড় ড্যাম হল মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ।
স্থানীয় জনসাধারণের প্রতিবাদের মুখে ১৯৮৪ সালে বোধঘাট ড্যামের কাজ স্থগিত হয়। কিন্তু এখন এটা কে থামাবে। ভিত্তি প্রস্তর স্থাপনে কে আছে বাঁধা দেয়ার? ইন্দ্রাবতী নদীর এভাবে চুরি হয়ে যাওয়া কে রোধ করবে? কাউকে অবশ্যই এগিয়ে আসতে হবে। কেউ অবশ্যই বাঁধা দেবে।
শেষ রাতে আমরা খাড়া একটি পাহাড়ের পাদদেশে ক্যাম্প করলাম। এ পাহাড় পার হয়ে সকালে আমি একটি রাস্তায় যাব। সেখান থেকে আমাকে কেউ একজন মটরসাইকেলে তুলে নেবে। বনে যখন প্রবেশ করি সেসময়কার দৃশ্যের সাথে বর্তমানে বনের অনেক অমিল। এ কয়দিনে অনেক পরিবর্তন হয়ে গেছে। আম গাছে মুকুল এসেছে। কুদুর গ্রাম থেকে এক পাতিল তাজা মাছ পাঠানো হল ক্যাম্পে। আমার জন্য একটি তালিকা পাঠিয়েছে। তাতে ৭১ ধরনের ফল, সব্জি, ডাল, চাষ করা পোকামাকড়ের নাম রয়েছে।
আমার আইপড থেকে তার কম্পিউটারে গান ডাউনলোড করা যাবে কিনা জানতে চাইল সুখদেব। আমরা ইকবাল বানুর রেকর্ড করা একটি গান শুনলাম। সে ফয়েজ আহমেদ ফয়েজের “হাম দেখেঙ্গে” (একদিন আমরা দিনটি দেখব) গানটি গাইল। জিয়াউল হকের দমন পীড়ন যখন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌছল তখন লাহোর কনর্সার্টে ফয়েজ আহমেদ এ গানটি গেয়েছিলেন।
গানটি এরকম :
“জাব আহ্ল-ই- সাফা- মারদুদ-ই-হারাম
মসনদ পি বিদায়ে জায়েঙ্গে
সব তাজ উচ্ছলে জায়েঙ্গে
সব তখত গিরায়ে জায়েঙ্গে
হাম দেখেঙ্গে”
(যখন প্রতিবাদ আর ঘৃনা তার চুড়ান্ত স্তরে পৌছবে
তখন মসনদ উড়ে যাবে
সব রাজ মুকুট ছিনিয়ে নেয়া হবে
তখতে তৌস ওলটপালট হয়ে যাবে
একদিন আমরা সেদিনটি দেখব)
লাহোরের সে কনসার্টে উপস্থিত ৫০ হাজার লোক স্লোগান দিল “ইনকিলাব জিন্দাবাদ, ইনকিলাব জিন্দাবাদ”। এত বছর পরে আবার এই জঙ্গলে সেই গান প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। কি করে তাদের মধ্যে এ বন্ধন হল! আশ্চর্যের বিষয় বটে।
যারা বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে এবং কোন দ্রব্য সামগ্রী দিয়ে মাওবাদীদের সাহায্য করবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পরোক্ষভাবে তাদের হুমকি দিয়েছেন। সুখদেব আমার কাছ থেকে গান ডাউনলোড করতে চাইল। তাদের এ গান প্রদান করা কি এ হুমকির আওতায় পড়ে?
সকালে আমি কমরেড মাধব, জরি, মংট ু এবং অন্যদের বিদায় জানালাম। চান্দু মটরসাইকেলের যোগাড়ে গেছে। সে আমাকে মূল রাস্তায় পৌছে দেবে। কমরেড রাজু আমার সাথে আসছেনা। তার পায়ে ব্যাথা। উচু পাহাড় সে পাড়ি দিতে পারবেনা। কমরেড নিতি (মোস্ট ওয়ান্টেড), সুখদেব, কমলা এবং অন্য পাঁচজন আমার সাথে আসল আমাকে পাহাড় ডিঙ্গাতে সহায়তার জন্য। একঘন্টা লাগল পাহাড় পারি দিতে। আমরা একটি পাথুরে জায়গায় বসলাম। নিচে যানবাহনের শব্দ শোনা যাচ্ছে। কিন্তু আমাদের বাইরে থেকে দেখার কোন উপায় নেই। গোপন হামলা পরিচালনার জন্য খুব ভাল জায়গা এটি। “লাল সালাম কমরেড” বলে বিদায় নিলাম। তারপর পেছনে তাকালাম। তারা তখনো সেখানে বসে আছে। হাত নাড়ছে।
এ পৃথিবীর কারো জীবন স্বপ্নের মত। কেউ স্বপ্ন নিয়ে বাঁচে। আর বাকী দুনিয়াবাসীর জীবন দু:স্বপ্নের আঁধারে ঘেরা। প্রতি রাতে আমি জঙ্গলের দিনগুলোর কথা ভাবি। সেই রাতের তারা। সেই বন, বনপথ, গাছাপালা। আমার চোখে ভাসে কমরেড কমলার সেই ছেড়া চপ্পল পড়ে রাতের আঁধারে হাটার দৃশ্য। আমি জানি সে আরো হাটবে। হাটতেই থাকবে। কিন্তু তার নিজের জন্য নয়। আমাদের সবার বেঁচে থাকার বাসনা জাগিয়ে রাখার জন্য।


